(দিনাজপুর২৪.কম) আগামী ২০৪১ সালের মধ্যে সমৃদ্ধ দেশ গড়তে ৭ দশমিক ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যকে সামনে রেখে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জন্য ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকার বাজেট পেশ করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (০৭জুন) অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত জাতীয় সংসদে সমৃদ্ধ আগামীর পথযাত্রায় বাংলাদেশ শ্লোগান সম্বলিত এ বাজেট পেশ করেন। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে অর্থায়নের অন্যতম উৎস কর। টাকা আসবে বেশিরভাগই জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) নিয়ন্ত্রিত কর থেকে। প্রস্তাবিত বাজেটের ৬৩ দশমিক ৭ শতাংশ অর্থ আসবে ওই কর থেকে, যা দেশের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ দেবে। এ ছাড়া বৈদেশিক ঋণ থেকে আসবে ১০ দশমিক ৮ শতাংশ। বাজেটে মোট রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৩৯ হাজার ২৮০ কোটি টাকা, যা জিডিপি’র ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সূত্রে আয় ধরা হয়েছে ২ লাখ ৯৬ হাজার ২০১ কোটি টাকা, যা জিডিপি’র ১১ দশমিক ৭ শতাংশ। এছাড়া, এনবিআর বহির্ভূত সূত্র থেকে কর রাজস্ব ধরা হয়েছে ৯ হাজার ৭২৭ কোটি টাকা, যা জিডিপির ০.৪ শতাংশ। কর বহির্ভূত খাত থেকে রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে ৩৩ হাজার ৫৫২ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১.৩ শতাংশ। প্রস্তাবিত বাজেটে অনুন্নয়নসহ অন্যান্য খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ লাখ ৯১ হাজার ৫৩৭ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১১.৫ শতাংশ। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে ১ লাখ ৭৩ হাজার কোটি টাকা।

প্রস্তাবিত বাজেটে সার্বিক বাজেট ঘাটতি ১ লাখ ২৫ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা দেখানো হয়েছে, যা জিডিপির ৪ দশমিক ৯ শতাংশ। এ ঘাটতি অর্থায়নে বৈদেশিক সূত্র থেকে ৫৪ হাজার ৬৭ কোটি টাকা, যা জিডিপির ২.১ শতাংশ এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ৭১ হাজার ২২৬ কোটি টাকা, যা জিডিপি’র ২.৮ শতাংশ। অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ৪২ হাজার ২৯ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১.৭ শতাংশ এবং সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য ব্যাংক বহির্ভূত উৎস থেকে ২৯ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা সংস্থানের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।প্রস্তাবিত বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৭. ৮ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া প্রস্তাবিত বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৫.৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে আজ দুপুরে সংসদ ভবনের মন্ত্রিসভা কক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিপরিষদের সভায় প্রস্তাবিত বাজেট অনুমোদন করা হয়। এরপরই রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ প্রস্তাবিত বাজেটে সম্মতি প্রদান করেন।

এছাড়াও অর্থমন্ত্রী আজ ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জন্য ৩ লাখ ৭১ হাজার কোটি টাকার সংশোধিত বাজেট পেশ করেন। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেট ছিল ৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকা। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠনের পর এটি হচ্ছে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের পঞ্চম বাজেট। এছাড়া গত বছরের মতো এবারও সংসদে বিরোধীদলের উপস্থিতিতে বাজেট পেশ করা হলো। প্রস্তাবিত বাজেটের উন্নয়নের লক্ষ্য ও কৌশল হচ্ছে টেকসই উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে জনগণের জীবনমান উন্নয়ন। অর্থমন্ত্রী বেলা ১২টা ৫২ মিনিটে বাজেট বক্তৃতার শুরুতে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, চার জাতীয় নেতা, মহান ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে শহীদ, অকুতোভয় বীর মুক্তিযোদ্ধা, গণতন্ত্র ও মৌলবাদ বিরোধী আন্দোলনে আত্মদানকারী শহীদ, ’৭৫-এর কালোরাত্রিতে নির্মম হত্যাকান্ডের শিকার বঙ্গবন্ধুর নিষ্পাপ স্বজন এবং অন্যান্য শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এর আগে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকে সাথে নিয়ে অধিবেশন কক্ষে প্রবেশ করেন।

রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ সংসদে রাষ্ট্রপতির গ্যালারিতে বসে বাজেট বক্তৃতা শোনেন। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনসহ বিভিন্ন বিদেশী কূটনীতিক, উন্নয়ন সহযোগী ও দাতা সংস্থার প্রতিনিধি, বিশিষ্ট আমন্ত্রিত ব্যক্তি এবং ঊর্ধ্বতন বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তারাও সংসদ ভবনে উপস্থিত থেকে বাজেট বক্তৃতা শোনেন। বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, ১৯৭৫ সালেল ১৫ আগস্ট দেশশত্রু কতিপয় কুচক্রী জাতির পিতাকে হত্যা কওে জাতিকে রুদ্ধ করার ঘৃণ্য পদক্ষেপ নেয়। তিনি বলেন,এ কুচক্রীদের দেশবিরোধী কার্যকলাপ জাতিকে ১৬ বছরের জন্য জিম্মি করে রাখে। কিন্তু অপ্রতিরোধ্য এ জাতি প্রায় বিনা রক্তে বিপ্লব সাধন করে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে। এই গণতন্ত্রকে সুসংহত করার অগ্রযাত্রা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে শুরু হয়। তার নেতৃত্বে ২০০৯ সাল থেকে জাতির অগ্রযাত্রা অব্যাহত রয়েছে। এর ফলে জাতিসংঘ থেকে বাংলাদেশকে স্বল্পন্নত দেশ থেকে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। অচিরেই বাংলাদেশ উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে পরিনত হবে।

মুহিত বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিকে উন্নয়নের সোপানে নিয়ে যেতে ২০২১ ও ২০৪১ সালের লক্ষ্যমাত্রি স্থির করে দিয়েছেন। ২০২১ সালের লক্ষমাত্রা অনুযায়ি দেশ মধ্যম আয়ের দেশের দ্বারপ্রান্তে আর ২৪১ সালের রক্ষ্য অনুযায়ি সুখী সমৃদ্ধ দেশ গড়তে সরকার কাজ করে যাচ্ছে।তিনি বাজেট বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জন ও অভূতপূর্ব উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃতি অর্জনের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দ্রুততম সময়ে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের রূপরেখা বাস্তবায়নে বর্তমান সরকারের ঈর্ষণীয় সক্ষমতা ইতোমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে। এটি শুধু সরকারের দাবি নয়, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সত্য। ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে একদিন যে দেশকে অবজ্ঞা করা হয়েছে, সে দেশ বিশ্ববাসীর কাছে এখন এক ‘উন্নয়ন-বিস্ময়’, বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অগ্রযাত্রা এখন বিশ্বের রোল মডেল।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের পরিসংখ্যান মতে নামিক জিডিপি’র ভিত্তিতে বর্তমানে বাংলাদেশ পৃথিবীর ৪৩তম বৃহৎ অর্থনীতি আর ক্রয় ক্ষমতা সমতার ভিত্তিতে বাংলাদেশের অবস্থান ৩২তম। ২০১৭ সালে দ্রুততর প্রবৃদ্ধি অর্জনকারী শীর্ষ দশটি দেশের তালিকায় বাংলাদেশও রয়েছে। ‘প্রাইস ওয়াটার হাউজ কুপারস’-এর প্রক্ষেপণমতে ২০৩০ সাল নাগাদ বাংলাদেশ হবে বিশ্বের ২৮তম বৃহত্তম অর্থনীতি এবং ২০৫০ সালে বাংলাদেশের অবস্থান হবে ২৩তম। অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় গত ৯ বছরে বিভিন্ন খাতে সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন চিত্র বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন। বিশেষ করে গত ৯ বছরে বিভিন্ন সংকট মোকাবেলায় সাফল্য, বিদ্যুৎ-জ্বালানি, ডিজিটাল বাংলাদেশ, কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, যোগাযোগ, শিল্প-বাণিজ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, প্রবাসী কল্যাণ, নারী ও শিশু, ভূমি ব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, আমদানি-রপ্তানি, রেমিট্যান্স ও জনশক্তি রপ্তানি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও বিনিময় হার, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, স্থানীয় সরকার পুনর্গঠন ও ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ, কর্মসংস্থানসহ সকল ক্ষেত্রে অর্জিত সাফল্যের বর্ণনা করেন।

