(দিনাজপুর টোয়েন্টিফোর ডটকম)আমার কাছে মনে হয়েছে, এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডমেজর জেনারেল (অব) আব্দুর রশিদনিরাপত্তা বিশ্লেষক

কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের একপাশে পাহাড় আরেক পাশে সাগরের বিস্তীর্ণ জলরাশি। সমুদ্রের গর্জন যেখানে ভ্রমণপিয়াসু মানুষকে আন্দোলিত করে সেই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার দীর্ঘ এই সড়ক এখন হয়ে উঠেছে আতঙ্কের অপর নাম। এই মেরিন ড্রাইভ সড়কে একের পর এক কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত মানুষের তালিকায় এবার যুক্ত হয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান (৩৬)। গত শুক্রবার রাতে টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের শাপলাপুর চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে নিহত হন তিনি। সশস্ত্র বাহিনীর এক সাবেক কর্মকর্তা পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়ার ঘটনা নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। গঠন করা হয়েছে উচ্চপর্যায়ের সরকারি তদন্ত কমিটি।

ইতোমধ্যে তদন্ত কমিটি কাজ শুরু করেছে। জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে পুলিশ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সিনহার সঙ্গী এবং স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের। পুলিশের গুলিতে সশস্ত্র বাহিনীর এক সাবেক কর্মকর্তা নিহত হওয়ার ঘটনার পর কথিত ক্রসফায়ারের সময় পুলিশের ‘আত্মরক্ষার্থে গুলি’ করার চিরায়িত ভাষ্য প্রথমবারের মতো কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এর আগে কিছু ঘটনার ক্ষেত্রে পরিবারের পক্ষ থেকে ক্রসফায়ারের ঘটনাটি সাজানো দাবি করা হলেও সরকারি একটি বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থার ভাষ্যে বিষয়টি প্রথমবারের মতো উঠে এলো।

৫১ বিএমএ লং কোর্সের কর্মকর্তা সিনহা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কমিশন লাভ করেন। ২০১৮ সালে সৈয়দপুর সেনানিবাস থেকে তিনি স্বেচ্ছায় অবসর নেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তায় নিয়োজিত স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সেও (এসএসএফ) দায়িত্ব পালন করেন। সিনহার বাড়ি

যশোরের বীর হেমায়েত সড়কে। তার বাবা অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপসচিব মুক্তিযোদ্ধা মরহুম এরশাদ খান। সিনহা অবিবাহিত ছিলেন। দুই বোনের একমাত্র ভাই। বড় বোন একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের শিক্ষক। ছোট বোন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী এবং আমাজনে চাকরি করেন।

সিনহার পরিবার ও ঘনিষ্ঠ এক বন্ধু জানান, মূলত বিশ্ব ভ্রমণের প্রবল স্পৃহার কারণে সেনাবাহিনী থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নেন সিনহা। এর জন্য নিজেকে প্রস্তুত করছিলেন। তার প্রথম গন্তব্য ছিল চীন। এ জন্য ব্যাগপত্রও গুছিয়েছিলেন। তবে চলমান করোনা ভাইরাস মহামারীর কারণে আপাতত তার সেই ইচ্ছা পরিকল্পনাতেই থেকে যায়। তাই বাসায় বসে না থেকে কক্সবাজারে যান ‘জাস্ট গো’ নামে একটি ভিডিওচিত্রের কাজ করতে। তার সঙ্গে ছিলেন স্টামফোর্ড বিশ^বিদ্যালয়ের ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের তিন শিক্ষার্থী। তারা কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ সড়কের নীলিমা রিসোর্টে ওঠেন।

