(দিনাজপুর২৪.কম)হিজরি চান্দ্রবর্ষের শাবান মাসের শেষ গোধূলিবেলা শেষে বঙ্গীয় ব-দ্বীপের তাল-সুপারি-নারকেল গাছের গম্ভীর শীর্ষখচিত পশ্চিম দিগন্তে উদিত বাংলার কৃষকের কাস্তের মতো বাঁকা চাঁদ প্রতিবছর নিয়ে আসে এ দেশের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য ত্যাগ ও সংযমের বার্তা। বছর ঘুরে একই নিয়মে আবার যদিও এসেছে মাহে রমজান, এবার তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাংলার সুস্বাদু ফল আম, কাঁঠাল ও লিচুর ম-ম ঘ্রাণ। বাজারে সুস্বাদু ও পুষ্টিকর ফলের সমারোহ রোজাদারদের ইফতারি ও সেহরিতে নিশ্চয়ই বিশেষ মাত্রা ও তাৎপর্য যুক্ত করবে। রমজানের চাঁদ সাক্ষী রেখে বাংলাদেশের বাইরেও মুসলিম বিশ্বের দিগন্তে ঘোষিত হওয়া ত্যাগ ও সংযমের শাশ্বত আবাহনীর এই মাহেন্দ্রক্ষণে আমরা দিনাজপুর২৪.কমের, লেখক, শুভানুধ্যায়ীদের জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা। আমরা আশা করি, এই মাস তাদের জীবন ও জীবিকা, ত্যাগ ও সংযমের আলোয় উদ্ভাসিত করবে। ব্যক্তিগত সেই আলো আলোকিত করবে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনকেও। আমরা জানি, ধর্মপ্রাণ মুসলমান শবেবরাতের মহিমান্বিত রজনী থেকেই কীভাবে অপেক্ষা করেন এই মাসটির জন্য। পশ্চিমাকাশে উদিত সরু চাঁদের মধ্যে তারা কীভাবে সন্ধান করেন আত্মশুদ্ধির প্রশস্ত রাস্তা, জীবনের সহজ-সরল পথ, তথা সেরাতুল মোস্তাকিম। কেবল ব্যক্তিগত ত্যাগ ও সংযম নয়, রমজানের অবশ্য কর্তব্যগুলো পালনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মুসলিম জনগোষ্ঠী বিশ্বের অন্যান্য মুসলমানের সঙ্গে যে যোগসূত্র নবায়ন করে নেয়, তার সামষ্টিক তাৎপর্যও ব্যাপক। আমরা জানি, পুরো মাস রোজার মাধ্যমে শুধু পান, আহার ও জৈবিক চাহিদা বর্জনই নয়, আত্মিক পরিশুদ্ধির জন্য অন্তরের লোভ-লালসা ও নেতিবাচক চিন্তাতেও লাগাম টেনে ধরা হয়। রোজা অনুভব করায় ক্ষুধার্ত ও বঞ্চিত মানুষের কষ্ট। রমজান শিক্ষা দেয় ত্যাগের, মিতব্যয়িতার, ভোগ না করে বিলিয়ে দেওয়ার আদর্শ। শেখায় বিত্তবৈভবের গরিমার বদলে স্রষ্টার দরবারে আনুগত্য প্রকাশের মহিমা। দেখিয়ে দেয় সারাদিন পানাহারসহ সব উপভোগ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে ইবাদতের মধ্যে মগ্ন থাকার সৌন্দর্য। দুুঃখজনক হলেও সত্য, রমজানের ত্যাগ ও সংযমের এই শিক্ষা অনেকের জীবনে প্রতিভাত হয় না। ত্যাগের বদলে ভোগ, কৃচ্ছ্রের বদলে অপচয়, অল্প আহারের বদলে ভূরিভোজ, মিতব্যয়িতার বদলে অপব্যয়িতার দেখানেপনা রমজানের সৌন্দর্যকে ম্লান করে দেয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সহনশীলতা ও সৌহার্দ্যের বদলে অসহিষুষ্ণ প্রবণতাও দেখা যায়। রমজান মাস এলেই নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক পণ্যের দাম বেড়ে যায়। অতি মুনাফালোভীরা রমজানকেই বেছে নেয় অতি মুনাফা অর্জনের উপায় হিসেবে। এবার অবশ্য রমজানের আগে থেকেই খোদ বাণিজ্যমন্ত্রী কয়েক দফা প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন যে, বাজার স্থিতিশীল থাকবে। আমরা তাতে আস্থাই রাখতে চাই। কিন্তু একই সঙ্গে আমরা চাই কেবল কথার কথা নয়, সত্যিকার অর্থেই রোজার মাসে বাজার স্বাভাবিক থাকুক। ধর্মপ্রাণ মুসলমানসহ কোনো নাগরিকের জন্যই এই মাসে বাড়তি চাপ তৈরি না হোক। আমরা দেখেছি, বিশ্বের অন্যান্য মুসলিমপ্রধান দেশে রমজান মাসে দ্রব্যমূল্য অনেক ক্ষেত্রে রোজাদারদের প্রতি সম্মানার্থে কমে যায়। অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশেও এমন চিত্র না হোক, অন্তত রমজান উপলক্ষে দাম বৃদ্ধির না হওয়া দেখতে চাই। এ ক্ষেত্রে খোদ রোজাদারদেরও কিছু দায়িত্ব রয়েছে। তারা যদি সত্যিকারের সংযম ও ত্যাগের আদর্শ অনুসরণ করেন, তাহলে এই মাসে কেনাকাটার পরিমাণ কমে যাওয়ারই কথা। বাস্তবে এর বিপরীত চিত্রই দেখি আমরা। শুধু দ্রব্যমূল্যই নয়, শহরজীবনের দৈনন্দিন দুর্ঘটনাগুলোয় বাড়তি মাত্রা যুক্ত হয় এ মাসে। তাই দ্রব্যমূল্যের পাশাপাশি যানজট, যানবাহন স্বল্পতা ইত্যাদি বিষয় বিবেচনায় রেখে রমজানে বিশেষ সরকারি উদ্যোগে ভাটা দেওয়া উচিত হবে না।  ‘এবার রমজানে স্বস্তি মিলবে কি’। আমরা দেখতে চাই, সংশ্লিষ্টরা সেই স্বস্তি নিশ্চিত করতে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছেন। সিয়াম সাধনার মধ্যেই বিপণিবিতানগুলোয় শুরু হবে ঈদের প্রস্তুতিমূলক কেনাকাটা। মানুষ যাতে সুষ্ঠুভাবে কেনাকাটা করতে পারে, সে জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তার কথা এখনই ভাবতে হবে। তবে বাহ্যিক এই আয়োজনগুলোর বাইরে রমজান যদি প্রত্যেক মুসলমানের মনে নতুন আলো জ্বালাতে পারে, সৎ মানুষ হিসেবে সবাইকে নতুন করে উজ্জীবিত করতে পারে, সেটিই হবে প্রকৃত প্রাপ্তি। স্বাগত মাহে রমজান। (ডেস্ক)