নূরে আলম জীবন  (দিনাজপুর২৪.কম) একাদশ জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম ঠিকঠাকই চলছিল। কিন্তু হঠাৎ প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রোহিঙ্গা ও ষোড়শ সংশোধনী ইস্যুতে রাজনৈতিক কার্যক্রমে ভাটা পড়ে। তবে এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য নানা চেষ্টা হচ্ছে।

আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ক্ষমতাসীন দলের হাইকমান্ড থেকে সম্ভাব্য এমপি প্রার্থীদের জনগণের কাছে যাওয়ার তাগিদ দেওয়া হচ্ছে এবং গত কয়েকদিন ধরে হঠাৎ করেই উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বন্যা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ের পর্যবেক্ষণ, রোহিঙ্গা ইস্যু একের পর এক সংকট মোকাবিলা করে সামনের দিকে এগোতে বলা হচ্ছে। জনগণের কাছে না যাওয়া হলে সম্ভাব্য এমপি প্রার্থীদের মনোনয়ন পাওয়া কঠিন হবে।

চলতি বছরের মে মাসে আওয়ামী লীগের এক সংসদীয় দলের সভায় এমপিদের সতর্ক করেছিলেন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও। বলেছিলেন, আগামী নির্বাচনে জনবিচ্ছিন্ন কাউকে মনোনয়ন দেয়া হবে না। এরপর এমপিরা নিজ নিজ এলাকায় ব্যাপক গণসংযোগ ও নির্বাচনি কর্মকা-ে অংশ নেওয়া শুরু করেন। জনপ্রিয়তা পুনরুদ্ধারে কয়েকজন এমপি-মন্ত্রীকেও জনতার কাতারে এসে দাঁড়াতে দেখা গেছে।

মাটিকাটা থেকে মাছধরা, মাটিতে বসে কৃষকের সঙ্গে একসাথে খাওয়ার দৃশ্যও চোখে পড়েছে দেশবাসীর। হাল চাষ থেকে দরিদ্রের ঘরে টিনের চালা লাগিয়ে দেয়া, সবই করেছিলেন আওয়ামী লীগ দলীয় এমপিরা। তারপর হঠাৎ বন্যা আর ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ের পর্যবেক্ষণ নিয়ে মাতামাতিতে সব থমকে যায়। এ দুটির রেশ না কাটতেই চরম আকার ধারণ করেছে রোহিঙ্গা সমস্যা।

জানা গেছে নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ ২০১৮ সালের ২৮ ডিসেম্বর। নির্বাচনি মাঠ দখলে নিতে, সে হিসেবে প্রায় ১৫ মাস বাকি থাকতেই নির্বাচনি প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীরা। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ অনুযায়ী নতুন-পুরনো সম্ভাব্য প্রার্থীরা শুরু করেছিলেন উঠান বৈঠক। সরকারের উন্নয়ন কর্মকা-ের ফিরিস্তি তুলে ধরেছেন। সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও জানান দিচ্ছিলেন তারা।

কিন্তু হঠাৎ করেই আওয়ামী লীগের নির্বাচনি আবহ তৈরির চাকা থমকে যায়। তবে ক্ষমতাসীন দলটির অনেক নেতা মনে করেন, বন্যায় ত্বরিত ত্রাণ তৎপরতার মধ্য দিয়েও আওয়ামী লীগ জনগণের অনেক কাছাকাছি যেতে পেরেছে। চলতি বন্যায় সরকার ও দলের পর্যাপ্ত ত্রাণ বিতরণ ছিল স্মরণীয়। আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য কোনো রাজনৈতিক দল এভাবে জনগণের পাশে ত্রাণ নিয়ে দাঁড়ায়নি। এছাড়া দিনাজপুরের বিরলে এবং গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ বিতরণ রীতিমত জনসভায় পরিণত হয়েছিল। এদিকে, ছাত্রলীগ, যুবলীগের নেতৃবৃন্দরাও বিভিন্নস্থানে অসহায় বন্যার্তদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করেছে।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, ঈদ পরবর্তী সময়ে দলটি আবারও নির্বাচনমুখী কর্মকা- শুরু করবে। আগামী ১২ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজশাহী যাওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে তিনি বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকা- উদ্বোধন করে জনসভায় ভাষণ দেবেন। এর মধ্য দিয়ে আবারও দলের নেতা-কর্মীরা নির্বাচনমুখী হবে। সেখানে হয়তো আগামী নির্বাচন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী দলের নেতা-কর্মীদের নতুন বার্তা দিতে পারেন বলে জানা গেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কঠোর হুঁশিয়ারি ছিল ৫ জানুয়ারির মতো নির্বাচন আর হবে না এবং আগামী নির্বাচনে আমি আর কারও দায়িত্ব নিতে পারব না।

