এস.এন.আকাশ, সম্পাদক (দিনাজপুর২৪.কম) দেশের স্বাস্থ্য খাতে অনিয়মটাই যেনো নিয়মে পরিণত হয়েছিল। চলমান করোনা পরিস্থিতিতে এ খাতের নানা অসঙ্গতি, অব্যবস্থাপনা, সমন্বয়হীনতার চিত্র আরও প্রকটভাবে প্রকাশ পেয়েছে। চলমান এই মানবিক বিপর্যয়ের সময়ও বহুবিধ অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রশাসনের তদন্তক্রমে এর সত্যতাও মেলে।

ছবি-এস.এন.আকাশ, সম্পাদক, দিনাজপুর২৪.কম

সংবাদমাধ্যমে উঠে আসতে থাকে একের পর এক অনিয়ম-দুর্নীতি-স্বেচ্ছাচারিতার চিত্র। এসব ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদের দায়ের বিষয়টিও সামনে চলে আসে। ফলে নানা মহল থেকে তার পদত্যাগ কিংবা অপসারণের দাবি আমরা দেখেছি। শেষ পর্যন্ত তিনি পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন।

আমরা মনে করি, জেকেজি ও রিজেন্টের পাহাড়সম দুর্নীতি-প্রতারণা সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের যোগসাজশ ছাড়া সংঘটিত হওয়া অসম্ভব। বিদ্যমান বাস্তবতার আলোকে এ কথা বলা যায়, এসব কোনো ঘটনার দায়ই স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এড়াতে পারে না। অধিদপ্তরের প্রধান হিসেবে মহাপরিচালকের দায়িত্বশীলতাই সর্বাগ্রে আলোচনায় আসবে।

তবে আমরা মনে করি না, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডিজির পদত্যাগই বিদ্যমান সমস্যা সমাধানের একমাত্র পথ। ব্যবস্থা না বদলালে ও আগাগোড়া সংস্কার করতে না পারলে ব্যক্তির অদল-বদলে স্বাস্থ্য খাতকে দুষ্টচক্রের বলয়মুক্ত করা যাবে না।

আমরা জানি, কিছুদিন আগে স্বাস্থ্য খাতের অনিয়ম-দুর্নীতি খতিয়ে দেখতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে ১১ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। আমাদের প্রত্যাশা, এ কমিটি স্বাস্থ্য খাতে সৃষ্ট সব ক্ষতের নেপথ্যের প্রভাব ও অনৈতিক যোগসাজশের উৎস সন্ধান করে দায়ীদের শনাক্ত করে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করবে এবং সরকার তা বাস্তবায়নে নির্মোহ অবস্থান নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।

স্বাস্থ্য খাতের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ খাতের নানা রকম ক্ষত কিংবা দুরবস্থা শুধু বিপুল অর্থেরই অপচয় করেনি, দেশের মানুষের সাংবিধানিক অধিকার স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রেও ব্যাপক ব্যত্যয় ঘটিয়েছে। বিগত প্রায় পাঁচ মাসে স্বাস্থ্য বিভাগের বিভিন্ন স্তরে যেসব অনিয়ম-দুর্নীতির নতুন চিত্র উন্মোচিত হয়েছে।

অনেক ক্ষেত্রে কোনো ধারণা ছাড়াই, কোনো খবর-বার্তা না নিয়েই করোনাকালে যেসব গুরুত্বপূর্ণ কাজর দায়িত্ব হীন স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে দেয়া হয়েছে এবং সেসব প্রতিষ্ঠান যে অনিয়ম-দুর্নীতি করেছে, তাদের কৃত অপরাধের দায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরই বা এড়াবে কী করে? দেশে প্রায় ১৫ হাজারেরও বেশি বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক কেন্দ্রের মধ্যে ১০ হাজারই চলছে অবৈধভাবে অর্থাৎ এগুলোর কোনো লাইসেন্স নেই!

