(দিনাজপুর২৪.কম) স্টেডিয়ামের প্রবেশ মুখে দেখা ২০০৭ বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকা বধের নায়ক হাবিবুল বাশার সুমনের সঙ্গে। বললাম, স্টেডিয়ামে ঢুকেই আপনার মুখ দেখলাম। আশা করি, শুরুটা ভাল হবে। আত্মবিশ্বাসের হাসি দেখা মিললো তার চেহারায়। বললেন, ‘এখন তো আমরা আরো বেশি শক্তিশালী। জয় দিয়ে শুরু হবে আশা করি।’ মিথ্যে হয়নি তার বিশ্বাস। ১৮ কোটি মানুষের প্রার্থনা। ইংল্যান্ড বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে দাপটের সঙ্গে রেকর্ড গড়ে জয় তুলে নিয়েছে ‘টিম বাংলাদেশ’।

ওভাল স্টেডিয়ামে টাইগারদের ছুড়ে দেয়া ৩৩১ রানের টার্গেট তাড়া করতে নেমে দক্ষিণ আফ্রিকা থেমেছে ৩০৯ রানে। প্রথমে দুর্দান্ত রেকর্ড ব্যাটিংয়ের পর দুর্বার বোলিং। তাতেই ওভালে ২১ রানের জয় যেন অগ্রিম ঈদ উপহার মাশরাফির দলের! টইটুম্বুর লন্ডনের ওভাল স্টেডিয়ামে আসা প্রবাসী বাংলাদেশিরাও ফিরেছেন সেই ঈদের খুশি নিয়ে। সকাল থেকেই ওভালের মাঠে বাংলাদেশের দর্শকদের দাপটে কোণঠাসা প্রোটিয়া দর্শকরা। টসে হারলেও ব্যাট করতে নেমে মাঠেও দাপট দেখাতে শুরু করলো বাংলাদেশ দল। ব্যাটে যত ঝড় উঠেছে গ্যালারিতে ততই ‘বাংলাদেশ’ ‘বাংলাদেশ’ রব বেড়েছে। শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপেই নিজেদের সর্বোচ্চ ওয়ানডে স্কোর ৩৩০ রান তুলতে খরচ হয়েছে মাত্র ৬ উইকেট। এমন ব্যাটিং দাপটে যেন মাঠেও কোনঠাসা দক্ষিণ আফ্রিকা। পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও আফগানিস্তান উপমাহাদেশের তিন দল বিশ্বকাপ শুরু করেছে ব্যাটিং বিপর্যয়ে। তাই টাইগার ভক্তদের মনে ছিল ভয় আর শঙ্কা। তবে সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহীম, সৌম্য সরকাররা সেই ভয় উড়িয়ে দিয়েছে দারুণভাবে। বাংলাদেশের ওয়ানডে ক্রিকেটে ৩২৯ রানের সর্বোচ্চ ইনিংসটি ছিল পাকিস্তানের বিপক্ষে। আর বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ৩২২ রান ছিল স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে। সবমিলিয়ে ব্যাটিংয়ে রেকর্ডের দিনে বোলারাও হতাশ করেননি।