তার এমন ঘোষণার পরপরই বর্তমান এমপি এবং মনোনয়নপ্রত্যাশীদের জনসংযোগের একরকম প্রতিযোগিতা শুরু হয়। বিএনপি থেকে অভিযোগও আসছিল সরকার বিএনপিকে বাদ দিয়েই নির্বাচনি আবহ তৈরি করতে চায়। নিজেদের শক্তির মহড়া দিচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছে বিএনপি। কিন্তু উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ২২ জেলার বন্যা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে আওয়ামী লীগের নির্বাচনি প্রচারণা থমকে দাঁড়ায়। উদ্ধার তৎপরতা ও ত্রাণ বিতরণেই গত এক মাস ব্যস্ত ছিল সরকার ও আওয়ামী লীগ। রাজনীতির ময়দান ছিল ঠাণ্ডা।

এর মধ্যেই হঠাৎ করে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর পর্যবেক্ষণের কিছু অংশের বিরুদ্ধে সাংগঠনিকভাবে আওয়ামী লীগের কেন্দ্র থেকে তৃণমূল নেতারা জনমত গঠন করে। আগস্ট মাসজুড়ে শত শত আলোচনা সভায় আওয়ামী লীগ নেতারা ব্যস্ত ছিলেন ষোড়শ সংশোধনীর পর্যবেক্ষণের ব্যাপারে। প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক উপদেষ্টা গওহর রিজভীর সঙ্গে প্রধান বিচারপতির বৈঠকের পর দৃশ্যপট পাল্টায়। তবু স্বস্তি ফেরেনি আওয়ামী লীগে। মিয়ানমার সরকারের নিপীড়নে রোহিঙ্গাদের ঢল নামে বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে। এত শরণার্থীর ভরণ-পোষণ ও জায়গা দেয়া বাংলাদেশের জন্য অনেকটাই কষ্টসাধ্য। রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে সরকারের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চলছে। বিএনপি থেকে দাবি করা হচ্ছে রোহিঙ্গা সমস্যায় আওয়ামী লীগ সরকার কূটনৈতিকভাবে ব্যর্থ হয়েছে। তাই এ সমস্যা প্রকট হচ্ছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার রোহিঙ্গাদের বিষয়ে খোঁজ-খবর নিতে তুরস্কের ফাস্ট লেডি এমিনি এরদোয়ান বাংলাদেশে আসেন। মিয়ানমারকে আন্তর্জাতিকভাবে চাপ দেওয়া চেষ্টা করছে ক্ষমতাসীন সরকার। এদিকে, বর্তমানে বিএনপির দুই শীর্ষ নেতা বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডনে অবস্থান করছেন। সেখানে সরকারের বিরুদ্ধে কী কৌশল আঁটছেন তারা, তাও ভাবিয়ে তুলছে আওয়ামী লীগের নীতি নির্ধারকদের। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঐতিহ্যগতভাবেই সংকট মোকাবিলা করে আওয়ামী লীগ আজ এ পর্যায়ে এসেছে। আওয়ামী লীগই আন্দোলন ও সংগ্রামের রাজনৈতিক দল।

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সংকট সমাধান করতেই আওয়ামী লীগের জন্ম। প্রতিষ্ঠার পর থেকে ধারাবাহিকভাবে ইতিহাসের প্রতিটি সংকটকে সাহসের সঙ্গে মোকাবিলা করে আওয়ামী লীগ এ জাতিকে স্বাধীনতা দিয়েছে। ভোটের অধিকার, ভাতের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করেছে। আওয়ামী লীগই একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধী ও পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার করেছে। সংকট মোকাবিলা করে আওয়ামী লীগ দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করেছে। আওয়ামী লীগ কোনো সংকটকে ভয় পায় না; সাহস নিয়ে মোকাবিলা করে।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিকবিষয়ক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল আমার সংবাদকে বলেন, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ জনগণের কল্যাণে রাজনীতি করে আসছে। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দেশ স্বাধীন হয়েছে। তারই কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে দেশ আজ মধ্যম আয়ের দেশে রূপ লাভ করেছে। বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। সকল সমস্যা মোকাবিলা করেই যথাযথ সময়ে আগামী নির্বাচন সংবিধান মতই হবে বলে জানান তিনি।