(দিনাজপুর২৪.কম)  হঠাতই প্রভাবশালী দুই মন্ত্রী ও এক এমপিকে নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছে ক্ষমতাসীন আওয়াম লীগ। পবিত্র হজ, রসুল (সা.) ও তাবলিগ জামাতকে কটূক্তি করে লতিফ সিদ্দীকিকে নিয়ে চরম বেকাদায় পড়ে শেষ পর্যন্ত তাকে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দিয়েও কুল রক্ষা হয়নি ৫ জানুুয়ারির ভোটারবিহীন নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসা এ সরকারের। শেষ পর্যন্ত তাকে জেলে নিয়ে কোন রকমে মুখ রক্ষা হয়েছে সরকারের। লতিফ সিদ্দীকির পর আবারও বেকায়দায় পড়লো মন্ত্রিসভার দুই সদস্য ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া এবং খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলামকে নিয়ে। এ যাত্রায় মহাজোট সরকারকে আরও বেকায়দায় ফেলেছে মহিলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ও সংসদ সদস্য পিনু খানের ছেলের প্রকাশ্য এলোপাতাড়ি গুড়ি করে রাজধানীর ইস্কাটনের সেই বহুল আলোচিত খুনের কাহিনী। আওয়ামী লীগের এ তিন হেবিয়েট নেতার মধ্যে দুর্নীতির একটি মামলায় ১৩ বছরের সাজা থাকায় ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার মন্ত্রিত্ব নিয়ে সাংবিধানিক জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলামের বিরুদ্ধে কয়েক শ’ কোটি টাকা গচ্ছা দিয়ে ব্রাজিল থেকে খাবর অযোগ্য পঁচা গম আমদানির খবরে দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড়ে প্রতিনিয়ত বিদ্ধ হচ্ছে মহাজোট সরকার। অন্যদিকে মহিলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ও সংসদ সদস্য পিনু খানের ছেলের প্রকাশ্য খুনের কাহিনী প্রতিদিনই কোন না কোন মিডিয়ার শিরোনাম হচ্ছে। এসব অপকর্মের মাঝেও এখন পর্যান্ত মন্ত্রিত্বসহ দলীয় পদ-পদবি নিয়ে এখন পর্যন্ত তারা সদম্ভে ঘুরে ফিরছেন। ফলে জনমোনে সরকারের ভাবমূর্তি প্রতিনিয়তই শিকেয় উঠছে বলে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। তাছাড়া তিন নেতার নানা কর্মকাণ্ড নিয়ে দল ও সরকারের ভেতরে-বাইরে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি উঠছে দলের বিভিন্ন ফোরামে। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ওই তিন নেতার আমলনামা ব্যাপকভাবে বিশ্লেষণ করছেন। দল ও সরকারের ইমেজ নষ্ট করার অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে যেকোনো সময় বড় ধরনের সিদ্ধান্তের ঘোষণা দিতে পারেন তিনি। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, দুর্নীতির একটি মামলায় সাজা থাকায় ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার মন্ত্রিত্ব নিয়ে সাংবিধানিক জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশ সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদের ২ ধারার (ঘ) উপধারায় বলা আছে, ‘কোনো ব্যক্তি সংসদের সদস্য নির্বাচিত হবার এবং সংসদ সদস্য থাকবার যোগ্য হবেন না, যদি তিনি নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে অন্যূন দু বছর কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন এবং তার মুক্তিলাভের পর পাঁচ বছর অতিবাহিত না হয়ে থাকে।’ মায়া ২০০৮ সালে জ্ঞাত আয়ের বাইরে অবৈধভাবে ছয় কোটির টাকার বেশি সম্পদ অর্জনের মামলায় ১৩ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। ২০১০ সালের অক্টোবরে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ শুধু আইনি প্রশ্নে ওই রায় বাতিল করেন। দুদক এর বিরুদ্ধে আপিল করে। গত ১৪ জুন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ হাইকোর্টের ওই রায় বাতিল করে হাইকোর্টে আপিলের পুনঃশুনানির নির্দেশ দেন। ফলে মায়ার বিরুদ্ধে ঢাকার বিশেষ আদালতে দেয়া ১৩ বছরের সাজা বহাল রয়েছে। বুধবার এ মামলায় সুপ্রিম কোর্টের আদেশের কপি প্রকাশিত হয়। যাতে বলা হয়েছে, এ মামলায় হাইকোর্ট বিভাগ জুডিশিয়াল মাইন্ড প্রয়োগ করেনি। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ১৪ জুন থেকে মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার মন্ত্রিত্ব ও সংসদ সদস্য পদ খারিজ হয়ে গেছে। তাই মায়ার মন্ত্রিত্ব ও সংসদ সদস্যপদে বহাল থাকা নিয়ে তুমুল বিতর্ক চলছে। এর আগে গত বছর নারায়ণগঞ্জে চাঞ্চল্যকর সাত খুনের ঘটনায় জামাতা র‌্যাবের কর্মকর্তা লে. কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদের জড়িত থাকার ঘটনায় মায়া ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন। ওই সময় জামাতাকে রায় মন্ত্রী মায়ার দেন-দরবার সরকারের উচ্চমহলকে ুব্ধ করে। ফলে তাকে মন্ত্রিত্ব থেকে বাদ দিতে দলের ভেতরে বাইরে ব্যাপক চাপের মুখে পড়ে আওয়ামী লীগ। অন্য দিকে ব্রাজিল থেকে চার শ’ কোটি টাকার পচা গম আমদানি করে বেশ চাপের মুখে পড়েছেন খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম। দল ও সরকারে ‘অতিকথনকারী’ হিসেবে পরিচিত প্রভাবশালী এ মন্ত্রীর কর্মকাণ্ডের বিবরণ এখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার টেবিলে। প্রধানমন্ত্রী নিজেও পচা গম সম্পর্কে পুলিশসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছ থেকে স্যাম্পলসহ অভিযোগ পেয়ে খাদ্যসচিব মুশফেকা ইকফাৎকে তিরস্কার করেছেন। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের মাধ্যমে গমের নমুনা সংগ্রহ করার নির্দেশ দিয়েছেন। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এসব গম কেনায় কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে। এত কিছুর পরও গম কেলেঙ্কারির পে সাফাই গেয়ে চলছেন খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম। প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন মতবিনিময় সভায় ব্রাজিলের গম সম্পর্কে বক্তব্য দিয়ে নিজেকে স্বচ্ছ হিসেবে জাহির করার চেষ্টা করছেন। তবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কাছে খবর আছে ব্রাজিলের পর ফ্রান্স থেকেও পচা গম কিনছেন অ্যাডভোকেট কামরুল। খাদ্যমন্ত্রীর এসব কর্মকাণ্ড গভীরভাবে পর্যবেণ করা হচ্ছে। ২০০৯ সালে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কামরুল ইসলাম এমপি নির্বাচিত হয়েই প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। দ্বিতীয় মেয়াদে পদোন্নতি পেয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান তিনি। কিন্তু শুরু থেকেই গম কেনা, নিয়োগ ও বদলিসহ নানা পদেেপ তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠতে শুরু করে। গেল দেড় বছরে খাদ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক পদ থেকে তিন অতিরিক্ত সচিবকে বদলি করিয়েছেন। তার সাথে বনিবনা না হওয়ার কারণেই তাদের সরিয়ে দিয়েছেন এমন অভিযোগ করছেন কেউ কেউ। এ ছাড়া সম্প্রতি অনুষ্ঠিত সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সরকারের এই দুই মন্ত্রী আওয়ামী লীগ সমর্থিত দুই মেয়র প্রার্থীর সরাসরি বিরোধিতা করেন। এ কারণেও তাদের ওপর অসন্তুষ্ট খোদ প্রধানমন্ত্রী ও দল। তাদের দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করাতে বেশ বেগ পেতে হয় আওয়ামী লীগ নীতি নির্ধারকদের। সে জন্য প্রধানমন্ত্রী তাদের ওপর ুব্ধ। এ দিকে দলের আরেক সংসদ সদস্য পিনু খানের ছেলে বখতিয়ার আলম রনি গত ১৩ জুন রাতে রাজধানীর ইস্কাটনে নিজের লাইসেন্সকৃত পিস্তল থেকে এলোপাতাড়ি গুলি করে দুইজন রিকশা ও অটোরিকশা চালককে নির্মমভাবে খুন করেন। অভিযুক্ত রনি এখন পুলিশ হেফাজতে রয়েছেন। এ ঘটনায় দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। দলের ভেতরে-বাইরে চাপে পড়েন রনির মা পিনু খান। তার বিরুদ্ধেও বিভিন্ন সময় দলের পদ-পদবীর অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। তিনি মহিলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হলেও নিজেকে সাধারণ সম্পাদক বলে পরিচয় দিতেন। এ ছাড়া টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা কমিটি দেয়ারও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন স্থানে সম্মেলন করতে গিয়ে পদপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে নানা ধরনের উপহার-উপঢৌকন আদায় করতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্যক্তিগত সফরে লন্ডন অবস্থানকালে পিনু খানের ছেলে রনির এ নৃশংসতার খবর প্রকাশ হয়। তিনি দেশে ফিরে এ ব্যাপারে আরো ভালো করে জেনেছেন। এ ছাড়া মায়া ও কামরুলের আমলনামাও পর্যালোচনা করছেন তিনি। দল ও সরকারের ইমেজ রক্ষায় তাদের বিরুদ্ধে যেকোনো কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারেন তিনি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মহিলা আওয়ামী লীগের একজন নেত্রী বলেন, ৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর পিনু খানের মতো মহিলা লীগের একজন নেত্রীর গুণধর পুত্র পুরান ঢাকায় এভাবে মানুষ খুন করে সরকারকে বিপদে ফেলেছিল। আজ সেই নেত্রী কালের গর্ভে হারিয়ে গেছেন। তাই ক্ষমতার অপব্যবহারের করে পিনু খানরাও পার পাবেন না। এ বিষয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর এক সদস্য বলেন, দলের কোনো নেতানেত্রীর কারণে যদি সরকারের ইমেজে ভাটা পড়ে তবে তাদের ঝেড়ে ফেলতে প্রধানমন্ত্রী একটুও দ্বিধা করবেন না।(ডেস্ক)