ঢাকা    রোববার, ২৬ জুলাই ২০২৬, ১০ শ্রাবণ ১৪৩৩
ঢাকা    রোববার, ২৬ জুলাই ২০২৬, ১০ শ্রাবণ ১৪৩৩
দিনাজপুর টোয়েন্টিফোর

শাপলা হত্যাকাণ্ড: সোমবার অভিযোগপত্র, আসামির তালিকায় হাসিনাসহ ৪১ জন

দীর্ঘ এক যুগ পর ২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের অবস্থান কর্মসূচিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে হতাহতের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে। আগামী সোমবার (২৭ জুলাই) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বহুল আলোচিত এ মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র (ফরমাল চার্জ) দাখিল হওয়ার কথা রয়েছে।আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার দাবি, ঘটনাটি ছিল একটি ‘সিস্টেমেটিক ক্রাইম’ বা পরিকল্পিত অপরাধ। তদন্তে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রাথমিক তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে।[TECHTARANGA-POST:605]চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, সোমবার অভিযোগপত্র দাখিলের পরই মামলার পূর্ণাঙ্গ আসামির তালিকা সামনে আসতে পারে। ট্রাইব্যুনালের ইতিহাসে এটিই প্রথম মামলা, যেখানে একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও আওয়ামী লীগ সরকারের একাধিক সাবেক মন্ত্রী, শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা, তৎকালীন পুলিশ ও বিজিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আসামি করা হচ্ছে। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদের নামও অভিযোগপত্রে থাকতে পারে।যদিও প্রসিকিউশনের খসড়া প্রতিবেদনে শেখ হাসিনাসহ কয়েকজনের নাম থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে, তবে তদন্তের স্বার্থে অভিযোগপত্র দাখিলের আগে সম্ভাব্য সব আসামির নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না। সোমবার ফরমাল চার্জ দাখিলের পর এ বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাবে।কাঠগড়ায় যারা২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর, জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলির পাশাপাশি শাপলা চত্বরের ঘটনাকেও ‘গণহত্যা’ হিসেবে বিচারের উদ্যোগ নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। প্রথমে এ মামলায় শেখ হাসিনাসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন বিচারপতি গোলাম মোর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-১।[TECHTARANGA-POST:603]৫ আগস্টের পর শাপলা হত্যাকাণ্ডের বিচারের পথ খুলে। ছবি: সংগৃহীতপরোয়ানাভুক্ত অন্যরা হলেন—সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক, র‌্যাবের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক জিয়াউল আহসান এবং পুলিশের সাবেক উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোল্লা নজরুল ইসলাম। শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করলেও বাকিরা বর্তমানে কারাগারে আছেন।এছাড়া সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন, বেনজীর আহমেদ, পুলিশের সাবেক ডিআইজি আবদুল জলিল মণ্ডল, ডিএমপির সাবেক অতিরিক্ত কমিশনার হারুন অর রশীদ এবং সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদের নামও তদন্তে উঠে এসেছে।এর মধ্যে হেফাজতের সমাবেশে ‘গণহত্যার’ অভিযোগে দায়ের করা মামলায় পুলিশের সাবেক ডিআইজি আবদুল জলিল মণ্ডলকে ট্রাইব্যুনালের নির্দেশে গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।এর আগে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় রাজসাক্ষী হন সাবেক আইজিপি মামুন। ট্রাইব্যুনালে ওই মামলায় পাঁচ বছরের লঘুদণ্ড পেয়ে তিনি এখন কারাগারে আছেন। সেই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিলও করেছেন তিনি।তদন্তের জালে আরও যাদের নাম এসেছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার, একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির উপদেষ্টামণ্ডলীর সভাপতি শাহরিয়ার কবির, অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন এবং ট্রাইব্যুনালের সাবেক প্রসিকিউটর তুরিন আফরোজ।এর আগে ট্রাইব্যুনালে গত ৫ এপ্রিল তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য দুই মাস সময় চেয়ে আবেদন করে প্রসিকিউশন। পরে ৭ জুন প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য করে ট্রাইব্যুনাল-১। তখন তদন্ত সংস্থার সময়ের আবেদনের কারণে চার্জশিট জমা দিতে পারেনি প্রসিকিউশন। পরবর্তী সময়ে ট্রাইব্যুনালের অবকাশকালীন ছুটি শেষে ২১ জুলাই বিচারকাজ শুরু হলে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার কথা জানান চিফ প্রসিকিউটর। সব প্রক্রিয়া শেষে সোমবার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হতে যাচ্ছে এই মামলার আইনি লড়াই।নিহতের সংখ্যা নিয়ে দীর্ঘদিনের ধোঁয়াশা ও নতুন তথ্য২০১৩ সালের ৫ মে ব্লাসফেমি আইনসহ ১৩ দফা দাবিতে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে মহাসমাবেশ করে কওমি মাদরাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম। শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনের পাল্টা কর্মসূচি হিসেবে আয়োজিত ওই কর্মসূচি ঘিরে দিনভর উত্তেজনার পর রাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যৌথ অভিযান চালানো হয়। সেই অভিযানে ঠিক কতজন নিহত হয়েছিলেন, তা নিয়ে গত এক যুগ ধরে ব্যাপক বিতর্ক চলে আসছে।তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার দাবি করে, অভিযানটিতে কেউ নিহত হয়নি। বিপরীতে হেফাজতে ইসলাম শত শত মানুষ নিহত হওয়ার দাবি করে। ওই সময় মানবাধিকার সংগঠন অধিকার ৬১ জন নিহতের একটি তালিকা প্রকাশ করলে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়। পরে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় অধিকারের সম্পাদক আদিলুর রহমান খান ও পরিচালক এ এস এম নাসির উদ্দিনকে গ্রেফতার করা হয় এবং আদালত তাদের কারাদণ্ড দেন।পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আদিলুর রহমান খান অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।এদিকে সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম জানান, তদন্ত সংস্থা এখন পর্যন্ত ঢাকাসহ চারটি স্থানে ৫৮ জন নিহত হওয়ার প্রমাণ পেয়েছে। এর মধ্যে ঢাকায় ৩২ জন, নারায়ণগঞ্জে ২০ জন, চট্টগ্রামে ৫ জন এবং কুমিল্লায় একজনের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে।নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করে আসছে হেফাজতে ইসলাম। ছবি: সংগৃহীতচিফ প্রসিকিউটরের এ বক্তব্যের পর হেফাজতে ইসলাম ৯৩ জন নিহতের নাম-ঠিকানাসংবলিত একটি প্রাথমিক তালিকা প্রকাশ করে। সংগঠনটির যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক বলেন, ট্রাইব্যুনালের খসড়া তদন্ত প্রতিবেদন তাদের প্রত্যাশার কাছাকাছি। তবে তার দাবি, সে সময় লাশ গুমের চেষ্টা হয়েছিল, ফলে প্রকৃত নিহতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।সাংবাদিকদের আসামি করা নিয়ে প্রসিকিউশনের যুক্তিএই মামলায় রাজনীতিবিদ ও পুলিশ কর্মকর্তাদের পাশাপাশি সাংবাদিকদের আসামি করা নিয়ে দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থা ও বিশ্লেষকদের মধ্যে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। মামলায় একাত্তর টেলিভিশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল বাবু ও সাবেক প্রধান প্রতিবেদক ফারজানা রূপাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। এর আগে ট্রাইব্যুনাল থেকে তাদের বিরুদ্ধে হাজিরা পরোয়ানা (প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট) জারি করা হয়। তদন্তের স্বার্থে একাত্তর টিভির সম্প্রচার লাইসেন্সসহ আনুষঙ্গিক নথিপত্রও তলব করেছে তদন্ত সংস্থা।সাংবাদিকদের আসামি করার বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলামের যুক্তি- এটি একটি জয়েন্ট এন্টারপ্রাইজ (যৌথ অপরাধ)। শাপলা চত্বরের ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে এই সাংবাদিকদের সুনির্দিষ্ট ও পরিকল্পিত ভূমিকা ছিল। তারা পূর্বপরিকল্পনামাফিক বিতর্কিত মানুষের সাক্ষাৎকার নিয়ে প্রচার করে যে কেউ হতাহত হয়নি। এটি ‘সিস্টেমেটিক ক্রাইমের’ অংশ।শাপলা চত্বরের ঘটনার পর একাত্তর টেলিভিশনে প্রচারিত ‘সমীকরণ’ শীর্ষক প্রতিবেদনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘সারা দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টিকারী ওই ঘটনাকে ভিন্ন খাতে নিতে ফারজানা রূপা বিতর্কিত মানুষের বক্তব্য নিয়ে একটি রিপোর্ট তৈরি করেন এবং সারা দুনিয়াতে প্রকৃত ঘটনা আড়াল করেন। তারা বেনজীর আহমেদ এবং যুবলীগ-ছাত্রলীগের লোকদের দিয়ে বলিয়েছে যে, ওখানে কোনো হতাহত হয়নি। শেখ হাসিনাও পার্লামেন্টে একই কথা বলেন।’আমিনুল ইসলাম বলেন, অপরাধ করার ক্ষেত্রে পেশা বিবেচ্য নয়। যারা ফ্যাসিস্ট সরকারকে সহযোগিতা করেছেন এবং যাদের কারণে এত মানুষ হতাহত হয়েছেন, তাদের বিচারের আওতায় আনা হবে। সেই রাতে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট এবং দিগন্ত টিভি ও ইসলামিক টিভি বন্ধ করার সঙ্গে জড়িতদেরও ছাড় দেওয়া হবে না বলে তিনি হুঁশিয়ারি দেন।চিফ প্রসিকিউটর মনে করেন, হলুদ সাংবাদিকতার মাধ্যমে ফ্যাসিস্ট সরকারকে সহযোগিতা করে হত্যাযজ্ঞ আড়ালের চেষ্টা এক ধরনের অপরাধ।

শাপলা হত্যাকাণ্ড: সোমবার অভিযোগপত্র, আসামির তালিকায় হাসিনাসহ ৪১ জন