rokib-dinajpur24(দিনাজপুর২৪.কম) দশম জাতীয় সংসদের নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার ঘটনাকে রাজনৈতিক খেলা বলে জানিয়েছেন বিদায়ী নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ। পাঁচ বছর আগে দায়িত্বে আসা কাজী রকিবউদ্দিন আহমদ কমিশনের মেয়াদপূর্ণ উপলক্ষে গতকাল বুধবার দুপুরে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব ভবনে আনুষ্ঠানিক সাংবাদিক সম্মেলনে একথা বলেন।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচন না হলে দেশে অসাংবিধানিক ও অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো বলেও দাবি করেন বিদায়ী সিইসি। তিনি বলেন, যেসব দল ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতা বদলের পক্ষে ছিল, তারাই নির্বাচনে অংশ নেয়। শত চেষ্টা করেও কয়েকটি দলকে নির্বাচনে আনা যায়নি, তখন সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার স্বার্থে আমরা নির্বাচন করেছিলাম বলে জানান প্রধান নির্বাচন কমিশনার। একই সঙ্গে মেয়াদের পাঁচ বছরে এই কমিশনের কোনো ব্যর্থতা নেই বলেও দাবি করেন বিদায়ী সিইসি।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্ন শোনেন এবং তার জবাব দেন কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ। কথা বলেন, ব্যর্থতা ও নানা কাজের সমালোচনা ইস্যুতে। তিনি বলেন, গত ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সাংবিধানিক পদে দায়িত্ব¡ গ্রহণের পর থেকে বিদায়ের শেষদিন পর্যন্ত তার কমিশনের কোনো ব্যর্থতা নেই। তবে, ভালো কাজের স্বীকৃতি দেশের জনগণের জন্য উৎসর্গ করেন এবং যত ব্যর্থতা সব দায় তার নিজের কাঁধে নেন বিদায়ী সিইসি। প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেন, গত পাঁচ বছরে আমরা অনেক কঠিন সমস্যার মুখোমুখি হয়েছি। সেগুলো আমরা সফলতার বছরে আমরা অনেক কঠিন সমস্যার মুখোমুখি হয়েছি। সেগুলো আমরা সফলতার সঙ্গে কাটিয়ে উঠতে পেরেছি। নির্বাচন কমিশনের কর্মকান্ড আমরা গতিশীল করেছি। আমরা সাফল্যের সঙ্গে ছয়টি সিটি (বরিশাল, খুলনা, সিলেট, রাজশাহী, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ ) নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে পেরেছি।

দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম কর্মদিবসের উদ্ধৃতি টেনে তিনি বলেন, ওই সময়ে আমরা বলেছিলাম, আমরা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করবো। দায়িত্ব নেওয়ার পর ৬টি সিটি করপোরেশনে নির্বাচন করার মাধ্যমে আমাদের সেই নিরপেক্ষতার প্রমাণ আমরা দিয়েছি। ওইসব নির্বাচনের পর অনেক রাজনৈতিক নেতাই আমাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আমাদের ভূমিকার প্রশংসা করেছেন। ওই সময় তারা এও বলেছেন, আমরা রাজনৈতিক কারণে বাইরে আপনাদের সমালোচনা করি। আপনারা এতে কিছু মনে করবেন না।

সিইসি কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, পাঁচ বছরে দায়িত্ব পালনকালে তাদের কমিশনের কোনো ব্যর্থতা নেই। ছিল না কোনো নির্দেশনার ফোন। কোনো ধরনের চাপও ছিল না। তাদের সময়টি ছিল সফলতার। যা কিছু করেছি জাতির জন্য করেছি।

উল্লেখ্য, নিজেদের মেয়াদে ইভিএম বন্ধের পর পুনরায় তা চালু করতে না পারা, নিজেদের ক্ষমতা (আরপিও ৯১ ই ধারা বাতিল) কমানোর অভিপ্রায়, ইসিতে জ্যেষ্ঠতা নিয়ে বিরোধ ও মাঠ প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে কাজী রকিবের ইসিকে। মেয়াদের শুরুতে সংলাপ করলেও পরে আর সে ধরনের কোনো উদ্যোগ না নেওয়ার কারণেও এ কমিশনকে প্রশ্নবিদ্ধ হতে হয়েছে।

এদিকে, বিতর্কিত পাঁচ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ বলেন, সমঝোতা না হওয়ায় আমাদের জন্য নির্বাচন করা চ্যালেঞ্জের বিষয় হয়ে যায়। তখন জাতির ক্রান্তিলগ্ন, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় আমাদের নির্বাচন করা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। নির্বাচন বর্জনকারী দলগুলো দেশজুড়ে সহিংস কার্যক্রম চালিয়ে জানমালের ক্ষতি করছিল, তখন নির্বাচন না হলে অসাংবিধানিক ও অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো। নির্বাচনের সময় যারা আহত-নিহত হয়েছেন, সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন পরিচালনা করেছেন, তাদের আত্মদানের কারণেই দেশে শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ইদানীং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অনেক ইতিবাচক বিষয় লক্ষ করা যাচ্ছে। আশ?া করি, দলগুলোর মধ্যে গণতান্ত্রিক চর্চা বাড়বে। একটি নির্বাচন কখনো লাথি মেরে, বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে সুষ্ঠু করা যায় না। এ জন্য গণতন্ত্রিক চর্চার উন্নয়ন দরকার, যোগ করেন বিদায়ী সিইসি। বলেন, তাই নির্বাচন করতে গিয়ে কর্মকর্তারা অসীম সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন। তাদের সাহসিকতায় দেশে আজ উন্নয়নের ধারা অব্যাহত আছে। আমাদের মেয়াদে আমরা একটি সংসদ নির্বাচন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনসহ সাত হাজার ৪০৭টির বেশি নির্বাচন নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করেছি।