ঘটনার পর পর কক্সবাজারের পুলিশ সুপার (এসপি) এবিএম মাসুদ হোসেন সাংবাদিকদের বলেছিলেন, শামলাপুরের লোকজন ওই গাড়ির আরোহীদের ডাকাত সন্দেহ করে পুলিশকে খবর দেন। এ সময় তল্লাশি চেকপোস্টে গাড়িটি থামানোর চেষ্টা করে পুলিশ। কিন্তু গাড়ির আরোহী সিনহা তল্লাশিতে বাধা দেন। এ নিয়ে তর্কবিতর্কের এক পর্যায়ে সিনহা তার পিস্তল বের করে পুলিশকে গুলি করার চেষ্টা করেন। আত্মরক্ষার্থে পুলিশও গুলি চালায়। এতে ওই ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। পরে সিনহার গাড়ি ও নীলিমা রিসোর্ট তল্লাশি করে একটি পিস্তল, ৯ রাউন্ড গুলি, ৫০ পিস ইয়াবা, দুই বোতল বিদেশি মদ ও গাঁজা উদ্ধারের দাবি করে পুলিশ। কিন্তু এই বক্তব্যের সঙ্গে একটি গোয়েন্দা সংস্থার গোপন প্রতিবেদনের অনেক অমিল। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুলিশ গাড়ি থামিয়ে কোনোরূপ জিজ্ঞাসাবাদ ছাড়াই অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খানকে (৩৬) গুলি চালিয়ে হত্যা করে।

কী ঘটেছিল সেই রাতে?

ওই রাতের ঘটনা কী আসলেই পুলিশের ভাষ্যের মতো ছিল? সিনহা সাবেক সেনা কর্মকর্তা হওয়ায় ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাস্থলে পৌঁছে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। সরকারি একটি বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়, ৩ জুলাই ঢাকা থেকে কক্সবাজার আসেন সিনহা। প্রায় এক মাস তারা কক্সবাজারের বিভিন্ন স্থানে শুটিং করেন। ৩১ জুলাই বিকালে সঙ্গী সিফাতকে নিয়ে সিনহা কক্সবাজার থেকে টেকনাফের শামলাপুর পাহাড়ে যান। এ সময় সাবেক এই সেনা কর্মকর্তার পরনে ছিল কমব্যাট টি-শার্ট, কমব্যাট ট্রাউজার ও ডেজার্ট বুট। সন্ধ্যা ও রাত্রিকালীন শুটিং শেষ করে তারা রাত সাড়ে আটটার দিকে পাহাড় থেকে নেমে আসার সময় স্থানীয় কয়েকজন লোক ডাকাত ডাকাত বলে চিৎকার দেন এবং শামলাপুর পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রে খবর দেন। পাহাড় থেকে নেমে সিফাতকে নিয়ে সিনহা নিজস্ব প্রাইভেট কারে ওঠেন। রাত ৯টার দিকে তারা পৌঁছেন শামলাপুর পুলিশ চেকপোস্টে। সেখানে আগে থেকেই ডাকাত প্রতিরোধে প্রস্তুত ছিলেন পুলিশ পরিদর্শক লিয়াকত আলীসহ পুলিশের সদস্যরা।

