হাফিজুর রহমান হাবিব (দিনাজপুর২৪.কম) কয়েক বছর ধরেই সবুজ চা পাতার ন্যায্য দাম না পাওয়ায় হাপিয়ে উঠেছিলেন দেশের উত্তরের চা শিল্প খ্যাত পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ার চা চাষীরা। গত তিন বছর ধরেই চলছিল তাদের লোকসানের মধ্যে চা আবাদ। শ্রমিকের মজুরী, সার আর কীটনাশকের দামও উঠছিল না চা পাতা কারখানাগুলোতে বিক্রয় করে। এ বছর সেই দুশ্চিন্তার অমানিশা দূর করে আশার আলো দেখাচ্ছে উত্তরা গ্রিন টি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড নামের এক কোম্পানী। কোম্পানীটি ক্ষুদ্র চা চাষীদের কাছ থেকে পূর্বের থেকে দ্বিগুণ মূল্য বাড়িয়ে পাতা কিনছে। এতে করে অন্যান্য চা কারখানাগুলোর মধ্যে শুরু হয়েছে চা পাতা কেনার প্রতিযোগিতা। এতে করে দীর্ঘ সময় ধরে চলে আসা সিন্ডিকেটের কবল থেকে যেন মুক্তি পেতে চলেছে সাধারণ ক্ষুদ্র চা চাষীরা।

বুধবার দুপুরে চা চাষীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, দীর্ঘ সময় ধরে চা পাতা আবাদে লোকসানের ঘানি টানছিলেন। সম্প্রতি পঞ্চগড়ে স্থাপিত উত্তরা গ্রিন টি কারখানা তেঁতুলিয়ায় ক্রয় কেন্দ্র স্থাপন করে চাষীদের কাছ থেকে বেশ দামে পাতা কেনায় আশার আলো দেখছেন। ২৮/৩০ টাকা পর্যন্ত চা পাতা বিক্রয় করতে পারায় হাসি মুখে ফুটেছে তাদের মুখে। উপজেলার সদর ইউনিয়নের দর্জিপাড়া, কানকাটা, শারিয়ালজোত, প্রেমচরণজোত, কাজীপাড়া, আজিজনগর, মাথাফাটা, কালান্দিগঞ্জ, মাঝিপাড়ার বিভিন্ন চা বাগানের চাষীদের সাথে কথা বললে তারা উত্তরা গ্রিন টি কারখানায় আগের চেয়ে অধিক দামে চা পাতা বিক্রয় করতে পেরে আশার কথা জানান। তারা জানান, চা পাতার দাম বাড়ানোর কারণে অন্যান্য কারখানাগুলো সবুজ চা পাতার দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। আর এতে করে সিন্ডিকেট ভাংতে শুরু করেছে।

চা পাতা দাম বাড়ায় মুখে হাসি টেনে দর্জিপাড়া, শারিয়ালজোত, কানকাটা গ্রামের আবুল কালাম, হামিদ, করিম, আনোয়ার, শাহাজাহান, আল মামুন জানান, এ বছর খুব টেনশনে ছিলাম। এমনি বছরের শুরুতে মহামারী করোনা ভাইরাস, তার মধ্যে গত দু’বছর ধরে চা পাতা দাম না পেয়ে খুব লোকসান গুনেছি। এ বছরের প্রথম রাউন্ডেই ১০-১২ টাকা দরে পাতা বিক্রি করেছি। এর মধ্যে গ্রিন টি কারখানা আগের দামের দ্বিগুন বাড়িয়ে পাতা কিনছে, খুব ভালো লাগছে। আনোয়ার হোসেন বলেন, উত্তরা গ্রিন টি আমাদের আশার আলো দেখাচ্ছে। আশা করছি পাতার দাম আরো বাড়বে।