দক্ষিণ আফ্রিকাকে জিততে হলে বিশ্বকাপে রান তাড়া করার রেকর্ড করেই জিততে হবে। তাই বড় লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে টাইগার শুরু থেকেই বোলারদের চাপে ছিল প্রোটিয়া ব্যাটসম্যানরা। ৪৬ ওভার শেষে তাদের স্কোর ৭ উইকেটে ২৭৭। ২৪ বলে ৫৫ রান দরকার তাদের। কিন্তু সেখান থেকে আর ঘুড়ে দাঁড়ানো সম্ভব হয়নি। দক্ষিণ আফ্রিকার ওপেনার কুইন্টন ডি কককে রান আউট করে শুরু করে মুশফিকুর রহীম। যদিও সেই বলেই উইকেটের পিছনে ক্যাচ ছেড়েছিলেন তিনি। পরে দারুণ এক থ্রোতে স্টাস্প ভেঙে দলকে এনে দেন শুভ সূচনা। এরপর ৪৫ রানে সাকিব আল হাসানের শিকার মাক্রাম। এই মাক্রামকে বোল্ড করে এক ঢিলে দুই পাখি মারেন বিশ্ব সেরা এই অলরাউন্ডার। তাতেই মাশরাফি বিন মুর্তজার পর দ্বিতীয় বাংলাদেশি হিসেবে ওয়ানডেতে আড়াইশ উইকেটের মাইলফলকে পৌঁছে যান সাকিব নিজের ১৯৯তম ম্যাচে। এই মাইলফলকে যেতে মাশরাফির লেগেছিল ১৯৪ ওয়ানডে। এ দুজন ছাড়া ওয়ানডেতে বাংলাদেশের হয়ে দুশো উইকেট আছে স্পিনার আব্দুর রাজ্জাকের। আরেকটি বিরল রেকর্ডে সবার আগে নাম লিখিয়েছেন সাকিব। পাঁচ হাজার রানের মালিক তো তিনি অনেক আগেই হয়েছেন। এবারে পেলেন ২৫০ উইকেটের স্বাদ। অর্থাৎ পূরণ করেছেন ‘ডাবল’। ভেঙে দিয়েছেন পাকিস্তানের সাবেক অলরাউন্ডার আব্দুর রাজ্জাকের রেকর্ড। তিনি এই কীর্তি গড়েছিলেন ক্যারিয়ারের ২৫৯তম ম্যাচে। সাকিব ঠিক ৬০ ম্যাচ কম খেলেই দ্রুততম অলরাউন্ডার হিসেবে ‘ডাবল’ স্পর্শ করেছেন। ওয়ানডে ক্যারিয়ারে ৫ হাজার রান ও ২৫০ উইকেটÑ এই বিরল কীর্তি আছে সবমিলিয়ে চার অলরাউন্ডারের। রাজ্জাক বাদে বাকিরা হলেন পাকিস্তানের শহিদ আফ্রিদি, দক্ষিণ আফ্রিকার জ্যাক ক্যালিস ও শ্রীলঙ্কার সনাথ জয়াসুরিয়ার।

যদিও মাক্রামের বিদায়ের পর সেখান থেকে রুখে দাঁড়ায় দক্ষিণ আফ্রিকা। ২৬ ওভারে প্রোটিয়াররা ২ উইকেটে তুলে নেয় ১৪৩ রান। হাল ধরেন ফাফ ডু প্লেসি আর ডেভিড মিলার। ২৭তম ওভারে মেহেদী হাসান মিরাজ এনে দিলেন গুরুত্বপূর্ণ এক ব্রেক থ্রু। ৬২ রান করা ডু প্লেসিকে দেন সাজঘরে ফিরিয়ে। উল্লাসে ফেটে পড়ে বাংলাদেশ গ্যালারি। অন্যদিকে হঠাৎ সতেজ হয়ে ওঠা দক্ষিণ আফ্রিকার দর্শকরা আবার নুইয়ে পড়েন। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই ফের তারা জেগে উঠে যেন গান গাইতে শুরু করেন। কারণ সাকিবের বলে মিড অফে ডেভিড মিলারের ক্যাচ ফেললেন সৌম্য সরকার। তাতে উত্তেজিত হয়ে পড়ে টাইগার দর্শকরা। কেউ কেউ সৌম্যকে গালি দিতেও শুরু করেন। ৩৪তম ওভারে মোস্তাফিজুর রহমানের বলে ব্যাট ছোয়ান মিলার। থার্ডম্যানে একটু দেরিতে সাড়া দেওয়ায় বলটা হাতে জমাতে পারেননি মাহমুদউল্লাহ। তবে মিলারকে শেষ পর্যন্ত বিদায় করেছেন মোস্তাফিজই। এরপর মোস্তাফিজের বলে জেপি ডুমিনি যেমন এলবিডাব্লিউর হাত থেকে বেঁচে গেলেন রিভিউ নিয়ে। তবে শেষ পর্যন্ত ৩৭ বলে ৪৫ করে তিনিও ফিরলেন সাজঘরে। সেখানেই শেষ হয়ে যায় দক্ষিণ আফ্রিকার আশা। শেষ পর্যন্ত তারা লড়াই করেছেন শুধু পরাজয়ের ব্যবধান কামাতে। স্বপ্ন বাস্তবায়নের আরেক ম্যাচে ৫ জুন এই ওভালেই নিউজিল্যান্ডের মুখোমুখি হবে টাইগাররা। -ডেস্ক