(দিনাজপুর২৪.কম) দীর্ঘ ৭ বছর পর অবশেষে সৌদি দূতাবাস কর্মকর্তা খালাফ আল আলী হত্যার প্রধান আসামি সাইফুল ইসলাম মামুনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে কারা কর্তৃপক্ষ। সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে রোববার (০৩ফেব্রুয়ারি) রাত দশটা ১ মিনিটে গাজীপুরের কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি প্রিজন্স কেন্দ্রীয় কারাগার কর্তৃপক্ষ এ রায় কার্যকর করে বলে কারাগারটির সিনিয়র জেল সুপার মোঃ শাজাহান জনকণ্ঠকে নিশ্চিত করেছেন। ফাঁসি কার্যকরের সময় ঢাকা বিভাগের উপ-কারা

মহাপরিদর্শক টিপু সুলতান, গাজীপুরের সিভিল সার্জন ডাঃ আলী হায়দার, গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনারের পক্ষে ডিসি ক্রাইম মোঃ শরীফ উদ্দীন, সৌদি এম্বাসির দ্বিতীয় কাউন্সিলর ফয়সাল আল উবাইদি, জেলা প্রশাসকের প্রতিনিধি অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) মশিউর রহমান ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (জেনারেল) জেনারেল নাসের আহমেদ, সিনিয়র জেল সুপার মোঃ শাজাহান, জেলার বিকাশ রায়হান ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কারারক্ষীগণ ফাঁসি কার্যকরের সময় উপস্থিত ছিলেন। সৌদি সরকারের পক্ষ থেকে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সৌদি দূতাবাসের কর্মকর্তাকে ফাঁসি কার্যকরের সময় উক্ত স্থানে উপস্থিত থাকার অনুমতি দেয় সরকার। সরকার সৌদি এম্বাসির ২ কর্মকর্তাকে অনুমতি প্রদান করলেও দ্বিতীয় কাউন্সিলরই কেবল উপস্থিত ছিলেন। তবে এ সময় জসিম উদ্দীন নামের সৌদি এম্বাসির একজন আইনজীবী কারাগারের অফিস কক্ষে উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে।

এর আগে রাত ৮টার দিকে কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম মোস্তফা কামাল পাশা কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার কমপ্লেক্সে পৌঁছান। এরপর তিনি ফাঁসি কার্যকরের বিষয়াদি সার্বিকভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। ফাঁসি কার্যকরের সময় তিনি কারা কমপ্লেক্সে অবস্থান করেন বলে কারা সূত্রে জানা গেছে। কারা সূত্র জানায়, আসামি মামুন নিজের উপজেলা বাগেরহাটের শরণখোলার নিজ বাড়িতে তার লাশ দাফনের ইচ্ছা প্রকাশ করলেও পরে গ্রামের বাড়িতে কোন স্বজন না থাকায় মা ও ভাইবোনের ইচ্ছা অনুযায়ী ঢাকার যে কোন কবরস্থানে তাকে দাফন করার সিদ্ধান্ত নেয় পরিবারের সদস্যরা।

এর আগে রোববার বিকেলে বেলা পৌনে ৩টার দিকে মা দুই ভাই ও বোন কারাভ্যন্তরে আসামি মামুনের সঙ্গে শেষ সাক্ষাত করেন। তারা প্রায় ২০ মিনিট কারাভ্যন্তরে অবস্থান করেন বলে জানা গেছে। ফাঁসির সকল প্রক্রিয়া শেষে কারা কর্তৃপক্ষ তার দুই ভাইয়ের কাছে আসামি মামুনের লাশ বুঝিয়ে দেয়। এরপর তারা মামুনের লাশ নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন।ফাঁসিতে ঝুলিয়ে রায় কার্যকর করার মধ্য দিয়ে বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র সৌদি আরবের দূতাবাসের কর্মকর্তা খুনের বিচার সম্পন্ন হলো।

