প্রিন্ট এর তারিখ : ১১ আগস্ট ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১০ আগস্ট ২০২৬
দুই দেশের সম্পর্কে অস্বস্তি, তারেক রহমানের ভারত সফর অনিশ্চিত
দিনাজপুর টোয়েন্টিফোর ডটকম, নিজস্ব প্রতিবেদক ||
গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কে টানাপোড়েন ও কূটনৈতিক অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। এই দৃশ্যমান অস্বস্তির সবচেয়ে বড় প্রতিফলন ঘটেছে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন ভারত সফরের সিদ্ধান্তকে ঘিরে। আগামী সেপ্টেম্বর মাসে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিতব্য ‘ব্রিকস’ শীর্ষ সম্মেলনের অংশ হিসেবে এই সফরের কথা থাকলেও, শেষ মুহূর্তে এটি এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সম্মেলনে অংশ নিতে ভারতের পক্ষ থেকে তারেক রহমানকে দুটি পৃথক আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। একটি দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্য, অন্যটি ব্রিকসের আউটরিচ পর্বে অংশগ্রহণের জন্য।তবে ব্রিকসের আমন্ত্রণপত্রের ভাষা নিয়ে আপত্তি তৈরি হয়েছে। এতে তারেক রহমানকে সরাসরি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে উল্লেখ না করে আঞ্চলিক জোট বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারপারসন হিসেবে সম্বোধন করা হয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এটিকে ব্রিকসের প্রচলিত কূটনৈতিক রীতি বা স্ট্যান্ডার্ড প্র্যাকটিস হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। তবে বিষয়টি ঢাকার নতুন সরকার ইতিবাচকভাবে নেয়নি।কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারপ্রধানকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে যথাযথ গুরুত্ব না দিয়ে একটি আঞ্চলিক জোটের প্রধান হিসেবে আমন্ত্রণ জানানোয় প্রটোকলগত অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। এ কারণে ঢাকা এখনো সফরে যাওয়ার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি।বাংলাদেশ সরকারের একাধিক উচ্চপর্যায়ের সূত্র জানিয়েছে, ব্রিকসের আউটরিচ পর্বে তারেক রহমানের অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রায় চূড়ান্ত।শেখ হাসিনাকে ঘিরে অস্বস্তিঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের আরেকটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড। গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে সাউথ এশিয়ার ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবের আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা ও বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেন।মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দণ্ডিত একজন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীর ভারতের মাটিতে বসে বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে বক্তব্য দেওয়াকে নিজেদের সার্বভৌমত্ব ও বিচারব্যবস্থার প্রতি অবমাননা হিসেবে দেখছে ঢাকা।বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ওই অনুষ্ঠান আয়োজনের ফলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নতুন যাত্রার প্রচেষ্টায় সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে ভারত সরকারকে আগেই উদ্বেগ জানানো হয়েছিল। এরপরও ভারতের মাটিতে অনুষ্ঠানটি আয়োজনের অনুমতি দেওয়ায় ঢাকা গভীর হতাশা প্রকাশ করেছে।বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশের জনগণ যখন জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বার্ষিকী উদ্যাপন করছে, তখন ভারতের মাটিতে শেখ হাসিনার ওই মতবিনিময় বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি অবমাননা এবং জুলাই বিপ্লবের শহীদদের প্রতি গুরুতর অপমান।ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবশ্য দ্রুত বিবৃতি দিয়ে জানায়, সংবাদ সম্মেলনের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে দেওয়া কোনো বক্তব্যকেও তারা সমর্থন করে না। তবে এতে ঢাকার ক্ষোভ প্রশমিত হয়নি।ঢাকার পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে, ভারতের মাটিতে বসে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের সুযোগ দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের পথে অন্যতম বড় বাধা।হাইকমিশনারের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকএই পরিস্থিতির মধ্যেই সোমবার ১০ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। ঢাকায় দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এটি তাঁর প্রথম আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎ।সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির উপস্থিত ছিলেন।বৈঠকের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ আশা করছে, দেশটির দৃষ্টিভঙ্গি ভারত সরকার অনুধাবন করতে পেরেছে এবং রাষ্ট্রের কোনো স্তম্ভকে দুর্বল করে এমন কোনো পদক্ষেপ তারা আর নেবে না।তিনি জানান, বৈঠকে ভারতে অবস্থানরত মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দ্রুত ফেরত দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদির হত্যাকারীদেরও ফেরত দিতে ভারতকে অনুরোধ করা হয়েছে।প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, বৈঠকে বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশ আশা করে, ভারত শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করবে।বৈঠকের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর খুবই ভালো আলোচনা হয়েছে। তিনি বৈঠকটিকে জনগণের প্রতিনিধির সঙ্গে জনগণের প্রতিনিধির সাক্ষাৎ হিসেবে বর্ণনা করেন।ত্রিবেদী বলেন, ভারতের জনগণ ও প্রধানমন্ত্রী সামনের দিকে তাকিয়ে আছেন। তারেক রহমানের ভারত সফরের আমন্ত্রণ আগে থেকেই রয়েছে এবং ভারত এ বিষয়ে ইতিবাচক। দুই দেশের নেতারা বসলে বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য থাকতেই পারে। তবে দুই দেশের মানুষের প্রত্যাশা একটি—ভালো সম্পর্ক।তিনি আরও বলেন, দুই দেশের ইতিহাস ও প্রতিবেশী হিসেবে অবস্থান বদলানো সম্ভব নয়। সীমান্তের পাশাপাশি দুই দেশ স্বপ্নও ভাগ করে নেয়। দুই পক্ষের আলোচনার মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয় সমাধান করা সম্ভব বলেও তিনি মন্তব্য করেন।তবে বৈঠকে নির্দিষ্ট কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে সরাসরি কিছু বলেননি ভারতীয় হাইকমিশনার। একইভাবে, সাক্ষাতে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারতে সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন কি না, সেটিও স্পষ্ট নয়। কোনো পক্ষই এ বিষয়ে মন্তব্য করেনি।ফলে ব্রিকস সম্মেলনকে কেন্দ্র করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি।আস্থার সংকট কাটানোর চ্যালেঞ্জকূটনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন, ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ককে আবার স্থিতিশীল ও আস্থার জায়গায় নিতে হলে দুই পক্ষকেই বাস্তবসম্মত ও খোলামেলা আলোচনায় বসতে হবে। ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও নতুন সরকারের উদ্বেগকে যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও ভারতের নিরাপত্তাসংক্রান্ত যৌক্তিক উদ্বেগের বিষয়ে আশ্বস্ত করার প্রয়োজন রয়েছে।সেপ্টেম্বরে ব্রিকস সম্মেলনের আগে দুই দেশ এই দূরত্ব কমিয়ে কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়।সূত্র: আনন্দবাজার, বিবিসি বাংলা, ডয়চে ভেলে
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্ব সংরক্ষিত দিনাজপুর টোয়েন্টিফোর ডট কম