প্রিন্ট এর তারিখ : ০৫ এপ্রিল ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৫ এপ্রিল ২০২৬
শেরপুর-৩ উপনির্বাচন : বিএনপি-জামায়াত হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস
দিনাজপুর টোয়েন্টিফোর ডটকম, ডেস্ক রিপোর্ট ||
স্থগিত থাকা শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী) আসনের উপনির্বাচন আগামী ৯ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপে ইতোমধ্যে সরগরম হয়ে উঠেছে দুই উপজেলা। ভোটারদের মন জয়ে চলছে ব্যাপক প্রচারণা, দেওয়া হচ্ছে নানা প্রতিশ্রুতি। অন্যদিকে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোট আয়োজনে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে নির্বাচন কমিশন। ফলে এ আসনকে ঘিরে এখন সারা দেশের মানুষের দৃষ্টি।গত ১২ ফেব্রুয়ারি সারাদেশে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হলেও তার আগেই ৩ ফেব্রুয়ারি জামায়াত মনোনীত ও ১১ দল সমর্থিত প্রার্থী নুরুজ্জামান বাদলের অসুস্থতাজনিত মৃত্যু হওয়ায় এ আসনের নির্বাচন স্থগিত করা হয়। পরে পুনঃতফসিল ঘোষণা করে যাচাই-বাছাই শেষে তিনজন প্রার্থীকে চূড়ান্ত করে নির্বাচন কমিশন।প্রার্থীরা হলেন- বিএনপি মনোনীত মাহমুদুল হক রুবেল, জামায়াত মনোনীত ও ১১ দল সমর্থিত মাসুদুর রহমান মাসুদ এবং বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) মার্কসবাদীর প্রার্থী মিজানুর রহমান।এই নির্বাচনী এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, দিন-রাত প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রার্থীরা। ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এবারের নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থীর মধ্যে। উভয় পক্ষই ছাড় দিতে নারাজ, ফলে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস মিলছে।তিনবারের সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মাহমুদুল হক রুবেল এবার ভিন্ন কৌশলে মাঠে নেমেছেন। শুধু দলীয় নেতাকর্মীদের ওপর নির্ভর না করে পরিবারের সদস্যদের নিয়েও চালাচ্ছেন প্রচারণা। তার স্ত্রী ফরিদা হক দীপা ও মেয়ে রুবাইদা হক রিমঝিম গ্রাম-গঞ্জে উঠান বৈঠক করছেন। অন্যদিকে ছেলে রাফিদুল হক তরুণ ভোটারদের কাছে টানতে সক্রিয় রয়েছেন। দীর্ঘ দুই দশক পর আসনটি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্য নিয়ে হক পরিবারের এ প্রচারণা ভোটারদের মধ্যে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।অন্যদিকে মাঠে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন জামায়াতের প্রার্থী, অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য মাসুদুর রহমান মাসুদ। তিনি প্রয়াত নুরুজ্জামান বাদলের ছোট ভাই। ভাইয়ের রাজনৈতিক পরিচিতি ও সংগঠনকে কাজে লাগিয়ে নিজের অবস্থান সুসংহত করেছেন। ভোটারদের একটি বড় অংশের মতে, এ আসনে বিএনপি বনাম জামায়াতের মধ্যে সরাসরি লড়াই হবে।শেরপুর-৩ আসনের রাজনৈতিক ইতিহাস বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯৭৯ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত বিএনপির প্রবীণ নেতা মরহুম ডা. সেরাজুল হকের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। তার মৃত্যুর পর ১৯৯৪ সালে রাজনীতিতে আসেন তার ছেলে মাহমুদুল হক রুবেল। বাবার জনপ্রিয়তার ধারাবাহিকতায় ১৯৯৪, ১৯৯৫ ও ১৯৯৬ সালে টানা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি।তবে ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর রাজনৈতিক মেরুকরণের কারণে আসনটি বিএনপির হাতছাড়া হয়। দীর্ঘদিনের সেই অবস্থান বদলে দিতে এবার নতুন করে জয়ের লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নেমেছেন রুবেল।এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ১৩ হাজার ৩৭৭ জন। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক নারী ভোটার। এ বিশাল নারী ভোটব্যাংককে টার্গেট করে বিএনপি প্রার্থীর পরিবার সরাসরি মাঠে কাজ করছে।নিজের জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী মাহমুদুল হক রুবেল বলেন, আন্দোলন-সংগ্রাম থেকে শুরু করে দুর্যোগকালীন সময়ে তিনি সবসময় মানুষের পাশে ছিলেন। এলাকার প্রতিটি সমস্যা ও সম্ভাবনা তার জানা। তিনি অভিযোগ করেন, জামায়াতের কর্মীরা টাকা দিয়ে ভোট কেনার চেষ্টা করছে এবং এ বিষয়ে প্রশাসন অবগত রয়েছে।অন্যদিকে জামায়াত প্রার্থী মাসুদুর রহমান মাসুদ বলেন, এখানকার ভোটাররা এখন সচেতন, তারা পরিবর্তন চায়। চাঁদাবাজি ও অবৈধ দখলদারিত্ব থেকে মুক্তির আশায় মানুষ জামায়াতকে বিকল্প হিসেবে দেখছে।জামায়াতের নির্বাচনী পরিচালনা কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা ও জেলা সহকারী সেক্রেটারি গোলাম কিবরিয়া দাবি করেন, শ্রীবরদী ও ঝিনাইগাতীর ১৭টি ইউনিয়ন এবং একটি পৌরসভার চার লক্ষাধিক ভোটার তাদের ইশতেহার ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে তাদের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। তবে তাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ আসনে জয় কারও জন্যই সহজ নয়। ২০ দলীয় জোটের সমীকরণ পরিবর্তনের ফলে জামায়াত প্রার্থী শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছেন। তাদের সুসংগঠিত কর্মীবাহিনী ও নির্দিষ্ট ভোটব্যাংক বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে।জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও রিটার্নিং কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, শেরপুর-৩ আসনে মোট ১২৮টি ভোটকেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে গারো পাহাড়ি এলাকার ৩২টি কেন্দ্রকে দুর্গম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।সব মিলিয়ে, বহুমাত্রিক সমীকরণ, তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং রাজনৈতিক গুরুত্বের কারণে শেরপুর-৩ উপনির্বাচন এখন জাতীয় আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।উল্লেখ্য, শেরপুর-৩ আসনে জামায়াতের প্রার্থী নুরুজ্জামান বাদলের মৃত্যুজনিত কারণে গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন স্থগিত করা হয়। পরবর্তীতে ঘোষিত তফসিল ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী ৯ এপ্রিল ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এ আসনে বিএনপি প্রার্থী মাহমুদুল হক রুবেল, জামায়াত আলহাজ্ব মাসুদুর রহমান ও বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী) মনোনীত প্রার্থী মিজানুর রহমান প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ১৭টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত শেরপুর-৩ আসনের ১২৮টি ভোটকেন্দ্রে মোট ৪ লাখ ১৩ হাজার ৩৭৭ জন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন।
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্ব সংরক্ষিত দিনাজপুর টোয়েন্টিফোর ডট কম