উল্লেখ্য, আপীল বিভাগের রায়ের বিরুদ্ধে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত সাইফুল ইসলাম মামুনের রিভিউ আবেদনের শুনানি শেষে তার মৃত্যুদন্ড বহাল রাখা হয়। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপীল বিভাগ মৃত্যুদ-প্রাপ্ত আসামির রিভিউ আবেদন খারিজ করে আদেশ দেয়ার পর মামুনকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়।

২০১২ সালের ৫ মার্চ মধ্যরাতে গুলশানের কূটনৈতিক এলাকার ১২০ নম্বর রোডের ১৯/বি নম্বর বাসার কাছে গুলিবিদ্ধ হন খালাফ আল আলী (৪৫)। পরদিন ভোরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন তিনি। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে গুলশান থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। এরপর ওই বছরের ৪ জুন রাজধানীর দক্ষিণখান থানার গাওয়াইর এলাকা থেকে সাইফুল ইসলাম মামুন, আকবর আলী লালু ওরফে রনি ও আল আমীন নামের তিনজনকে একটি অস্ত্রসহ গ্রেফার করে পুলিশ। পরে তারা স্বীকার করে, খালাফকে ছিনতাইয়ে বাধা দেয়ার কারণে রিভলবারের গুলিতে তাকে হত্যা করা হয়। পরে খালাফ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর পর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়ে হত্যার দায় স্বীকার করে তিনজনই।

সৌদি দূতাবাস কর্মকর্তা খালাফকে হত্যার অভিযোগে ২০১২ সালের ৩১ অক্টোবর আসামি সাইফুল ইসলাম মামুন, আল আমিন, রফিকুল ইসলাম খোকন, আকবর আলী লালু ও সেলিম চৌধুরী ওরফে সেলিম আহমেদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দেয় গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। ২০১২ সালের ৩০ ডিসেম্বর বিচার শেষে পাঁচ আসামিকে মৃত্যুদন্ড দেন ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৪। এরপর মৃত্যুদন্ড অনুমোদনের জন্য ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের আপীল আবেদনের শুনানি শেষে ২০১৩ সালের ২৮ নবেম্বর রায় দেয় হাইকোর্ট। হাইকোর্ট সাইফুল ইসলাম মামুনের মৃত্যুদন্ড বহাল রেখে আল আমিন, রফিকুল ইসলাম খোকন ও আকবর আলী লালুর সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেয়। পলাতক আসামি সেলিম চৌধুরীকে খালাস দেয়া হয়। ২০১৭ সালের ১ নবেম্বর সৌদি দূতাবাস কর্মকর্তা খালাফ আল আলী হত্যা মামলায় হাইকোর্টের রায় বহাল রাখেন আপীল বিভাগ। রায়ে আসামি সাইফুল ইসলাম মামুনের মৃত্যুদন্ড এবং আল আমিন, আকবর আলী লালু ও রফিকুল ইসলাম খোকনের যাবজ্জীবন কারাদন্ড বহাল রাখা হয়। পরে এই রায়ের বিরুদ্ধে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামি মামুন রিভিউ আবেদন করেন।

রাজধানী ঢাকায় সৌদি দূতাবাসের কূটনীতিক খালাফ আল আলি নামের ৪৫ বছর বয়সের এই কূটনীতিক সৌদি দূতাবাসের দ্বিতীয় সচিব ছিলেন। তিনি গুলশান এলাকায় বসবাস করতেন। ২০১২ সালের ৫ মার্চ মধ্যরাতে গুলশানের কূটনৈতিক এলাকার ১২০ নম্বর রোডের ১৯/বি নম্বর রোডের সামনে তার বাসার সামনেইে রাত সোয়া ১২টার দিকে সৌদি কূটনীতিক খালাফ আল আলি গুলিবিদ্ধ হন। স্থানীয়রা তাকে কাছের ইউনাইটেড হাসপাতালে নিয়ে গেলে মঙ্গলবার ভোর রাত ৫টার দিকে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। গুলশানের ১২০ নম্বর সড়কেরই ২২/এ নম্বর বাড়ির ৪ তলার ভাড়া বাসায় একাই থাকতেন। তাকে তার বাসা থেকে ৫০ গজ দূরে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পাওয়া যায়। তিনি বাম পাঁজরে গুলিবিদ্ধ হন। রাতে তার জগিংয়ের অভ্যাস ছিল। কখনও তিনি বাইসাইকেল নিয়ে আবার কখনও হেঁটে জগিংয়ে বের হতেন। সোমবার রাত ১১টার পর তিনি হেঁটে জগিংয়ে বেরিয়েছিলেন। ছিনতাইকারীদের হাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে খুন হন সৌদি দূতাবাস কর্মকর্তা।

