(দিনাজপুর২৪.কম) দীর্ঘ প্রতীক্ষিত স্বাধীনতা লাভ করলো ভারত-বাংলাদেশের মধ্যকার ১৬২টি ছিটমহলের জনগণ। শুক্রবার মধ্যরাতে আনুষ্ঠানিকভাবে ছিটমহল বিনিময় সম্পন্ন হওয়ায় মুক্তির আনন্দে ভেসে চলেছে ছিটবাসী। রাত ১২টা ১ মিনিটে ৬৮টি মোমবাতি প্রজ্জ্বলন করে ৬৮ বছরের ছিটমহল সমস্যার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়েছে। ফলে আজ পহেলা আগস্ট শনিবার ঊষালগ্ন থেকে ছিটমহল নামের ভূ-খন্ড ভারত ও বাংলাদেশের মানচিত্র থেকে চিরতরে মুছে যাবে। সকালের সূর্যোদয়ের সাথে সাথে বাংলাদেশ অধ্যুষিত ছিটমহলগুলোতে উড়বে আমাদের প্রিয় লাল-সবুজের পতাকা। এই মধ্য রাতের আঁধার ঠেলে ছোট ছোট আলোতে আলোময় হয়ে উঠল চারপাশ। সে আলোতে লাল-সবুজকে আলাদা করা না গেলেও ৬৮ বছরের প্রতীক্ষার পতাকা বাতাস চাপড়ে জানান দিল বহুল প্রতীক্ষিত স্বাধীনতার। শুক্রবার রাত ১২টা ১ মিনিটে বাংলাদেশের সীমানায় যোগ হওয়া ছিটমহলগুলোতে ওড়ানো হয় বাংলাদেশের পতাকা, ৬৮ প্রদীপে প্রোজ্জ্বল প্রতিটি বাড়ি। ভারতের সঙ্গে যোগ হওয়া ছিটমহলগুলোতেও ছিল একই চিত্র। আর সেই সাথে দীর্ঘ অপেক্ষার মুক্তির স্বাদ অনন্য হয়ে ধরা দিয়েছে ৫০ হাজার অধিবাসীর কাছে, ঘুচেছে নিজ দেশে পরাধীনতার’গ্লানি।
ভারত ও বাংলাদেশের স্থলসীমান্ত চুক্তি অনুযায়ী, ১ অগাস্ট থেকে বাংলাদেশের ভেতরে থাকা ১৭ হাজার ১৬০ দশমিক ৬৩ একর আয়তনের ভারতের ১১১টি ছিটমহল বাংলাদেশের ভূখণ্ড। আর ভারতের মধ্যে থাকা ৭ হাজার ১১০ দশমিক ০২ একর আয়তনের বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল মিলে গেছে ভারতের মানচিত্রে। দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত এই সমস্যার অবসানের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মানচিত্র পেল পূর্ণতা। বাংলাদেশে এখন থেকে ছিটমহল শব্দটি থাকবে কেবল ইতিহাসের পাতায়।
ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির বাংলাদেশ অংশের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, আজ নিজেরে দেশের পতাকা নিয়ে মিছিল করছি, এর চেয়ে আনন্দের কী আছে? আজ আমরা মুক্ত, আজ আমরা স্বাধীন। ৬৮ বছরের বন্দিত্ব ঘুচেছে আমাদের- এটিই আমাদের সবচেয়ে বড় পাওয়া। এ বিনিময়ের মধ্য দিয়ে নিজেরো অগ্রসর হতে পারবেন বলে আশা করছেন সমন্বয় কমিটির সভাপতি ময়নুল হক।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসানে দেশ ভাগের সময় সিরিল রেডক্লিফ কমিশনের তাড়াহুড়োয় চিহ্নিত করা সীমান্তে ছিটমহল জটিলতার শুরু। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এই সমস্যার অবসানে ১৯৭৪ সালে মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি হয়। এরপর তা কার্যকরে প্রোটোকল স্বাক্ষরিত হয় ২০১১ সালে। গত ৭ মে ভারতের সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে ওই চুক্তি বাস্তবায়নের পথ তৈরি হলে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ঢাকা সফরে অনুসমর্থনের দলিল হস্তান্তর হয়।
নিজ নিজ দেশের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে এসব ছিটমহলের সরাসরি কোনো যোগাযোগ না থাকায় রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব ছিল না। আরেক দেশের সীমানার ভেতরে হওয়ায় হাসপাতাল, বিদ্যুৎ, স্কুল-কলেজ বা বিচার- প্রশাসনও ছিল না সেখানে। ফলে ছিটের বাসিন্দাদের ইচ্ছা থাকলেও ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করানোর সুযোগ ছিল সীমিত। অনেকেই বাংলাদেশি বা ভারতীয় ঠিকানা ব্যবহার করে লেখাপড়া করলেও ছিটমহলের বাসিন্দা হওয়ায় চাকরির সুযোগ তাদের এতোদিন হয়নি।
ভারতে সবগুলো ছিটমহলের অবস্থান পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলায়। আর বাংলাদেশে ছিটমহলগুলো পঞ্চগড়, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও নীলফামারী জেলায়। ময়নুল হক বলেন, শোষণ ও বঞ্চনার ইতিহাসের অবসান ঘটার এ দিনকে স্মরণীয় করে রাখতে ২ দেশের সব ছিটমহলে ৬৮টি করে মোমবাতি বা প্রদীপ জ্বালানো হয়েছে। এছাড়া ছিটমহলের প্রতিটি অন্ধকার সড়কে মশাল জ্বালিয়ে আলোকিত করার পাশাপাশি ফানুস ওড়ানো হয়েছে।
একই সঙ্গে পূর্ববর্তী সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতিটি ছিটমহলে জাতীয় পতাকা ওড়ানো হয় বলেও জানান ময়নুল। তিনি জানান, এই দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে শুক্রবার সারাদিন ছিটমহলগুলোর নাগরিক কমিটির উদ্যোগে স্থানীয় বিভিন্ন খেলাধুলা, গান ও নাটকসহ সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা চলেছে।
লালমনিরহাট জেলা সদরের প্রায় ১১ কিলোমিটার দূরে কূলাঘাট ইউনিয়নে দুটি ছিটমহল রয়েছে। এই ছিটমহলে স্থানীয় প্রশাসন ও জেলা প্রশাসন ছিটমহলের মানুষের সমন্বয়ে ছিটমহল হস্তান্তর অনুষ্ঠান পালন করে। ১২টা ১ মিনিটে ছিটমহল হস্তান্তরের সময়টি তারা সকলে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা নেড়ে উল্লাস ধ্বনি করে ওঠে। এ জেলায় ৫৯টি ছিটমহল রয়েছে। মুক্তির এ মুর্র্হতটি যেন, কোন অবস্থায় সামান্য ক্রুটি বিচ্ছুতির কারণে বিষাদময় না হয় সেদিকে স্থানীয় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী নজর রেখেছে। প্রতিটি ছিটমহলে পুলিশ ও বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। -(ডেস্ক)