-মো. কায়ছার আলী, শিক্ষক, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

 (দিনাজপুর২৪.কম) বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। নদ-নদীকে নিয়ে অনেক গান, কবিতা লেখা হয়েছে। মাইকেল মধুসূদন দত্তের বাংলা ভাষায় লিখিত ‘কপোতাক্ষ নদ’ এক অমর সৃষ্টি। ধরিত্রীকে জননী আর নদীকে বলা হয়ে বোন। ছোটবেলায় পাঠ্যবইয়ে পড়েছি পৃথিবীতে তিনভাগ জল আর এক ভাগ স্থল। ৯৭% লোনা জল, ২% পানের অযোগ্য আর মাত্র ১% হল পানের উপযোগী পানি। পানি ছাড়া কোন প্রাণী এবং উদ্ভিদ বাঁচতে পারে না। তাইতো পানির অপন নাম জীবন। খাল, বিল, নদী, নালা, হাওড়, বাওড়-পানি তার বক্ষে ধারণ করে। সেই প্রাগৈতিহাসিক সময় থেকে নদ-নদীগুলো ছিল বাধাহীন। তাদের গতিপথ ছিল উন্মুক্ত এবং সর্পিলাকার। পাহাড়-পর্বত, উঁচু-নীচু মরুভূমি, জঙ্গল, বন, বন-বনান্তর জনপদ এর ভেতর দিয়ে নদ-নদীগুলো সাগর মহাসাগরে মিশেছে। আদিকাল থেকে দূর-দুরান্তের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে নদ-নদীগুলো। শহর, বন্দর, গঞ্জ, হাটবাজার এমনকি সভ্যতা নদ-নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। সিন্ধু নদের তীরে সিন্ধু সভ্যতা ২৭০০ খ্রীঃ পূর্বে দুইটি নগর হরপ্পা মহেঞ্জোদারো। ২৪০০ বছর আগে ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে উয়ারী বটেশ্বর। করতোয়া নদীর তীরে ২৪০০ বছর আগে মহাস্থানগড় (পুন্ড্রনগর)। ৫০০০ বছর আগে নীল নদের তীরে মিশরীয় সভ্যতা। খিস্টপূর্বে ৪০০০ অব্দে ইরাকের টাইগ্রীস ও ইউফ্রেটিস নদীর তীরে মেসোপটেমীয় সভ্যতা। ২০০০ খ্রীঃ পূর্বে হোয়োংহো ও ইয়াংসিকিয়াং নদীর তীরে চীন সভ্যতা। প্রধান প্রধান শহর রাজধানীগুলো নদীর তীরে যেমন টেমস নদীর তীরে লন্ডন, মস্কোভা নদীর তীরে মস্কো, সীন নদীর তীরে প্যারিস, হাডসন নদীর তীরে নিউইয়র্ক, হুগলী নদীর তীরে কলকাতা ও বুড়িগঙ্গার তীরে ঢাকা আর আমাদের প্রাণের শহর দিনাজপুর পুনর্ভবা নদীর তীরে। এই নদী বাংলাদেশ ও ভারতের একটি আন্তঃসীমান্ত নদী। বাংলাদেশের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলের দিনাজপুর জেলা এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার একটি নদী। পাউবো কর্তৃক পুনর্ভবা নদীর প্রদত্ত পরিচিতি নম্বর, উত্তর পশ্চিমাঞ্চলের নদী নং ৭২ দিনাজপুর জেলার বীরগঞ্জ উপজেলার শিবরাম ইউনিয়নের বিলাঞ্চলে উৎপত্তি হয়ে পতিত হয়েছে মহানন্দা নদীতে। এর প্রধান উৎস ব্রাহ্মনপুর বরেন্দ্রভূমি। ১৭৮৭ সালে হিমালয়ের বন্যায় প্রচন্ড ভূমিধসে সানুর নিকট এ নদীর পার্বত্য উৎসমুখ বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে মৃত ঘাগরা, গাবুরা, কাঁচাই নদী এক সময় পূনর্ভবারই উপনদী ছিল। দিনাজপুরের প্রথিতযশা সাংবাদিক মতিউর রহমান আমাকে সরকারের উন্নয়নের ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে ঘাগরা ও গিরিজা খাল নিয়ে লেখার জন্য তথ্য ও তত্ত্ব দিয়ে সার্বিক সহায়তা করেছেন। ঘাগরাগুলোর উৎসমুখ হলো নদ-নদী। সেই নদ-নদীগুলো আজ মৃতপ্রায়। নদীর বুকে বালু চিক চিক করছে। বিশাল জলরাশির ধারক ও বাহক নদী। দিনাজপুর শহরের তিন দিক দিয়ে বয়ে গেছে তিনটি নদী। পূর্বে আত্রাই, পশ্চিমে পুনর্ভবা ও উত্তরে ঢেপা নদী। এর সাথে আছে ঘাগরা ও গিরিজা খাল। ঘাগরা খালটি কাহারোলে শুরু হয়ে বাস টার্মিনাল হয়ে শহরের মাঝ দিয়ে পাউবো কার্যালয়ের এলাকা দিয়ে পুনর্ভবা নদীতে গিয়ে মিশেছে। গিরিজা খালটি শহরের কালীতলা থেকে শুরু হয়ে পাটুয়াপাড়া বালুয়াডাঙ্গা হয়ে কসবা এলাকা দিয়ে পুনর্ভবার সাথে মিলিত হয়েছে। দিনাজপুর শহর বন্যার পানি রক্ষা করার জন্য শহরের পূর্বদিকে চাটগাঁ থেকে কাউগা পর্যন্ত সাড়ে ১২ কি.মি. বাঁধ এবং শহরের পশ্চিমা দিকে রয়েছে গোসাইপুর থেকে ঘুঘুডাঙ্গা পর্যন্ত সাড়ে ১৫ কি.মি. বাঁধ। দীর্ঘদিন যাবৎ বাঁধ দুটি সংস্কার না হওয়ায় অনেক স্থান ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে গেছে। এর ফলে শহরে বন্যার পানি প্রবেশ করা সহজ হয়ে পড়েছে। আবার বিভিন্ন জানা বা অজানা কারণে শহরের খাল দুটো পানি নিষ্কাশনের গতি হারিয়ে ফেলেছে। ক্যানেলের গভীরতা না থাকায় খালের পানি উপচে পড়ছে। আজ এককালের ঐতিহ্যবাহী ঘাগরা নদী এখন দিনাজপুরের দুঃখ। এ নদীতে অতীতে জনগণ গোসল করেছে, মাছ ধরেছে। আজ এগুলো বয়োবৃদ্ধদের কাছে স্মৃতি। ঘাগরা নদী এখন নালায় পরিণত হয়েছে। শহরের সমস্ত আবর্জনা, পয়ঃনিষ্কাশন ঘাগরায় গিয়ে পড়ছে। ধীরে ধীরে বিষময় হয়ে উঠছে পরিবেশ। এই মৃতপ্রায় ঘাগরা ও গিরিজা ক্যানেল সামান্য বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতায় গ্রাস করেছে পুরো শহরকে। এই দিনাজপুরে নদ-নদী ছিল ৭৪ কি.মি এবং ছোট বড় বিল রয়েছে ৭৫টি। আজ কোথাও হাটুজল, কোথাও জলবিহীন গর্ত, ধু ধু বালুচর ধানসহ বিভিন্ন ফসলের চাষ, কোথাও গোচারণ ভূমি, শিশুদের খেলাধুলা নয়তো বালু উত্তোলন নিত্যদিনের চিরচেনা দৃশ্য। গত ৩০শে নভেম্বর ২০১৬ সালে দৈনিক ইত্তেফাকের উদ্যোগে দিনাজপুর এনজিও ফোরাম আঞ্চলিক কেন্দ্রে “ঘাগড়া ক্যানেল সংস্কারসহ অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং দিনাজপুর পৌরসভার নগর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন” শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে উঠে এসেছিল ঘাগরার চালচিত্র এবং দাবিনামা। দিনাজপুর পৌরসভা মেয়রের সভাপতিত্বে বৈঠকে প্রধান অতিথি ছিলেন দৈনিক ইত্তেফাকের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ও সাবেক এমপি তাসমিমা হোসেন। আলোচনায় অংশ নেন দৈনিক ইত্তেফাকের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আশিস