এদিকে প্রস্তাবিত বাজেটে সামাজিক অবকাঠামোগত খাতে মোট বরাদ্দের ২৭ দশমিক ৩৪ শতাংশ, যার মধ্যে মানব সম্পদ খাতে- শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য খাতে ২৪.৩৭ শতাংশ, ভৌত অবকাঠামো খাতে ৩০.৯৯ শতাংশ- যার মধ্যে রয়েছে সার্বিক কৃষি ও পল্লী উন্নয়ন খাতে ১২.৬৮ শতাংশ, বৃহত্তর যোগাযোগ খাতে ১১.৪৩ শতাংশ এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ৫.৩৬ শতাংশ। এছাড়া সাধারণ সেবা খাতে ২৫.৩০ শতাংশ, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) এবং বিভিন্ন শিল্পে আর্থিক সহায়তা, ভর্তুকি, রাষ্ট্রায়ত্ত, বাণিজ্যিক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের জন্য ব্যয় বাবদ ৪.৭৮ শতাংশ। এছাড়া সুদ পরিশোধ বাবদ ১১.০৫ শতাংশ। নিট ঋণদান ও অন্যান্য ব্যয় খাতে অবশিষ্ট ০.৫৪ শতাংশ বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা, যোগাযোগ অবকাঠামো, ভৌত অবকাঠামো, আবাস, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, কৃষি, মানবসম্পদ উন্নয়ন খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

মূল্যস্ফীতি ৫.৬ শতাংশঃ গড় মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৬ শতাংশে রাখার রাখার লক্ষ্য ঠিক করে বর্তমান সরকারের শেষ বাজেট ঘোষণা করেছেন অর্থমন্ত্রী। সংসদে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জন্য প্রায় পৌনে পাঁচ লাখ কোটি টাকার এই বাজেট প্রস্তাব করেন তিনি। বিদায়ী ২০১৭-১৮ অর্থবছরে অর্থনীতির অন্যতম প্রধান এই সূচক ৫ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার ঘোষণা দিয়েছিলেন মুহিত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী মে মাস শেষে (২০১৭ সালের জুন থেকে ২০১৮ সালের মে পর্যন্ত) গড় মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৮১ শতাংশ। আর পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে (মাসওয়ারি) মে মাসে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৫ দশমিক ৫৭ শতাংশ।

৭.৮% প্রবৃদ্ধির আশাঃ সাত দশমিক আট শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরে নতুন অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। যাতে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জন্য ৪ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেন মুহিত। রাজস্ব আয়, বিনিয়োগ ও বৈদেশিক সাহায্য বৃদ্ধি, রপ্তানি আয় ও প্রবাসী আয়ে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের আশা করে প্রবৃদ্ধির এই লক্ষ্যমাত্রা ধরেছেন তিনি। নতুন বাজেটে টাকার অংকে জিডিপি ধরা হয়েছে ২৫ লাখ ৩৭ হাজার ৮৪৯ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে জিডিপির আকার ২২ লাখ ২৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ধরা হলেও সংশোধিত বাজেটে সেটাকে বাড়িয়ে ২২ লাখ ৩৮ হাজার ৪৯৮ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ছিল ৭ দশমিক ৪ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) নয় মাসের (জুলাই-মার্চ) তথ্য হিসাব করে বলছে, ৭ দশমিক ৬৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। এর আগে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৭ দশমিক ২ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যের বিপরীতে ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়।