পুলিশের সংকেত পেয়ে মেজর সিনহা গাড়ি থামান এবং নিজের পরিচয় দিলে প্রথমে তাদের চলে যাওয়ার সংকেত দেওয়া হয়। পরে পরিদর্শক লিয়াকত আলী তাদের পুনরায় থামান এবং তাদের দিকে পিস্তল তাক করে গাড়ি থেকে নামতে বলেন। সিফাত হাত উঁচু করে গাড়ি থেকে নেমে গাড়ির পেছনের দিকে গিয়ে দাঁড়ান। সিনহা গাড়ি থেকে হাত উঁচু করে নামার পর পরই পুলিশ পরিদর্শক লিয়াকত তাকে লক্ষ্য করে তিন রাউন্ড গুলি করেন। গুলি করার পর পরই রাত পৌনে ১০টার দিকে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন স্থানীয় জনগণ ও একটি গোয়েন্দা সংস্থার মাঠকর্মী সার্জেন্ট আইয়ূব আলী। তখন গুলিবিদ্ধ সেনা কর্মকর্তাকে জীবিত অবস্থায় দেখতে পান তারা। আইয়ূব আলী ঘটনার ভিডিও রেকর্ড করতে চাইলে পুলিশ পরিচয় জানতে চায়। পরিচয় দেওয়ার পর পুলিশ তার হাত থেকে মুঠোফোন সেট ও তার পরিচয়পত্র ছিনিয়ে নেন।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, রাত ১০টার দিকে ঘটনাস্থলে আনা হয় একটি মিনিট্রাক। ট্রাকে ওঠানোর সময়ও মেজর সিনহা জীবিত ছিলেন এবং নড়াচড়া করছিলেন। এর পর সিনহাকে নিয়ে ট্রাকটি কক্সবাজার সদর হাসপাতালে পৌঁছে ১ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট পর। তখন হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক সিনহাকে মৃত ঘোষণা করেন। হাসপাতাল থেকে ঘটনাস্থলের দূরত্ব ১ ঘণ্টার পথ। অতিরিক্ত ৪৫ মিনিট অতিবাহিত করা পুলিশের একটি অপকৌশল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনের সঙ্গে মিল পাওয়া যায় ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও সিনহার সঙ্গী সিফাতের বক্তব্যেও। সিফাত জানান, বিকাল ৪টার দিকে তারা পাহাড়ের উদ্দেশে রিসোর্ট থেকে বের হন। পাহাড়ে যাওয়ার সময়ও পুলিশ চেকপোস্টে তাদের জিজ্ঞসাবাদ করা হয়। কিন্তু সিনহা স্যার পরিচয় দেওয়ার পর চলে যেতে বলেন। কিন্তু ফেরার পথে গাড়ি থামানোর পর হাত উঁচু করে গাড়ি থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সিনহা স্যারকে গুলি করা হয়।

ঘটনাস্থলে জড়ো হওয়া অপর এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, ‘১০ মিনিট পর দক্ষিণ দিক থেকে সাদা রঙের পুলিশের দুটি গাড়ি আসে। প্রদীপ সাব (টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশ) নেমে লাশের ঠ্যাঙে এ রকম লাথি মাইরে চাইছে (দেখছে)। তিন থেকে চার লাথি মারছে। ওনার ব্যাটালিয়নকে (পুলিশ ফোর্স) বলছে কী আছে বাইর করো, ওনারা তদন্ত করে একটা ব্যাগ পাইছে। ওনার কার্ড ও কাগজপত্র পাইছে ব্যাগে। আরেক জন লোক ছিল যে উনি তার পায়ের দিকে গুলি করছিল। আমি শাপলাপুর তদন্ত কেন্দ্রের আইসি (ইনচার্জ) লিয়াকত আলীকে চিনি। উনি গুলি করছে।’

অবশ্য সিনহা নিহত হওয়ার ঘটনা নিয়ে তোলপাড় শুরু হলে মুখে কার্যত কুলুপ এঁটেছে কক্সবাজার জেলা পুলিশ।

পরিবারের দাবি হত্যাকাণ্ড

সিনহার মা নাছিমা আক্তারের আবেগঘন বক্তব্য ভাইরাল হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। সিনহার বড় বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস বলেন, এটা স্পষ্ট একটা হত্যাকা-। আমার ভাইকে হত্যা করা হয়েছে। আমরা তো ভাইকে আর বাস্তবে পাব না। আমরা চাই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হোক। যারা জড়িত, তাদের বিচার হোক। আমার বাবা দেশের জন্য যুদ্ধ করেছিলেন। ভাইও দেশের জন্য কাজ করেছেন। তাকে এভাবে মারা যেতে হবে, তা তারা কখনই ভাবেননি। এটা মেনে নেওয়া যায় না।