বাকি যেগুলোর বৈধ লাইসেন্স আছে সেগুলোর ওপরও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নজরদারি নেই! প্রশ্ন হচ্ছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দায়িত্বশীলরা কি এসব ব্যাপারে জবাবদিহির কোনো দায়বোধ করেন না? এভাবে তো চলতে পারে না। এর সঙ্গে মানুষের জীবন-মরণের বিষয়টি জড়িত।

ফাঁস করা প্রশ্নপত্রে মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজে ফাঁস করা প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা দিয়ে ২০১৩ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত অন্তত চার হাজার শিক্ষার্থী বিভিন্ন মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজে ভর্তি হয়েছেন। সিআইডির ওই কর্মকর্তা জানান, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রেস থেকে প্রশ্নপত্র ফাঁস করতেন মেশিনম্যান আবদুস সালাম। তার খালাতো ভাই জসিমউদ্দিন তা সারা দেশে ছড়িয়ে দিয়ে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিতেন। সালাম ও জসিম সারা দেশে একটি বিশাল চক্র গড়েছিলেন। সালাম পলাতক। সালামসহ চক্রের পলাতক অর্ধশত সদস্যদের খোঁজ পেয়েছেন তারা। রিমান্ডে থাকা তিন আসামির কাছ থেকে ৭৮ শিক্ষার্থীদের দেওয়া চেক জব্দ করা হয়েছে। প্রশ্ন হলো ফাঁস হওয়া প্রশ্নের এ সমস্ত প্রায় ৪ হাজার ডাক্তার ভবিষ্যতে ডাক্তার হয়ে বের হলে এরা দেশ ও জাতির আসলে কি উপকারে আসবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কিংবা সরকার প্রায় ৪ হাজার মেডিকেল ও ডেন্টালে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের বিষয়ে কোন ব্যবস্থা নেয়া হবে কিনা দেশবাসী সেটা নিয়েও বিষ্মিত এবং চিন্তিত।

অপরাধীরা চিহ্নিত হবে এবং কৃত দুষ্কর্মের জন্য আইনানুগ ব্যবস্থায় প্রতিকার হবে- এই প্রত্যাশা স্বাভাবিক। সংবাদ মাধ্যমেই উঠে এসেছিল, স্বাস্থ্য খাতে সংযুক্ত অধিকাংশ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধাররা ক্ষমতাধর ও দুর্নীতিগ্রস্ত।

আমরা জানি, দুর্নীতি দমন কমিশন এমন ১৪টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করে। আমরা চাই, তাদের ও তাদেরকে সহায়তাকারী সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হোক।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডিজির পদত্যাগের বিষয়টিকেই যেনো সব সমস্যার সমাধান মনে করা না হয়। আমরা আরও মনে করি, রোগ যেহেতু গুরুতর, সেহেতু কোনো টোটকা দাওয়াইয়ে কাজ হবে না। এর জন্য অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স অঙ্গীকারের নিরিখে ব্যবস্থা নেয়ার দরকার।

একই সঙ্গে সবকিছু ঢেলে সাজানোর ওপরও সমভাবেই গুরুত্বারোপ করতে হবে। দুষ্টের দমন, শিষ্টের লালন— এই নীতির আলোকে যদি করণীয় নিশ্চিত করা যায়, তাহলে অনেক ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতা আনা সহজ হবে।

আমরা মনে করি, উঁচু থেকে নিচু স্তর পর্যন্ত দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের সরিয়ে দেয়ার পাশপাশি দক্ষ, সৎ ও নিষ্ঠাবানদের নেতৃত্বে আনা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে সব অনিয়ম-দুর্নীতির উৎস সন্ধানক্রমে কঠোর প্রতিকার নিশ্চিত করাও জরুরি। অর্থাৎ শুধু দুর্নীতিবাজদের সরিয়েই ক্ষ্যান্ত হলে চলবে না, চলমান যে ব্যবস্থা দুর্নীতির পৃষ্ঠপোষক, সেই ব্যবস্থারই পরিবর্তন ঘটাতে হবে। -ডেস্ক