ব্যাংকিং খাত ও পুঁজিবাজার নিয়ে যা আছেঃ প্রস্তাবিত বাজেটে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বিদ্যমান আইন প্রয়োগের পাশাপাশি আরো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা জারি ও কার্যক্রম গ্রহণ করা হচ্ছে।এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
*ব্যাংকগুলোতে আমানত ও ঋণের সুদ হার মাসে শুধুমাত্র একবার পরিবর্তন এবং পরিবর্তিত সুদ হার তাৎক্ষণিকভাবে তাদের নিজ নিজ ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে।
*ঋণ এবং আমানতের সুদ হারের ব্যবধান ৫ শতাংশের মধ্যে সীমিত রাখতে হবে।
*কটেজ, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তদের জন্য ঋণ আবেদন ফি ২০০ টাকায় সীমিত রাখা এবং মেয়াদ পূর্তিতে সমন্বয়ের ক্ষেত্রে কোন চার্জ আদায় করা যাবে না।
*বড় ঋণ খেলাপি মনিটরিংয়ের জন্য বিশেষায়িত সফট্ওয়্যার চালু করা হবে।
*সুষ্ঠু এজেন্ট ব্যাংকিং এর নির্দেশনা সম্বলিত গাইডলাইন জারি করা হচ্ছে।
*মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে একক ব্যক্তি মোবাইল হিসাবের স্থিতি সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকায় নির্ধারণ করা হয়েছে।
*স্বল্প সুদে ও সহজশর্তে বিভিন্ন পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের আওতায় বিভিন্ন ধরণের ঋণ সুবিধা প্রদান করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
*ব্যাংকিং সেবা বিষয়ক অভিযোগ নিষ্পত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংকে গ্রাহক সেবা সংরক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে।
*ব্যাংকের মাধ্যমে সন্ত্রাস অর্থায়ন প্রতিরোধ বিষয়ে সর্বোচ্চ সতকর্তা অবলম্বনের জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
*বড় আকারের ঋণগুলোকে আরো নিবিড়ভাবে পরিবীক্ষণ এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ মনিটরিং ব্যবস্থাকে জোরদার করতে কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার (সিডিএলসি) গঠন করা হচ্ছে।
*কোনো কোনো গ্রাহক একই সম্পদ বা জমি জামানত দেখিয়ে ব্যাংক থেকে অনিয়মিতভাবে ঋণ নিয়ে থাকে। এই জালিয়াতি রোধের জন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে সব ঋণের বিপরীতে যে জামানত দেখানো হয়, সে বিষয়ে একটি তথ্যভান্ডার সংরক্ষণ করা হবে। যাতে যে কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এই তথ্য যাচাই করে ঋণ দিতে পারেন। আগামী বছরেই এই তথ্যভান্ডার কার্যকরী হবে।

যেসব পণ্যের দাম বাড়ছে-কমছেঃ জাতীয় সংসদে আজ (৭ জুন) অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত পেশ করছেন ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট। সেখানে তিনি বিভিন্ন পণ্যের ওপর কর বাড়ানো ও কমানোর প্রস্তাব করেন। অর্থমন্ত্রীর প্রস্তাবিত বাজেটে দাম বাড়ানো-কমানোর সে তালিকা এখন পর্যন্ত হাতে এসেছে তার একটি তালিকা তুলে ধরা হলো:যেসব পণ্যের দাম বাড়বেঃ কফি, গ্রিন টি, সুগার কনফেকশনারি, আমদানিকৃত মোবাইল সেট ও ব্যাটারি চার্জার, ইউপিএস/আইপিএস (২০০০ ভোল্ট অ্যাম্পায়ার পর্যন্ত), ভোল্টেজ স্ট্যাবিলাইজার (২০০০ ভোল্ট অ্যাম্পায়ার পর্যন্ত), অটোমেটিক সার্কিট ব্রেকার, ল্যাম্প হোল্ডার, ব্যবহৃত বা পুরনো গাড়ি এবং বাইসাইকেল। ই-কমার্স, এনার্জি ড্রিঙ্কস, কসমেটিকস, লিপস্টিক, নেইল পালিশ, বডি লোশন, টয়লেট্রিস, পারফিউম, বডি স্প্রে, বিড়ি, সিগারেট, বাথটাব, জ্যাকুজি, শাওয়ার ট্রে, পলিথিন, প্লাস্টিক ব্যাগ, ছোট আকারের ফ্লাট, ফার্নিচার, গার্মেন্ট পণ্য। যেসব পণ্যের দাম কমবেঃ ফার্মাসিউটিক্যাল উপাদানের কাঁচামাল, রিফ্রেজারেটর, এয়ার কন্ডিশনার ও কম্পেসার, স্থানীয়ভাবে সংযোজন করা সেল ফোন, হাইব্রিড মটর গাড়ি, মটরসাইকেলের কাঁচামাল, টায়ার, টিউব, সফটওয়ার, বল পয়েন্ট কলম এবং ফিল্ড মিল্ক পাউডার। স্কুলবাস, মাঝারি আকারের ফ্লাট, রুটি, হাতে তৈরি বিস্কুট, ১০০ টাকা কেজির আতে তৈরি কেক, গুঁড়ো দুধ।

