নুর মোহাম্মদ মিঠু  (দিনাজপুর২৪.কম) মুমূর্ষু রোগীর জীবন বাঁচানোর অন্যতম উপকরণ রক্ত। জীবন বাঁচানোর এ উপকরণ যেমন প্রয়োজনের সময় সব মানুষ সব সময় দিতে পারে না, তেমনি সব সময় হাতের কাছেও পাওয়া যায় না। জীবন রক্ষাকারী এ উপকরণ প্রয়োজনের সময় হাতের কাছে পাওয়া দুরুহ হলেও সক্রিয় প্রতারকচক্রকে পাওয়া যায় ঠিকই। রক্তের প্রয়োজনÑ এমন সংবাদ শোনার অপেক্ষায় রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালগুলোতে বিচরণ করে এ চক্রের সক্রিয় সদস্যরা। রক্তের প্রয়োজন শুনলেই নিজে থেকে ব্যবস্থা করার আশ্বাস দিয়ে রোগীর স্বজনদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে অর্থ। অন্যদিকে আপনজনের জীবন রক্ষার্থে নিরুপায় হয়ে সরল বিশ্বাসে এসব প্রতারকদের অর্থ দিয়ে প্রতারিত হচ্ছেন রোগীর স্বজনরা। শুধু তাই নয়, অনলাইনেও সক্রিয় এ চক্রের সদস্যরা। ফেসুবকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তৎপর এসব প্রতারকচক্রের সদস্যরা রক্তদানে ইচ্ছা পোষণ করে যাতায়াত ভাড়ার নামেও হাতিয়ে নিচ্ছে অর্থ। বিনিময়ে দিচ্ছে না রক্ত। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এ প্রতারকচক্রের সন্ধানে মাঠে থাকলেও সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না পাওয়ায় আইনের আওতায় আনতে পারছে না বলে জানা গেলেও পুলিশ সদর দপ্তর বলছে, অভিযোগ পেলেই এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। কয়েকটি অভিযোগের প্রেক্ষিতে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন প্রতারককে খুঁজছে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।
সম্প্রতি ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের নতুন ভবনের ৬ষ্ঠ তলায় রক্ত চেয়ে প্রতারণার শিকার হয়েছেন মনির নামের একব্যক্তি। তিনি জানান, তার ছোটো বোনের চিকিৎসার জন্য জরুরিভিত্তিতে ৩ ব্যাগ ও-পজেটিভ রক্ত লাগবে বলে জানায় চিকিৎসক। এ অবস্থায় ৩ ব্যাগ রক্তের ব্যবস্থা করা দুরুহ ব্যাপার। রক্তের কথা বলাবলি করতে গিয়ে পাশের এক যুবক ৩ ব্যাগ কেন, প্রয়োজনে তিনি ৫-৬ ব্যাগ রক্ত ম্যানেজ করে দিতে পারবেন বলে জানায়। কিন্তু যারা রক্ত দিবেন তাদের হাসপাতালে আসতে যাতায়াত খরচ দিতে হবে। তার কথামতো তাৎক্ষণিক ৩ জন রক্তদাতার জন্য ৩ হাজার টাকা যাতায়াত ভাড়া দেওয়া হয়। ওই যুবক নিচে গিয়ে বিকাশ করে আবার আসবেন বলে যাওয়ার পর আর ফিরে আসেননি। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে ফেসবুকে জরুরি রক্তের প্রয়োজন উল্লেখ করে ফোন নম্বরসহ রোগীর স্বজনরা পোস্ট করেন। সেখান থেকে ফোন নম্বর সংগ্রহ করে রক্তদানের ইচ্ছা পোষণ করেন এ চক্রের সদস্যরা। এতে যাতায়াত ভাড়া চেয়ে বিকাশ নম্বর দিয়ে প্রতারণা করে চলছে এসব প্রতারকরা। নিজের প্রয়োজনে এসব প্রতারকদের বিকাশে টাকা পাঠিয়ে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন অনেকেই। রাজধানীর মৌচাকে সিরাজুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আত্মীয়ের জন্য রক্ত চেয়ে ফেসবুকে পোস্ট করে এমন প্রতারণার শিকার হয়েছেন আরিফ হাওলাদার নামের আরো একব্যক্তি। তিনি জানান, এবি-পজেটিভ রক্ত চেয়ে ফেসবুকে ফোন নম্বরসহ একটি পোস্ট করি। সেখান থেকে নম্বর নিয়ে একজন ফোন করে রক্ত দিবেন বলে জানান। কিন্তু শর্ত দিয়েছেন, তাকে যাতায়াত ভাড়ার জন্য এক হাজার টাকা বিকাশ করতে হবে। তিনি রাজধানীর উত্তরা থেকে সিএনজি নিয়ে আসবেন। তার কথামতো এক হাজার টাকা বিকাশও করা হয়। টাকা পেয়েছে কিনা জানতে চেয়ে ফোন করলে তিনি টাকা পেয়েছেন বলেও জানান। কিন্তু এর এক ঘণ্টা পর তার অবস্থান জানতে ফোন করলে মোবাইল নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। পরে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে শান্তিনগর কোয়ান্টামে গিয়ে ৭৫০ টাকায় এক ব্যাগ রক্ত কিনে এনে রোগীর শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়। এছাড়াও বিভিন্ন সময় বিভিন্ন হাসপাতাল কিংবা ব্যক্তিগতভাবে ফেসবুকে রক্ত চেয়ে পোস্ট করে প্রতারিত হচ্ছেন অনেকেই। যেমনটা হয়েছিলেন সোহাগ সোহান নামের একজন। তিনি তার মায়ের জন্য রক্ত চেয়ে ফেসবুকে পোস্ট করেন। কিন্তু পোস্টে তার দেওয়া ফোন নম্বরে যোগাযোগ করে ঢাকা কলেজের ছাত্র পরিচয় দিয়ে এক যুবক বলেন, তিনি নারায়ণগঞ্জে আছেন। যাতায়াত ভাড়া দিলে তিনি রক্ত দিতে আসবেন। হাসপাতালে আসলে দিতে চাইলে রাজি না হয়ে ফোন কল কেটে দেয় ঢাকা কলেজের ওই ছাত্র। নিজের প্রয়োজনে বাধ্য হয়ে কার্পণ্য না করে তিনিও এক হাজার টাকা বিকাশ করেন। অথচ তার মা সুস্থ হয়ে উঠলেও আর খোলা পাওয়া যায়নি ওই ছাত্রের মোবাইল নম্বর।
রক্ত নিয়ে প্রতারকচক্রের এ দৌরাত্ম্য বন্ধে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা জানতে চাইলে বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) সহেলি ফেরদৌস জানান, রক্ত নিয়ে এ ধরনের প্রতারণার ঘটনা বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তর ইতোমধ্যে অবগত হয়েছে। বেশকটি অভিযোগ বিভিন্ন থানা পুলিশের মাধ্যমে এসেছে। এ নিয়ে পুলিশ কাজও করছে। তবে পুলিশি অভিযানের পাশাপাশি জনসাধারণকেও এ বিষয়ে সচেতনতার সাথে লেনদেন করতে হবে। যদি কেউ মনে করেন তিনি এ নিয়ে প্রতারিত হচ্ছেন তাহলে তাৎক্ষণিক সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশকে অবহিত করতে হবে। তিনি বলেন, এ ধরনের প্রতারণায় যারা জড়িত রয়েছে তাদের ফেসবুক আইডির আইপিওর সূত্র ধরে অনুসন্ধান চলছে। শুধু তাই নয় যারা বিকাশ নম্বরে লেনদেন করছে অভিযোগের প্রেক্ষিতে তাদের বিকাশ নম্বরগুলোও ট্র্যাকিং করা হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, যদিও কেউ এ ধরনের প্রতারণায় লিপ্ত হয়ে হাতেনাতে ধরা পড়ে তাৎক্ষণিক থানা পুলিশকে অবহিত করতে হবে। -ডেস্ক