তদন্ত কমিটির কাজ শুরু

সাবেক সেনা কর্মকর্তা সিনহা রাশেদ খান নিহতের ঘটনার তদন্তে গঠিত কমিটি তাদের তদন্তকাজ শুরু করেছে। গতকাল সকালে তদন্ত কমিটির প্রধান চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মিজানুর রহমান কক্সবাজারে পৌঁছেন। কক্সবাজার সার্কিট হাউস সম্মেলন কক্ষে তদন্ত কমিটির অন্য সদস্যদের নিয়ে এক সমন্বয় সভার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করেন। চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (উন্নয়ন) মোহাম্মদ মিজানুর রহমানকে আহ্বায়ক করে পুনর্গঠিত এই তদন্ত কমিটিকে সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ। কমিটিতে কক্সবাজারের রামু ১০ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি ও কক্সবাজারের এরিয়া কমান্ডারের মনোনীত প্রতিনিধি হিসেবে একজন লে. কর্নেল পদমর্যাদার কর্মকর্তা সদস্য হিসেবে রয়েছেন। পুলিশ বিভাগের পক্ষ থেকে এই কমিটিতে সদস্য হিসেবে রয়েছেন চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপ-পুলিশ মহাপরিদর্শকের মনোনীত অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ জাকির হোসেন।

তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মিজানুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, দুঃখজনক ঘটনাটির একটি নিরপেক্ষ এবং স্বচ্ছ তদন্ত করা হবে। তদন্ত কমিটি কীভাবে তদন্ত এগিয়ে নেবে সেসব জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন তিনি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ইতোমধ্যে তদন্ত কমিটি পরিদর্শক লিয়াকতকে জিজ্ঞাসবাদ করেছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি গোলাম ফারুক ও কক্সবাজারের পুলিশ সুপার (এসপি) এবিএম মাসুদ হোসেন ১০ পদাতিক ডিভিশনের জিওসির আমন্ত্রণে সেখানে আলোচনার জন্য গিয়েছিলেন।

সূত্র জানায়, কক্সবাজারের একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদমর্যাদার কর্মকর্তার সঙ্গেও নিহত সিনহার বন্ধুত্ব ছিল। কক্সবাজারে তাদের প্রায় একসঙ্গে দেখা গেছে। তবে সিনহা নিহত হওয়ার পর সেই কর্মকর্তাই তাকে ‘ডাকাত’ সাজাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন।

ময়নাতদন্ত রিপোর্ট কী বলছে

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সিনহার বুকের দুই পাশে দুটি গুলি করা হয়। পরে দুই পায়ে আরও দুটি গুলি করা হয়। সিনহার বুকে ও পিঠে জখমের চিহ্ন রয়েছে বলে জানিয়েছেন ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকরা।

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) শাহীন আবদুর রহমান চৌধুরী বলেন, হাসপাতালে আনার আগেই অবসরপ্রাপ্ত ওই সেনা কর্মকর্তার মৃত্যু হয়েছিল। সিনহার বুকে ও পিঠে জখমের দাগ আছে। ময়নাতদন্ত রিপোর্ট হাতে এলে বলা যাবে জখমের চিহ্ন গুলির কিনা। শনিবার সকালে তার ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে।

ওসি প্রদীপ আগেই জানতেন

সেনাবাহিনীর সদস্যরা পরেন এমন পোশাক পরা এক ব্যক্তিসহ দুজন মেরিন ড্রাইভ দিয়ে কক্সবাজারের দিকে যাচ্ছেন, টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ কুমার দাশ সে খবর আগেই পেয়েছিলেন। তার নির্দেশেই শামলাপুর পুলিশ চেকপোস্টে যানবাহন তল্লাশির কাজ শুরু হয়। মৃত্যুর আগে একাধিকবার সিনহা তার পরিচয় দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদেরও দিয়েছিলেন।

সিনহা নিহত হওয়ার ঘটনায় দায়ের করা মামলার এজাহারে তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জের পিস্তল থেকে চারটি গুলি ছোড়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তার মৃত্যুর দায় চাপানো হয়েছে সিনহা ও তার সঙ্গে থাকা সিফাতের ওপর।

টেকনাফ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) নন্দদুলাল রক্ষিত বাদী হয়ে মামলাটি করেছেন। ওই মামলার এজাহারে এসব তথ্য উঠে এসেছে। সিফাতের অপরাধ, পরস্পর (সিনহা ও সিফাত) যোগসাজশে সরকারি কাজে বাধা, হত্যার উদ্দেশ্যে অস্ত্র তাক করা ও মৃত্যু ঘটানো।

ঘটনার বিষয়ে জানতে কয়েকবার চেষ্টা করেও টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযানের নামে ক্রসফায়ার বৃদ্ধি

