দিনাজপুরে ২৭৪ বছরের ঐতিহ্যে ঢেপা নদীতে শঙ্খধ্বনি-কীর্তন সুরে কান্তজিউর নৌযাত্রা
ভোরের কোমল আলো। চারপাশে শঙ্খ ও ঘণ্টার ধ্বনি। কীর্তনের সুরে মুখর কাহারোলের কান্তনগর মন্দির প্রাঙ্গণ। পূজা-অর্চনা শেষে ভক্তদের সঙ্গে নিয়ে ঢেপা নদীর কান্তনগর ঘাটের দিকে এগিয়ে চলেছেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আরেক রূপ কান্তজিউ বিগ্রহ। কারও হাতে ফুল, কারও হাতে প্রদীপ। সবার চোখে-মুখে ভক্তি ও প্রার্থনা। নদীর তীরে পৌঁছানোর পর আধ্যাত্মিক সেই আবহ যেন আরও গভীর হয়ে ওঠে।[TECHTARANGA-POST:715]প্রায় ২৭৪ বছর ধরে চলে আসছে এই নৌযাত্রা। প্রথা অনুযায়ী, জন্মাষ্টমীর দুই দিন আগে কান্তজিউ বিগ্রহ কাহারোল থেকে নদীপথে যাত্রা করে দিনাজপুর শহরের রাজবাড়ী মন্দিরে পৌঁছান। সেখানে তিন মাস অবস্থানের পর রাসপূর্ণিমায় আবার কান্তনগর মন্দিরে ফিরিয়ে নেওয়া হয় বিগ্রহ।আজও ছিল সেই একই পথ, একই নদী আর একই আবেগ। ঢেপা নদীর দুই তীরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের চোখে ছিল শ্রদ্ধা ও আনন্দ। নৌকার বহর যেন পরিণত হয় ভাসমান উৎসবে। প্রতিটি ঘাটে নৌকা থামার সময় ভক্ত-পুণ্যার্থীদের ভিড়ে মুখর হয়ে ওঠে নদীর দুই পাড়।বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) ২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ নদীপথ পেরিয়ে সন্ধ্যায় নৌযাত্রা পুনর্ভবা নদীর সাধুর ঘাটে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।কাহারোল থেকে আসা ভক্ত সেজোতি রায় বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই বাবা-মায়ের সঙ্গে কান্তজিউ মন্দিরে আসতাম। আজ স্বামীর সঙ্গে এসেছি। দুজন মিলে পূজা-অর্চনা করেছি। ভগবানের কাছে প্রার্থনা করেছি, আমাদের পরিবার যেন সুখে-শান্তিতে থাকে এবং সবার মঙ্গল হয়।’[TECHTARANGA-POST:714]দিনাজপুর শহরের বাসিন্দা রাজেশ কুমার রায় বলেন, ‘এই যাত্রা শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতি ও শিকড়ের সঙ্গে মিশে থাকা আবেগ।’ঠাকুরগাঁও থেকে আসা তাপস পাল বলেন, ‘কান্তজিউ বিগ্রহের দর্শনে এসে শ্রীকৃষ্ণের শ্রীচরণে প্রার্থনা করেছি। আমাদের কামনা, সারা পৃথিবী যেন সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধিতে ভরে ওঠে। হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে সবাই যেন শান্তি, ভালোবাসা ও সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে সুন্দরভাবে বসবাস করতে পারে—শ্রীকৃষ্ণের কাছে এটাই ছিল আমাদের প্রার্থনা।’দিনাজপুর রাজ দেবোত্তর এস্টেটের এজেন্ট রনজিৎ সিংহ বলেন, দিনাজপুরের মহারাজা রাজা প্রাণনাথ ১৭০৪ সালে কান্তনগর মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। পরে তার পোষ্যপুত্র রাজা রামনাথ ১৭৫২ সালে মন্দিরের নির্মাণকাজ শেষ করেন। সেই সময় থেকেই জন্মাষ্টমীর দুই দিন আগে কান্তজিউ বিগ্রহ রাজবাড়ীতে নিয়ে গিয়ে পূজা করার ঐতিহ্য শুরু হয়। রাসপূর্ণিমার আগে বিগ্রহ আবার কান্তনগর মন্দিরে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। এ সময় মন্দির প্রাঙ্গণে মাসব্যাপী মেলাও বসে।অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (কাহারোল সার্কেল) মনিরুজ্জামান বলেন, দিনাজপুর জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে কান্তজিউ মন্দির থেকে রাজবাড়ী মন্দির পর্যন্ত এবং নদীর দুই পাড়ে সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করে অনুষ্ঠানটি সফলভাবে সম্পন্ন করা হবে।