(দিনাজপুর২৪.কম) ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির এই দিনে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনসভার সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে আওয়ামী লীগ। ৭ মার্চ উপলক্ষে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভা মঞ্চে দেখা যাবে বাংলার রাখাল রাজা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। মঞ্চের ডায়াসের সামনে বঙ্গবন্ধুর তর্জনী নির্দেশিত প্রতিকৃতি মনে করিয়ে দেয় সেদিনের সেই অমোঘ বাণী। হাজার বছরের পরাধীন বাঙালির স্বাধীনতা নির্দেশনা সম্বলিত সেই ঐতিহাসিক দিনে, সেই নেতার কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে এই মঞ্চ।

আওয়ামী লীগের জনসভা শুরু হতে আর অল্প কিছু সময় বাকী রয়েছে। এরই মধ্যে পায়ে হেঁটে, বাসে, ট্রাকে, খণ্ড খণ্ড মিছিল করে আসতে শুরু করেছে নেতাকর্মীরা। দিনটি ঘিরে সকাল থেকেই রয়েছে দলটির নানা কর্মসূচি। যার স্রোত গিয়ে মিশবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে।আজ দুপুর ৩টায় জনসভা শুরু হবে। এতে সভাপতিত্ব করবেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

আজ সকালেই আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও মহানগরের নেতারা সমাবেশস্থল পরিদর্শন করেছেন। গত এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে ময়দানকে প্রস্তুত করতে বিরামহীন কাজ করেছে দলটির নেতা-কর্মীরা।সমাবেশের আগের দিন ময়দানে মঞ্চ তৈরির কাজ শেষে বসানো হয় চেয়ার। সাজানো হয় প্যান্ডেল। নিরাপত্তায় সিসি ক্যামেরাও বসানো হয়েছে ‍উদ্যানের চারপাশে।

এবারের সমাবেশে রেকর্ড ২৫ লাখ মানুষের জমায়েত ঘটানোর টার্গেট দলটির। ঢাকার পাশাপাশি আশেপাশের পাঁচ জেলা গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ ও নরসিংদী থেকেও নেতা-কর্মীদেরকে যোগ দিচ্ছে সমাবেশে। এজন্য ব্যবস্থা করা হয়েছে বিশেষ বাস ও ট্রেনের। এছাড়া, সারা দেশ থেকে সাধারণ মানুষ এ জনসভায় যোগ দেবে বলে মনে করছেন আওয়ামী লীগের নেতারা।

বুধবার কর্মদিবস থাকলেও রাজধানীতে অন্যান্য দিনের তুলনায় গাড়ির সংখ্যা কম। যেসব গাড়ি আসছে তার অধিকাংশই জনসভামুখী। গাড়ির সংখ্যা কম থাকায় অফিসগামী মানুষ পড়ছে বিপাকে। পল্টন, শাহবাগ, দোয়েল চত্বর, নিউমার্কেট, মৎসভবন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, অফিসগামী মানুষদের অপেক্ষা করতে দেখা গেছে।আবার কেউ কেউ হেঁটেই অফিসের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছেন। আবার কোথাও যানজটও দেখা গেছে।

জনসভাকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলা হয়েছে পুরো উদ্যান। সমাবেশের আগের দিন ময়দানে মঞ্চ তৈরির কাজ শেষে বসানো হয় চেয়ার। সাজানো হয় প্যান্ডেল। পাশাপাশি নিরাপত্তায় সিসি ক্যামেরাও বসানো হয়েছে উদ্যানের চারপাশে। একইসঙ্গে আছে র‌্যাব ও ডিএমপির কন্ট্রোল রুম। আর লেকের পাড় ঘেঁষে জনতার বসার জন্য বাঁশ দিয়ে স্তরে স্তরে জায়গা করা আছে।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণের বর্ষ পূর্তির দিনটিতে প্রতিবার নানা কর্মসূচি থাকে আওয়ামী লীগের। তবে, এবারের আয়োজনটি একটু ভিন্ন। কেন না বঙ্গবন্ধুর সেই ৭ মার্চের ভাষণ এখন অনন্য উচ্চতায়। এই ভাষণকে জাতিসংঘের ইউনেস্কো দিয়েছে বিশ্ব ঐতিহ্যের দলিলের স্বীকৃতি।

সে কারণে এবারের ৭ মার্চ পালিত হবে ভিন্ন আঙ্গিকে। এতে ভিন্নমাত্রা হচ্ছে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, যা অনুষ্ঠিত হবে চলতি বছরের শেষে।
তাই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে লাখ লাখ মানুষের সমাবেশ ঘটিয়ে বিশাল শোডাউনের মধ্যদিয়ে দিনটি পালন করতে চায় বঙ্গবন্ধুর দলটি। এ কারণেও তারা শক্তি প্রদর্শন করতে চাইছে। ৪৭ বছর পর এই ময়দানে আবারও সেদিনের মতো জনসমুদ্র তৈরির চেষ্টায় আছে ক্ষমতাসীন দল।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে চাই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৭ মার্চের নতুন তাৎপর্য নিয়ে ভাষণ দেবেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তৃণমূলে পৌঁছে দেয়ার জন্যও স্বাধীনতা প্রিয় মানুষের প্রতি আহ্বান জানাবেন তিনি।