বিনাখরচে চিকিৎসা পাবেন মুক্তিযোদ্ধারা, পাচ্ছেন উৎসব ভাতাওঃ মুক্তিযোদ্ধারা বিনাখরচে চিকিৎসা পাচ্ছেন। পাবেন উৎসবও। জাতীয় সংসদে বৃহস্পতিবার (০৭জুন) আগামী ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট বক্তব্যে এ তথ্য জানান অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা উন্নয়নের জন্য দেশের সকল জেলা/উপজেলায় মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণের কাজ চলছে। এ পর্যন্ত ৫৭টি জেলায় ভবন নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে। আমরা দেশের সকল সরকারি হাসপাতালে ও ১৬টি বিশেষায়িত হাসপাতালে মুক্তিযোদ্ধাদের বিনা খরচে চিকিৎসাসেবা প্রদানের উদ্যোগ নিয়েছি। তিনি জানান, ‘ভূমিহীন ও অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের বাসস্থান নির্মাণ’ প্রকল্পের আওতায় ২ হাজার ৮৫২টি ইউনিট নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়েছে; আরও ১১৯টি ইউনিট নির্মাণাধীন আছে। এছাড়াও ৮ হাজার অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাকে আবাসন সুবিধা প্রদানের জন্য জেলা/উপজেলা পর্যায়ে বহুতল ভবন নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের মাধ্যমে সকল বে-সামরিক, সামরিক, শহীদ, খেতাবপ্রাপ্ত ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার কল্যাণ সাধনের লক্ষ্যে ‘বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট আইন, ২০১৮’ এর খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে, যা বর্তমানে জাতীয় সংসদে উপস্থাপনের অপেক্ষায় রয়েছে। আগামী অর্থবছর থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বিজয় দিবস ভাতা চালু করা হচ্ছে।অর্থ মন্ত্রণালয় ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দেশের সূর্যসন্তানদের জন্য বিশেষ সম্মাননা ভাতা বাবদ ‘বিজয় দিবস ভাতা’ নামে প্রত্যেক মুক্তিযোদ্ধা বছরে এককালীন ৫ হাজার টাকা পাবেন। ইলেক্ট্রনিক পদ্ধতি ব্যবহার করে মুক্তিযোদ্ধাদের এই সম্মানী ভাতা দ্রুত তাদের হাতে পৌঁছানো হবে।

