(দিনাজপুর২৪.কম) ‘অধ্যাপক এএফএম রেজাউল করিম অবসরে বাজাতেন সেতার। সে সুর মুখরিত করতো চারদিক। কিন্তু সেই মনমুগ্ধকর সুর আর বেজে উঠবে না।’ -এভাবেই প্রিয় শিক্ষকের কথা বলছিলেন অরনি সাংস্কৃতিক সংগঠনের সভাপতি অনুপ কুমার সূত্রধর। তিনি আরো বলছিলেন, ‘স্যার ছিলেন মুক্তমনের সাংস্কৃতিমনা এক মানুষ।  রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) অরনি সাংস্কৃতিক সংগঠনের উপদেষ্টাও ছিলেন এ গুণী শিক্ষক। এ ধরনের মানুষকে আমাদের সমাজের জন্য খুব বেশি প্রয়োজন ছিলো। কিন্তু কে বা কারা স্যারকে এভাবে হত্যা করলো। বিশ্বাসই হচ্ছে না যে স্যার আর নেই!’

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, প্রতিবেশী সবার মুখে একই কথা- ‘রেজাউল করিম স্যারের মত নিরীহ মানুষ খুব কমই হয়।’ তার স্ত্রী হোসনে আরা শিলার আহাজারিতে প্রকম্পিত হচ্ছিল আকাশ বাতাস। তিনি মাতমের সুরে বলছিলেন, ‘তার তো কারো সঙ্গে কোনো শত্রুতা নেই। তাহলে কে বা কারা তার সুখের সংসারটি দুমড়ে মুচড়ে দিলো? তিনি আরো বলছিলেন, ‘একটু আগেও কি জানতে পারছিলাম যে আমার সন্তানরা এতিম হয়ে যাবে? তারা আর কাউকে বাবা বলে ডাকতে পারবে না!

অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকীর গ্রামের বাড়ি রাজশাহীর বাগমারা উপজেলায়। তার স্ত্রী গৃহিণী। তিনি দুই সন্তানের জনক। ছেলে রিয়াসাত ইমতিয়াজ সৌরভ রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শেষবর্ষের ছাত্র। মেয়ে রেজোয়ানা হাসিন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্রী।

অধ্যাপক রেজাউল করিম ‘কোমলগান্ধ্যা’ নামে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত একটি সাহিত্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক পত্রিকা সম্পাদন করতেন। তিনি ভালো সেতার বাজাতেন এবং ‘সুন্দরম’ নামে একটি সাংস্কৃতিক বিষয়ক সংগঠনের উপদেষ্ঠা ছিলেন।

‘সুন্দরম’ সংগঠনের সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্থাপন শাখার সেকশন অফিসার হাসন রাজা বাংলামেইলকে বলেন, ‘ইংরেজি বিভাগে ওনার মতো কালচারাল মনের মানুষ খুব কম ছিলো। ওনার সঙ্গে আমার পরশুদিনও তার পত্রিকা বের করা নিয়ে বিভিন্ন কথা হয়েছে। এটা অনাকাঙ্ক্ষিত এবং অবিশ্বাস্য যে তার মতো এমন মানুষের শত্রু থাকতে পারে। এটা কোনো মৌলবাদীদের পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।’

ভাই রেজাউল করিমসহ তারা ২৬১ শালবাগান (সপুরা) এলাকায় পৈতৃক বাড়িতে একসঙ্গে বাস করতেন বলেও জানান সাজিদুল করিম। তার গ্রামের বাড়ি রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার দরগাবাড়ি এলাকায়। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে সবার বড়। চারজনই সরকারি চাকরি করেন। বাবা আবুল কাশেম প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ছিলেন। বর্তমানে অবসরে রয়েছেন।

রেজাউল করিমের চাচাতো বোন জাহানারা বেগম বলেন, ‘ভাই মাঝে মধ্যেই গ্রামে বেড়াতে আসতেন। গ্রামের ছোট-বড় সবাইকে আনন্দে মাতিয়ে রাখতেন। তিনি ছোটদের সঙ্গে আনন্দ করতে পছন্দ করতে। ওদের সঙ্গে খেলা করতেন। এলাকায় তথ্য ও ছবি সংগ্রহ করতেন। ভিডিও করতেন।’

গ্রামবাসীর মতে, শিক্ষক রেজাউল মুক্তমনা ও সংস্কৃতিমনা। এলাকার শিশু-কিশোরদের জন্য গানের স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন। ওই সংগীত বিদ্যালয়ের সভাপতি রাজু আহমেদ জানান, একজন সংগীতশিক্ষক শিশু-কিশোরদের গান শেখান। সব খরচ রেজাউল স্যারই বহন করতেন। এছাড়া গ্রামের অনেক মসজিদ নির্মাণ ও বাড়ির পাশের এক কওমি মাদরাসা প্রতিষ্ঠায় রেজাউল করিমের বিশেষ অবদান রয়েছে বলে জানান তারা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও একই বিভাগের সহকর্মী ড. মো. শহীদুল্লাহ্ বলেন, ‘আমাদের বিভাগে যতো ধরনের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড হতো সব তিনিই পরিচালনা করতেন। তিনি একটি পত্রিকাও বের করতেন। তবে কোনো ধরনের ব্লগ কিংবা ধর্ম নিয়ে লেখালেখি করতেন কিনা আমার জানা নেই। আমরা শিক্ষক সমিতি ১১টায় প্রাথমিকভাবে বসবো। সন্ধ্যায় জরুরি সভাও ডাকবো এবং সেখানে সিদ্ধান্ত নেবো কী ধরনের কর্মসূচি দেয়া হবে।’

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্র ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ও ইংরেজি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী তমাশ্রী দাশ বলেন, ‘এমন নিরীহ মানুষ খুব কমই হয়। আমাদের কথা চিন্তা করে কিংবা বিরক্ত বোধ করবো সেজন্যে তিনি অনেক সময় ক্লাসে হাজিরাও নিতেন না। এমন মানুষকে যারা হত্যা করেছে তাদের বিষয়ে একটা সিদ্ধান্ত নেয়া প্রয়োজন। বারবার শিক্ষক কিংবা সাংস্কৃতিককর্মী, মুক্ত চিন্তাকারীদের এভাবে স্তব্ধ করে দিবে এটা মেনে নেয়া যায় না।’

দূর্বৃত্তদের হামলায় নিহত হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভগের অধ্যাপক এ এফ এম রেজাউল করিম সিদ্দিকী। তার সহকর্মীরাসহ কেউই এ হত্যাকাণ্ডটি মেনে নিতে পারছেন না। কী কারণে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, তাৎক্ষণিকভাবে তা জানা যায়নি। এটি কোনো জঙ্গি সংগঠনের দ্বারা ঘটেছে কিনা সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। -ডেস্ক