জনসভা প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম মেম্বার মোহাম্মদ নাসিম বলেছেন, এই জনসভার উপস্থিতি দিয়ে বিরোধীদের হ্রদকম্পন বাড়াতে চায় আওয়ামী লীগ। আর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. দিপু মনি বলেন, আমরা (আ’লীগ) আশা করছি এই জনসভায় জনজোয়ার হবে। সভাটি রূপ নেবে জনসমুদ্রে।

ঐতিহাসিক ৭ মার্চের এই দিনে লাখো মানুষের সামনে জাতির জনক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তির বাণী শোনান। এই দিনে তিনি ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) জনসভায় ঐতিহাসিক ভাষণে জাতিকে শুনিয়েছিলেন মুক্তির বাণী ‘এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম’। এরই মধ্য দিয়েই স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন ইতিহাসের এ মহানায়ক।

বিশ্ব ঐতিহ্যে এ বছর ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে জাতির জনকের ঐতিহাসিক ভাষণ। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো প্যারিসে অনুষ্ঠিত এর দ্বিবার্ষিক সম্মেলনে গত বছরের ৩০ অক্টোবর ২০১৭ তারিখ বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণকে ‘বিশ্ব ঐতিহ্য দলিল’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে তা সংস্থাটির ‘মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টারে’ অন্তর্ভুক্ত করেছে।

১৫ সদস্যবিশিষ্ট একটি আন্তর্জাতিক উপদেষ্টা-বিশেষজ্ঞ কমিটি কর্তৃক দু’বছর ধরে প্রামাণ্য দালিলিক যাচাই-বাছাই শেষে ইউনেস্কোর মহাপরিচালকের সম্মতিক্রমে এটি সংস্থার নির্বাহী কমিটি কর্তৃক চূড়ান্তভাবে গৃহীত হয়। দীর্ঘ ৪৬ বছর পর হলেও জাতিসংঘের মতো বিশ্ব সংস্থার এ সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা।

এর ফলে বাঙালির ইতিহাসের মহানায়ক, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাংলাদেশ সৃষ্টির প্রণোদনা সৃষ্টিকারী ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ মানবজাতির মূল্যবান ও ঐতিহ্যপূর্ণ সম্পদ হিসেবে স্বীকৃত ও গৃহীত হল। স্বাধীনতার জন্য আত্মোৎসর্গকৃত ৩০ লাখ শহীদ আর সম্ভ্রম হারানো কয়েক লাখ মা-বোনসহ আমাদের সবার জন্য এটি এক মহা-আনন্দ ও বিরল সম্মানের বিষয়।

৭ মার্চের উত্তাল সেই দিনটিতে ঢাকা পরিণত হয়েছিল মিছিলের শহরে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে দলে দলে মানুষ পায়ে হেঁটে, বাস-লঞ্চে কিংবা ট্রেনে চেপে তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে সমবেত হয়েছিলেন। লাখ লাখ মানুষ সমবেত হয়েছিলেন সেদিন। সেদিন বিকেলে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি আর হাতাকাটা কালো কোট পরে বাঙালির স্বপ্নদ্রষ্টা বঙ্গবন্ধু দৃপ্ত পায়ে মঞ্চে উঠলেন। দাঁড়ালেন মাইকের সামনে। আকাশ-কাঁপানো স্লোগান আর মুহুর্মুহু করতালির মধ্যে হাত নেড়ে অভিনন্দন জানালেন অপেক্ষমাণ জনসমুদ্রের উদ্দেশে। তারপর শুরু করলেন তার সেই ঐতিহাসিক ভাষণ। তিনি বললেন ‘তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো। মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব, এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ! এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।’

এই ভাষণের মধ্যদিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতিকে তুলে আনেন এক অনন্য উচ্চতায়। এতে সামরিক আইন প্রত্যাহার, সৈন্যবাহিনীর ব্যারাকে প্রত্যাবর্তন, শহীদদের জন্য ক্ষতিপুরণ ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের চারদফা দাবি উত্থাপন করেন তিনি।

রেসকোর্স ময়দান থেকে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ সরাসরি প্রচারের সব আয়োজন ছিল ঢাকা বেতার কর্তৃপক্ষের। প্রচার শুরুও হয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তান সরকার প্রচার বন্ধ করে দিলে বেতারের সব বাঙালি কর্মচারী বেতার ভবন ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। বন্ধ হয়ে যায় সব ধরনের সম্প্রচার কার্যক্রম। গভীর রাতে অবশ্য বঙ্গবন্ধুর ভাষণ সম্প্রচারের অনুমতি দিতে বাধ্য হয় পাকিস্তান সরকার। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ স্বাধীনতার ইতিহাসে অত্যন্ত গুরত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যময় ঘটনা।

মূলত বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণের আহ্বানেই জাতি মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ২৫ মার্চের কালরাতে পাকবাহিনীর নৃশংস গণহত্যার পর ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু দেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। নয়মাসের যুদ্ধ শেষে ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয় চূড়ান্ত বিজয়। অভ্যুদয় ঘটে বাংলাদেশ নামের একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের। -ডেস্ক