(দিনাজপুর ২৪.কম) ২১ আগস্টে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার মামলার বিচার এখন শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই এ বিচারকাজ শেষ হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। মামলার রাষ্ট্রপক্ষের একজন আইনজীবীও এ আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের সন্ত্রাস বিরোধী সমাবেশে গ্রেনেড হামলায় মহিলা আওয়ামী লীগ সভানেত্রী আইভি রহমানসহ দলের ২৪ জন নেতা-কর্মী প্রাণ হারান। গ্রেনেড হামলার মামলা পরিচালনাকারী সরকারি কৌঁসুলি এডভোকেট মোশাররফ হোসেন কাজল জানান, এ বছরের মধ্যেই ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা মামলার বিচার কাজ সম্পন্ন করতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। দৃঢ় আশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, মামলাটির বিচারকার্য সম্পন্ন করতে আর সর্বোচ্চ চার থেকে সাড়ে চার মাস সময় লাগবে। ইতোমধ্যে ১৭৬ জনের সাক্ষ্য নেয়া হয়েছে। আর খুব বেশি হলে ৪০ জনের সাক্ষ্য নেয়া হবে।
কাজল বলেন, বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান এবং চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমানসহ মামলার চার্জশিটভুক্ত ৫২জন আসামীর মধ্যে ১৯ জন এখনো পলাতক রয়েছে। অভিযুক্তদের মধ্যে ২৬ জন কারাগারে আটক রয়েছে এবং সাবেক ৩জন আইজিপিসহ আটজন জামিনে রয়েছেন। মামলার বিচার কার্যে বিলম্ব সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিলম্বের প্রধান কারণ হচ্ছে ঢাকার বাইরে অভিযুক্তদের আনা-নেয়া করা। মামলার কয়েকজন আসামী অন্য ফৌজদারী মামলারও আসামী।
২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা মামলার কয়েকজন আসামী চট্টগ্রামের ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলার আসামী। কয়েকজন ঢাকার রমনা বটমূলে বিস্ফোরণ মামলার আসামী। কয়েকজন গোপালগঞ্জে ৭৬ কিলোগ্রাম বোমা পুঁতে রাখা মামলার এবং কয়েকজন সিলেটে শাহজালাল মাজারে যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূতের ওপর গ্রেনেড হামলা মামলার আসামী। মামলার একজন আসামী সাবেক মন্ত্রী ও জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ মামলার আসামী।
সরকারি আইনজীবী বলেন, বর্তমান আদালত এ ধরনের মামলার বিচারকার্য পরিচালনার জন্য খুবই ছোট। মামলার আসামীদের সাথে রাষ্ট্রীয় ও আসামীপক্ষে আইনজীবীদের একই আসনে বসতে হয়। তিনি বলেন, আমরা মামলাটির দ্রুত বিচারের জন্য সোম, মঙ্গল ও বুধবার শুনানির ৩টি স্থায়ী তারিখ নির্ধারণ এবং বকশীবাজারে একটি অস্থায়ী আদালত স্থাপন করাসহ একটি প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়েছি।
বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়ে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীকে হত্যা করার লক্ষ্যে ২০০৪ সালের ২১ আগস্টে দলের এক সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে এই ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। এতে মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী এবং বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রীসহ ২৪ জন নিহত হন এবং পাঁচ শতাধিক নেতা-কর্মী আহত হয়। তাদের মধ্যে অনেকে সারাজীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে গেছে।
আল্লাহর অশেষ রহমতে সে সময়ের বিরোধী দলীয় নেত্রী এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও দলের অন্যান্য সিনিয়র নেতারা প্রাণে বেঁচে যান। আওয়ামী লীগ নেতা এবং ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র মরহুম মোহাম্মদ হানিফ মানব ঢাল রচনা করে সেদিনে দলের প্রধান শেখ হাসিনাকে প্রাণে বাঁচিয়ে ছিলেন। এ ঘটনায় দু’টি পৃথক মামলা হয়। একটি হত্যা মামলা এবং অপরটি বিস্ফোরক আইনে মামলা। সিআইডি মামলার নতুন তদন্ত করে ২০১২ সালের ৩ জুলাই ৩০ জনের বিরুদ্ধে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় দু’টি পৃথক সম্পূরক চার্জশিট দাখিল করে।
এর আগে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই সিআইডি বিএনপির একজন সাবেক উপমন্ত্রীসহ ২২ জনকে আসামী করে চার্জশিট দেয়। প্রকৃত অপরাধীদেরকে আড়াল করে মামলাটি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে এই চার্জশিট তৈরি করে। পরবর্তীতে সরকারি দলের নেতাদের দাবিতে মামলার পুনরায় তদন্ত করা হয়। বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়ে তদন্ত ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে সিআইডি কর্মকর্তাদের সাজানো জজ মিয়া নাটক নিয়ে সংবাদপত্রগুলো চটকদার প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার মামলাটির নতুন করে তদন্ত করার নির্দেশ দেয়। শীর্ষ পর্যায়ের একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, আমাদের কাছে তথ্য আছে, মামলায় চার্জশিটভুক্ত আসামী ৫২ জনের মধ্যে ১৯ জন বিদেশে অবস্থান করছে এবং যতশিগগির সম্ভব তাদেরকে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে। তিনি বলেন, ইন্টারপোলের কাছে চার্জশিটভুক্ত আসামীদের তালিকা পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি জামিনে থাকা কোন আসামী যাতে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে না পারে সে ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে।
আসামীদের মধ্যে সাবেক মন্ত্রী এবং জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু এবং হরকাতুল জিহাদ প্রধান মুফতি আবদুল হান্নান কারাগারে আটক রয়েছে। পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক আশরাফুল হুদা, শহীদুল হক এবং খোদা বক্স চৌধুরী, সিআইডির সাবেক এসপি রুহুল আমিন, সিআইডি’র সাবেক এএসপি আতিকুর রহমান ও আবদুর রশীদ জামিনে আছে।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, ১৯ জন পলাতক আসামীর মধ্যে তারেক রহমান বর্তমানে লন্ডনে এবং হারিছ চৌধুরী ভারতের আসামে অবস্থান করছেন। অন্যদের মধ্যে শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ ব্যাংককে, হানিফ এন্টারপ্রাইজের মাকি মোহম্মদ হানিফ কলকাতা, মেজর জেনারেল (অব.) এটিএম আমিন আমেরিকায়, লে. কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ারদার কানাডায়, বাবু ওরফে রাতুল বাবু ভারতে, আনিসুল মোরসালিন এবং তার ভাই মোহিবুল মুত্তাকিন ভারতের কারাগারে আটক রয়েছে।
সূত্র আরো জানায়, আসামীদের মধ্যে জঙ্গি নেতা শফিকুর রহমান, মুফতি আবদুল হাই, মাওলানা আবু বক্কর, ইকবাল খলিলুর রহমান, জাহাঙ্গীর আলম ওরফে বাবর, মাওলানা লিটন ওরফে জোবায়ের ওরফে দেলোয়ার এবং মাওলানা তাজুল ইসলাম, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ডেপুটি কমিশনার (দক্ষিণ) মোহাম্মদ ওবায়দুর রহমান ও খান সাঈদ হাসান বিদেশে অবস্থান করছে। পলাতক আসামীদের মধ্যে মাওলানা তাজউদ্দিন ও বাবু সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর ভাই।(ডেস্ক)