সৌদি দূতাবাস কর্মকর্তা খালাফ হত্যাকান্ডের সাড়ে চার মাসের অধিক ১৪০ দিন পর অভিযান চালিয়ে সৌদি দূতাবাস কর্মকর্তা খালাফ মোহাম্মদ আল আলী হত্যাকান্ডে জড়িত চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃত চারজন পেশায় ছিনতাইকারী ও ডাকাত দাবি করে ডিবি পুলিশ জানায়, ছিনতাইর সময় বাধা দেয়ার এক পর্যায়ে তাদের সঙ্গে খালাফে ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে। এ সময় তাদের একজনের হাতে থাকা পিস্তল থেকে একটি গুলি বের হয়ে খালাফের বুকে লাগে। গুলিবিদ্ধ খালাফকে উদ্ধার করে গুলশান ইউনাইটেড হাসপাতালে নেয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু ঘটে। খালাফ হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত পিস্তল ও প্রাইভেটকারটি উদ্ধার করা হয়। রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানানো হয়েছিল।

ডিবি পুলিশের উত্তর বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মোল্লা নজরুল ইসলাম তখন প্রেস ব্রিফিং এ বলেন, কয়েকদিন ধরে ঢাকার বিভিন্নস্থানে অভিযান চালিয়ে সাইফুল ইসলাম মামুন (২০), রফিকুল ইসলাম খোকন (২২), আকবর আলী লালু ওরফে রনি (২৫), আল আমীনকে (২৫) গ্রেফতার করা হয়। রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে তারা খালাফকে ছিনতাইয়ের সময় হত্যা করেছে বলে স্বীকার করেছে।

তিনি জানান, সৌদি দূতাবাস কর্মকর্তা খালাফ হত্যার পর বিভিন্ন এলাকায় সোর্স নিয়োগ করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় গত চার জুন রাতে দক্ষিণ খান থানার উত্তর গাওয়াইর এলাকা থেকে ছিনতাই ও ডাকাতির অভিযোগে সাইফুল ইসলাম খোকনকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ। তাকে জিজ্ঞাসাবাদে তিনি ছিনতাই ও ডাকাতির ভিন্ন ঘটনা স্বীকার করেন। একই অভিযোগে তারই সহযোগী আলামিনকে গ্রেফতার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে আলামিন ও সাইফুলের কাছ থেকে একটি রিভলবার (পয়েন্ট টু টু বোর) উদ্ধার করা হয় দক্ষিণ খান এলাকার উত্তর গাওয়াইর থেকে। ওই রিভলবারের গুলি পরীক্ষার জন্য সিআইডির কাছে পাঠানো হয়। পরীক্ষায় খালাফ হত্যায় ব্যবহৃত বুলেটের সঙ্গে এর মিল পাওয়া যায়। অর্থাৎ ছিনতাইকারী সাইফুলের কাছে পাওয়া রিভলবার খালাফ হত্যায় ব্যবহার হয় বলে সিআইডি নিশ্চিত হয়।

মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামি সাইফুল ইসলাম ওরফে মামুনের বাড়ি বাগেরহাট জেলার শরণখোলার মধ্য খমতাকাটা গ্রামে। তিনি মৃত আব্দুল মোতালেব হাওলাদারের ছেলে। আসামি আল আমিনের বাড়ি পটুয়াখালী জেলার হাজিখালী গ্রামে। তার পিতার নাম ফারুক ঘরামি। আসামি আকবর আলী লালু ওরফে রনির বাড়ি শরিয়তপুর জেলার ডামুড্যা থানাধীন গোয়ালকোয়া গ্রামে। তার পিতার নাম আব্দুল জলিল। -ডেস্ক