গত (২৫ আগস্ট) মঙ্গলবার বিকেলে উপজেলার তেঁতুলিয়া সরকারি কলেজের নিকটস্থ স্থানে সবুজ চা পাতা ক্রয় কেন্দ্রের উদ্বোধন করা হয়েছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কালান্দিগঞ্জ সিনিয়র মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মোস্তাফিজুর রহমানের সভাপতিত্বে উপস্থিত ছিলেন উত্তরা গ্রীন টি ইন্ডাষ্ট্রিজ লিমিটেড এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক -কাজী এ. এন. এম আমিনুল হক, পরিচালক (অপারেশন ও প্রোডাকশন) আব্দুর রাজ্জাক, পরিচালক (একাউন্টস) শাহা আলম, কৃষকলীগের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি আব্দুল লতিফ তারিন, বিশিষ্ট ব্যবসায় ও সমাজসেবক মোকলেছুর রহমান, তেঁতুলিয়া চা ক্রয় কেন্দ্র ইউনিটের সার্বিক তত্ত্বাবধানে সফর আলী প্রধান, তারেক হোসেন, মহাম্মদ মিঠু, তারা মিয়াসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও চা বাগান মালিকরা।
পরিচালক (অপারেশন ও প্রোডাকশন) আব্দুর রাজ্জাক বলেন, চাষী বাচলে কারখানা বাচবে, আর কারখানা বাচলে চাষী বাচবে। আমরা দুইটিকেই বাচিয়ে রাখতে চাই, চা শিল্পকে এগিয়ে নিতে আমরা সব সময় কাজ করে যাবো এবং সবুজ কাচা চা পাতার নায্য মূল্য দেয়ার চেস্টা করবো।
তেঁতুলিয়া চা ক্রয় কেন্দ্র ইউনিটের সার্বিক তত্ত্বাবধানে সফর আলী প্রধান বলেন আমরা কৃষকদের ন্যায্য মূল্য দিয়ে চা পাতা ক্রয় করি এতে কৃষকের চা চাষে উৎসাহ বৃদ্ধি পায়।

বাংলাদেশ চা বোর্ড পঞ্চগড় অফিস সূত্রে জানা যায়, ২০০০ সালে সীমান্তবর্তী এ জেলায় চা চাষ শুরু হয়। জেলায় বর্তমানে ৭ হাজার ৫৯৮ একর জমিতে চায়ের আবাদ হয়েছে। তার মধ্যে তেঁতুলিয়ায় ১ হাজার ২শত ৯০ হেক্টরও বেশি জমিতে গড়ে উঠেছে চা বাগান। প্রতিবছর বাড়ছে চা চাষ। বেড়েছে ক্ষুদ্র চা চাষী। এ পর্যন্ত নিবন্ধিত বড় চা-বাগান ৮টি ও অনিবন্ধিত বড় চা-বাগান ১৮টি। ছোট চা-বাগান ৮৯১ টি, অনিবন্ধিত পাঁচ হাজার ১৮ শত চা বাগান রয়েছে। চা প্রক্রিয়াজাতের জন্য কারখানা চালু রয়েছে ১৮ টি।

চা একটি দীর্ঘ অর্থকরী ফসল হওয়ায় চা চাষে দেশের তৃতীয় চা অঞ্চল হিসেবে গড়ে উঠেছে দেশের উত্তরাঞ্চলের সীমান্তবর্তী পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া। একসময়ের পতিত গো-চারণ ভূমি এখন চায়ের সবুজ পাতায় ভরে উঠছে। সৃষ্টি হয়েছে মানুষের কর্মসংস্থান। ইউকেএইডের সহায়তায় বিকাশ বাংলাদেশ নামে স্থানীয় একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা দুই বছর আগে সদর ও তেঁতুলিয়া উপজেলার পাঁচ হাজার চাষিকে বিনামূল্যে ২২৩৫টি করে চা চারা ও নগদ আড়াই হাজার টাকা দেয়। এতে ঘুরে যায় এসব চাষির ভাগ্যের চাকা। চা উৎপাদনে দেশের গন্ডি পেরিয়ে এখানকার চা যাচ্ছে আন্তর্জাতিক বাজারে। সিলেট ও পার্বত্য চট্টগ্রামের পরই চা শিল্পের জন্য তৃতীয় অঞ্চল খ্যাত হয়ে উঠে এ অঞ্চলটি।