সৈকত, দিনাজপুর মহিলা সংস্থার চেয়ারম্যান তরিকুন বেগম লাবুন, দৈনিক উত্তর বাংলার নির্বাহী সম্পাদক জিনাত রহমান সহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ। সেদিন বৈঠকে তাঁরা বলেন, “ঘাগরার সোনালী অতীত ফিরিয়ে আনতে হবে। দুধারে ফুটপাত, বৃক্ষরাজী এবং আলোক সজ্জিত করে ট্র্যাম্প নদীর আদলে পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। নান্দনিক পরিকল্পনার মাধ্যমে নির্মল পরিবেশ তৈরী হলে মশা-মাছি বাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব এবং পোকা মাকড়ের উপদ্রব কমে গিয়ে বৃদ্ধি পাবে শহরের আর্থিক স্বচ্ছলতা। দিনাজপুর শহরের প্রাণভোমরা ঘাগরার মৃত্যু হলে নগরবাসীর জীবনে নেমে আসবে দুর্ভোগ।” গত ২০১৮ সালের আগষ্ট মাসের ভয়াবহ বন্যা দিনাজপুরে ২০০ বছরের অতীত রেকর্ড ভঙ্গ করেছিল। টানা বৃষ্টি এবং বন্যার পানিতে তলিয়ে যায় গোলাপবাগ, গোবরাপাড়া, পাটুয়াপাড়া, পিটিআই রোড, সুইহারী, লালবাগ, কাঞ্চন রোড, রামনগর, নিমতলাসহ শহরের অধিকাংশ এলাকা। তখন মানুষ দিশেহারা হয়ে যায়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় দিনাজপুর শহরের উপর দিয়ে প্রবাহিত ক্যানেলগুলো চালু থাকার সময়ে দিনাজপুর শহরে জলাবদ্ধতা ছিল না। ছিল না পরিবেশ বিপর্যয়। বর্ষায় অতিরিক্ত পানি প্রবাহিত না হওয়য় প্লাবিত হচ্ছে শহরের নি¤œাঞ্চলে। এ অবস্থা কি বেশিদিন চলতে দেওয়া যায়? পূর্বে খাল দুটি খননের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে আবেদন নিবেদন করে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ পায়নি। দিনাজপুরের মানুষ সহজ সরল এবং নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গি হৃদয়ে ধারণ করে। শহরের উন্নয়ন পরিকল্পনা যাদের হাতে আজ তাঁরা এগিয়ে এসেছেন। গত ২৪ শে ডিসেম্বর ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দে দিনাজপুরের বহুল প্রচারিত পত্রিকা দৈনিক উত্তর বাংলা সহ অনান্য পত্রিকা পাঠে দেখতে পেলাম ঘাগরা ক্যানেলের পুনঃসংস্কার এবং পুনঃখনন কাজের দৃশ্যমান অগ্রগতি। এ দৃশ্য দেখতে পেয়ে দিনাজপুর বাসীর মধ্যে আনন্দ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পৌরবাসী সরকারের এ যুগোপযোগী সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাচ্ছে। কিছুটা দেরী হলেও সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করছে দিনাজপুরের জেলা প্রশাসন। ঘাগরা খাল (পরবর্তীতে গিরিজা খাল) পুনঃরুদ্ধার এবং পুনঃখনন অব্যাহত থাকুক এবং সোনালী হারানো অতীত ফিরে পাক দিনাজপুর পৌরবাসী এ মহৎ কর্মের মাধ্যমে।

…………………………………………………………..লেখক: মো. কায়ছার আলী, শিক্ষক, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট