(দিনাজপুর২৪.কম) স্ত্রীকে নির্যাতন ও যৌতুক মামলায় ডিশ ব্যবসায়ী থেকে তারকা বনে যাওয়া বগুড়ার সেই আশরাফুল হোসেন আলম ওরফে হিরো আলমকে আদালতের নির্দেশে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার (০৭মার্চ) দুপুর ১২টার দিকে তাঁকে বগুড়ার অতিরিক্ত মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালতে হাজির করলে বিচারক আহমেদ শাহরিয়ার তারিক তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। বগুড়া সদর থানায় পুলিশের হেফাজতে থাকা হিরো আলম সকালে বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে শ্বশুরের করা মামলাটি সাজানো ও ভিত্তিহীন। তাঁর দাবি, তিনি পূর্ব পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের শিকার। মিউজিক ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ব্যাপক আলোচনায় আসেন বগুড়ার কেবল অপারেটর ব্যবসায়ী হিরো আলম। গত একাদশ জাতীয় সংসদে নির্বাচনে স্বতন্ত্রভাবে বগুড়ায় প্রার্থী হয়েছিলেন তিনি। এ নিয়েও আলোচিত হন হিরো আলম। অভিযোগ উঠেছে, পরকীয়া ও দ্বিতীয় বিয়ের প্রতিবাদ করায় স্ত্রীকে পিটিয়ে আহত করেছেন হিরো আলম। এ ঘটনায় তার স্ত্রী সাবিয়া আক্তার সুমি (২৮) আহত হয়ে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।

এদিকে হিরো আলমের অভিযোগ, শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাকে মারধর করে বাড়ি থেকে ৫ লাখ টাকা লুটে নিয়েছে। উভয় পক্ষই থানায় অভিযোগ করেছে।

বুধবার হিরো আলমের স্ত্রী সুমি অভিযোগ করে বলেন, হিরো আলম ঢাকায় দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। এ কারণে বগুড়ায় থাকা আমার ও সন্তানের কোনো খবর রাখেন না। সংসারের খরচ দেন না। এর প্রতিবাদ করায় আগেও আমাকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করেছেন তিনি।

সুমি জানান, দুই মাস পর গত মঙ্গলবার রাতে হিরো আলম বগুড়া শহরতলীর এরুলিয়া গ্রামে নিজ বাসায় আসেন। বাসায় ফেরার পর থেকে বিছানায় শুয়ে একটানা তিন ঘণ্টা মোবাইলে ঢাকার এক নারীর সঙ্গে কথা বলেন। এর প্রতিবাদ করলে তাকে মারধর করেন আলম। খবর পেয়ে সুমির বাবা ও আত্মীয়রা গিয়ে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন।

হিরো আলমের শ্বশুর সাইফুল ইসলাম বলেন, আলম বেশ কিছুদিন ধরে আমার মেয়েকে নির্যাতন করে আসছিল। এরই ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর সুমিকে আবারও নির্যাতন করে। খবর পেয়ে মেয়ের বাড়িতে গিয়ে ওকে উদ্ধার করে রাতেই হাসপাতালে ভর্তি করি। সুমির মাথার পেছনে রক্তাক্ত জখম হয়েছে।

এ ঘটনায় তিনি হিরো আলমের বিরুদ্ধে থানায় একটি লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, হিরো আলম দীর্ঘদিন ধরে ২ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করে আসছিল। যৌতুকের জন্য সে তার স্ত্রীকে মারধর করত।

এদিকে সুমিকে মারধরের খবর পেয়ে শ্বশুরবাড়ির লোকজন ক্ষিপ্ত হয়ে হিরো আলমকেও মারধর করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনায় হিরো আলম তার শ্বশুর, স্ত্রীসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে বগুড়া সদর থানায় অভিযোগ দায়ের করেছেন।

অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, স্ত্রীর সঙ্গে দাম্পত্য কলহের জের ধরে মঙ্গলবার রাত ৮টার দিকে তার শ্বশুর সাইফুল ইসলাম ও স্ত্রী সাদিয়া বেগম সুমিসহ পাঁচব্যক্তি বাড়িতে এসে তাকে কাঠ দিয়ে মারধর করে। এরপর তার বাসা থেকে ৫ লাখ টাকা লুট করে নিয়ে যায়।

হিরো আলম বলেন, আমি সত্য বলতে কখনো ভয় পাই না আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে দ্বিধা করি না। অনেক আগে থেকেই ডিশের ব্যবসায় নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেছিল আমার শ্বশুর পক্ষের লোকজন। সেই সুযোগকে কাজে লাগাতে যৌতুকের মিথ্যে অভিযোগ তুলে, স্ত্রীকে নির্যাতনের নাটক সাজিয়ে আমাকে নারী নির্যাতন মামলায় ফাঁসিয়েছে। তাছাড়া বিগত নির্বাচনে প্রশাসনের অনিয়ম আর ভোট চুরির প্রতিবাদ করেছিলাম। বড় বড় কর্তাদের বিরুদ্ধে কথা বলেছিলাম। আমাকে মামলায় ফাঁসানোর নেপথ্যে এসব বিষয়ও কাজ করেছে।

হিরো আলম বলেন, ‘আমি সিনেমা ও মডেলিং করি। অধিকাংশ সময় বাইরে থাকতে হয়। আমার ডিশের ব্যবসার আয়-উপার্জন সবকিছুই স্ত্রী সাদিয়া বেগম ওরফে সুমিকে (২৪) ছেড়ে দিয়ে রেখেছিলাম। কোনো যৌতুক চাওয়ার প্রশ্নই আসে না। উল্টো আমার অবর্তমানে অন্যের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়েছেন। এর প্রতিবাদ করায় স্ত্রীর সঙ্গে কথা-কাটাকাটি হয়।

এতে ক্ষিপ্ত হয়ে শ্বশুরবাড়ির লোকজন আমার বাড়িতে হামলা করে। টাকা পয়সা লুট করে। ভাঙচুর করে। আমাকে মারধর করে। ঘটনার পরপরই আমি থানায় লিখিত অভিযোগ করি। পরদিন পুলিশ সালিসের নামে থানায় ডেকেছে, আমি ন্যায় বিচারের আশায় পুলিশের ডাকে বৃহস্পতিবার রাতে স্বেচ্ছায় থানায় এসেছি। অথচ আমার কথা পাত্তা না দিয়ে অদৃশ্য শক্তির চাপে শ্বশুরের সাজানো অভিযোগটা মামলা হিসেবে রেকর্ড করে আমাকে সেই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হচ্ছে। পুলিশ দুই পক্ষের অভিযোগ আমলে নিয়ে তদন্ত করতে পারতেন। কিন্তু অদৃশ্য চাপে আমাকে ফাঁসানো হয়েছে।’

হিরো আলম বলেন, এভাবে সাজানো মামলায় আমাকে কারাগারে আটকে রেখে আমার জনপ্রিয়তা নষ্ট করা যাবে না। কেউ বিশ্বাস করবে না, যে স্ত্রীকে ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে রেখেছি, তাঁকে মাত্র দুই লাখ টাকার জন্য হিরো আলম নির্যাতন করবেন।

বগুড়া সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সনাতন চক্রবর্তী বলেন, স্ত্রীকে নির্যাতনের অভিযোগে শ্বশুর সাইফুল ইসলাম ওরফে খোকন বুধবার বিকেলে হিরো আলমের বিরুদ্ধে বগুড়া সদর থানায় লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন।

আলাদা দুটি অভিযোগ পাওয়ার পর বুধবার রাতে দুই পক্ষকে সদর থানায় ডাকা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে হিরো আলমের বিরুদ্ধে শ্বশুরের দায়ের করা অভিযোগের সত্যতা মিলেছে। এ কারণে ২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। -ডেস্ক