২০১৮ সালের ৪ মে থেকে সারাদেশে মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান শুরু করে সরকার। এতে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যায় কথিত ক্রসফায়ারের পরিসংখ্যান। গত ৩০ জুলাই পর্যন্ত শুধু কক্সবাজার জেলায় পুলিশ, বিজিবি ও র‌্যাবের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২৮৭ জন। এর মধ্যে পুলিশের সঙ্গে ১৭৪, বিজিবির সঙ্গে ৬২ ও র‌্যাবের সঙ্গে ৫১ জন বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। আর টেকনাফে পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন ১৬১ জন। এসব ক্রসফায়ারের একটি বড় অংশ সংঘটিত হয় মেরিন ড্রাইভ সড়কে।

যদিও মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযানের শুরু থেকেই এ ধরনের বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- বন্ধের আহ্বান জানিয়ে আসছিল মানবাধিকার সংগঠনগুলো। অবশ্য এমন অভিযানের পরও কমেনি মাদকের চোরাচালান। বরং কিছু ক্ষেত্রে মাদকের সরবরাহ বাড়ার তথ্য মিলেছে। পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের হিসেবে অভিযান শুরুর পর এক বছরে বিভিন্ন সংস্থার অভিযানে ৫ কোটি ১৪ লাখ ইয়াবা বড়ি এবং ১০ মণ হেরোইন উদ্ধার হয়েছে, যা আগের বছরগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। এর আগে কোনো বছরেই ৪ কোটির বেশি ইয়াবা বড়ি উদ্ধার হয়নি। এমন বাস্তবতায় মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযানের নামে কথিত ক্রসফায়ার বৃদ্ধির ঘটনার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আব্দুর রশিদ আমাদের সময়কে বলেন, ‘আমার কাছে মনে হয়েছে, এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকা-। রাষ্ট্র দুর্বৃত্তদের হাতে অস্ত্র তুলে দিচ্ছে কিনা সেটি দেখতে হবে।’

প্রত্যক্ষদর্শীর ওপর চড়াও পুলিশ

সাবেক সেনা কর্মকর্তা সিনহা মো. রাশেদ নিহত হওয়ার ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীর ওপর চড়াও হয়েছে পুলিশ। ঘটনার ওপর নজর রাখা বিশেষ একটি গোয়েন্দা সংস্থা সূত্র জানায়, অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহাকে গুলি করার পরপর সেখানে স্থানীয় বাসিন্দারা জড়ো হন। তাদের মধ্যে কয়েকজন গোয়েন্দা সংস্থা এবং স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে ঘটনার বর্ণনা দেন। এ নিয়ে সংবাদ প্রচার হলে গতকাল সন্ধ্যায় আনোয়ার নামে এক প্রত্যক্ষদর্শীকে ইয়াবা দিয়ে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালান বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রে নতুন যোগ দেওয়া উপপরিদর্শক (এসআই) জাহাঙ্গীর। পরে স্থানীয় জনতার বাধার মুখে পিছু হটে পুলিশ।

এক প্রত্যক্ষদর্শী নাম প্রকাশ না করার শর্তে আমাদের সময়কে বলেন, ‘চোখের সামনে যা দেখেছি সেটাই বলেছি। কিন্তু সত্য বলে এখন বিপদে পড়েছি।’ তবে এ বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করেও বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রের কারও বক্তব্য জানা যায়নি।

বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রের সব পুলিশ প্রত্যাহার

সাবেক সেনা কর্মকর্তা সিনহা মো. রাশেদ খান নিহত হওয়ার ঘটনায় পুলিশের টেকনাফের বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ (আইসি) পরিদর্শক লিয়াকত আলীসহ কেন্দ্রের সব সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। গত রবিবার তাদের প্রত্যাহার করে জেলা পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়। পুলিশের ওই তদন্ত কেন্দ্রে পরিদর্শক লিয়াকত আলীসহ ২১ জন কর্মকর্তা ও কনস্টেবল কর্মরত ছিলেন।

– সূত্র: আমাদের

সময়