জনপ্রশাসনে বরাদ্দ বাড়ল ৪.৪ শতাংশঃ বাজেটের আকার বাড়িয়ে এবার জনপ্রশাসন খাতে সব চেয়ে বেশি বরাদ্দ প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।জনপ্রশাসন খাতে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে সর্বোচ্চ ১৮ শতাংশ বরাদ্দের প্রস্তাব রেখে বাজেট উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে সর্বোচ্চ ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ বরাদ্দ ছিল। আর জনপ্রশাসনে ছিল দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ, ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। আসন্ন অর্থবছরের জন্য জনপ্রশাসনে ১৮ শতাংশ রবাদ্দের প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী, যা গতবারের চেয়ে ৪ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি।অন্যদিকে শিক্ষা ও প্রযুক্তিতে এবার বরাদ্দ ১ দশমিক ৮ শতাংশ কমিয়ে ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ করার প্রস্তাব করেছেন মুহিত। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে জনপ্রশাসন খাতে ৫৪ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এই খাতে ৮৩ হাজার ৫০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে; যা গত অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের চেয়ে ২৯ হাজার ৩০ কোটি টাকা বেশি। জনপ্রশাসন খাতে এবার রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের জন্য ২৩ কোটি টাকা, জাতীয় সংসদের জন্য ৩৩২ কোটি টাকা, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে ২ হাজার ৮০১ কোটি টাকা, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জন্য ১৪৭ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের জন্য ১ হাজার ৮৯৫ কোটি টাকা, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে ২ হাজার ৪৬৪ কোটি টাকা, সরকারি কর্ম কমিশনকে ৭৭ কোটি টাকা এবং অর্থ বিভাগকে ৬৭ হাজার ২৪১ কোটি টাকা, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগকে ২ হাজার ৪২৬ কোটি টাকা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে ২ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা এবং অর্থনৈতিক সম্পরক বিভাগের জন্য ২৭৯ কোটি টাকা রাখা হয়েছে।এছাড়া পরিকল্পনা বিভাগের জন্য ১ হাজার ৩৭৯ কোটি টাকা, বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগে ১৩৫ কোটি টাকা, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগে ৫৯৯ কোটি টাকা এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুকূলে ১ হাজার ২৪৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী।

অনলাইন কেনাকাটায় ভ্যাট ৫ শতাংশঃ অনলাইনে কোনো পণ্য কেনাকাটা করলে (ই-কমার্স/এফ-কমার্স) ৫ শতাংশ ভ্যাট (মূসক) দিতে হবে। অর্থমন্ত্রী তার বক্তৃতায় বলেন, বর্তমানে ইন্টারনেট বা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে পণ্য বা সেবার ক্রয়-বিক্রয় যথেষ্ট বৃদ্ধি পেয়েছে। এ পণ্য বা সেবার পরিসরকে আরো বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে ভার্চুয়াল বিজনেস নামে একটি সেবার সংজ্ঞা সৃষ্টি করা হয়েছে।এর ফলে অনলাইনভিত্তিক যেকোন পণ্য বা সেবার ক্রয়-বিক্রয় বা হস্তান্তরকে এ সেবার আওতাভুক্ত করা সম্ভব হবে। তাই ভার্চুয়াল বিজনেস সেবার উপর ৫ শতাংশ হারে ভ্যাট (মূসক) আরোপ করার প্রস্তাব করছি।

করের আওতায় গুগল-ফেসবুক-ইউটিউবঃ বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, ইউটিউব ও গুগলকে করের আওতায় আনার প্রস্তাব দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলোতে ৩৫ শতাংশ উৎসে কর দিতে বলা হলেও কীভাবে তা আদায় করা হবে তা প্রস্তাবনায় উল্লেখ করেননি তিনি। অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘ভার্চুয়াল ও ডিজিটাল লেনদেনের মাধ্যমে অনেক বিদেশি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে বিপুল অর্থ আয় করছে। এ সত্ত্বেও তাদের কাছ থেকে আমরা তেমন একটা কর পাচ্ছি না। ভার্চুয়াল ও ডিজিটাল লেনদেনের বিষয়টি তুলনামূলক নতুন হওয়ায় এসব লেনদেনকে করের আওতায় আনার মতো পর্যাপ্ত বিধান এতদিন আমাদের কর আইনে ছিল না। এবার তাই ভার্চুয়াল ও ডিজিটাল খাত যেমন- ফেসবুক, গুগল, ইউটিউব ইত্যাদির বাংলাদেশে অর্জিত আয়ের ওপর করারোপের জন্য আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার আলোকে প্রয়োজনীয় আইনি বিধান সংযোজনের প্রস্তাব করা হলো।’ অন্যদিকে অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারিংয়ের (উবার, চলো, পাঠাও ইত্যাদি) ভাড়ার ওপর ৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) আরোপের প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। সেবা গ্রহীতাকে এই কর গুনতে হবে। তবে অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারিং প্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎসে কর দিতে হবে। যারা এসব সেবায় তাদের গাড়ি দেবেন তাদের টিআইএন (ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর) থাকতে হবে। -ডেস্ক