বিদায়ী সিইসি আরো বলেন, পরবর্তীতে যে সহিংসতাগুলো হয়েছে, সেগুলো রাজনৈতিক কারণে। গণতান্ত্রিক চর্চাটা আমাদের দেশে সেভাবে নেই, কেননা বারবার কালো থাবা এসে পড়েছে। ভারতের মতো গণতন্ত্র চর্চা এখানে থাকলে আমাদের নির্বাচনেও সহিংসতা অনেক কমে আসতো। নতুন কমিশন ইতোমধ্যে নিয়োগ পেয়েছে। তাদের জন্য আমার কোনো পরামর্শ নেই, তবে আশ?া করবো আগামীতে তারা সফলভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠান করবে।

নির্বাচন কমিশনে নতুন নিয়োগপ্রাপ্তরা শপথ নেবেন ১৫ ফেব্রুয়ারি। নিয়োগ পাওয়া এই পাঁচজন হলেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদা, নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার, শাহাদৎ হোসেন চৌধুরী, কবিতা খানম ও মো. রফিকুল ইসলাম। এদিন বেলা তিনটায় জাজেস লাউঞ্জে তাদের শপথবাক্য পাঠ করাবেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা।

এক প্রশ্নের জবাবে কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ বলেন, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেড় শতাধিক সাংসদ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হন, এমনটা হওয়ার বিষয়টি আইনেই আছে। মাঠ ছেড়ে দিলে তো প্রতিপক্ষ গোল দেবেই। ইট’স আ পলিটিক্যাল গেম, কেউ না এলে অন্য দল তো ফাঁকা মাঠে গোল দেবেই। উন্নত বিশ্বে এর চেয়ে অনেক বেশি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় (১৫৩জন) জয়ী হওয়ার রেকর্ড রয়েছে। দশম সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সহিংসতা হয়, কেবল ভোটের দিনই নিহত হন অন্তত ২১ জন। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে গান্ধীর উদাহরণ টেনে সিইসি বলেন, ওই নেতা নির্বাচন বর্জন করলে ১৯২০ সালে এখানের চেয়ে বেশি বিনা-প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়েছিলেন। গুগলে সার্চ দিলেও তা আপনারা পেয়ে যাবেন বলেন কাজী রকিবউদ্দীন।

তার মেয়াদে দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা নষ্ট হয়ে গেছেÑ এমন অভিযোগের বিষয়ে রকিবউদ্দীন বলেন, আমাদের কোনো ব্যর্থতা নেই। তবে এ নিয়ে আত্মতুষ্টিতেও ভোগী না। আমাদের মূল্যায়ন করবে ভবিষ্যৎ। কারণ ইতিহাস একদিকে লেখা হয় না, ধীরে ধীরে লেখা হয়। তিনি বলেন, আমরা নির্বাচন ব্যবস্থাকে দুর্বল অবস্থায় নিয়ে যাইনি। দেশে কথায় কথায় মারামারি বেড়ে গেছে। এটা এক ধরনের সামাজিক অবক্ষয়। মানুষের মধ্যে সহিষ্ণুতার অভাবের কারণে হানাহানি বেড়েছে।

বিদায়ী সিইসি বলেন, দায়িত্ব পালনের সময় অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছি। সফলতার সঙ্গেই সব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেছি। নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনে সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছি। তিনি বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে নিজের মেয়াদকালে সকলকে খুশি করা যায়নি। সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থেই অনেক ক্ষেত্রে আমাকে রূঢ় আচরণ করতে হয়েছে। বিশেষ করে গণমাধ্যম কর্মীদের মনে নিজের অজান্তে কষ্ট দিয়ে থাকলে মাফ চাইছি। যা করেছি বা বলেছি তা আমার ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য নয়, দেশের জন্য, জাতির জন্য তা করতে হয়েছে। নির্বাচনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বিদায়ী সিইসি বলেন, আমি যা ভালো করেছি তার কৃতিত্ব আপনাদের সবার। আমি যা খারাপ করেছি সেটার দায়দায়িত্ব আমার।

এ সময় ইসির সফলতা তুলে ধরেন। বলেন, আমরা পাঁচবছর মেয়াদে স্মার্টকার্ড দিয়েছি, নতুন ভবন উদ্বোধন করেছি, ভোটার তালিকা হালনাগাদ করেছি, ছিটমহলবাসীদের ভোটার করেছি এবং জাতীয় পরিচয়পত্র সেবা উপজেলায় নিয়ে যেতে প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণ করেছি।

২০১২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ। গতকাল বুধবার ৮ ফেব্রুয়ারি পাঁচবছর মেয়াদ পূর্ণ হলো এই নির্বাচন কমিশনের। সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচন কমিশনার (অব.) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জাবেদ আলী, মো. শাহনেওয়াজ, মোহাম্মদ আবু হাফিজ উপস্থিত ছিলেন। তবে, আবদুল মোবারক কেন ব্রিফিংয়ে অনুপস্থিত ছিলেন তার কারণ জানা যায়নি। রাতে কমিশনকে বিদায়ী সংবর্ধনা দেয় ইসির কর্মকর্তারা। -ডেস্ক