(দিনাজপুর২৪.কম) ৯ই জুলাই, ২০১৫। গণতান্ত্রিক জমানায় তৈরি হলো নতুন এক ইতিহাস। ১৯৯১ সালে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তনের পর বাংলাদেশে এটা অনেকটা রীতিতেই পরিণত হয়েছিল। দলের সেক্রেটারি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করবেন। কিন্তু এবারই এসে প্রথম এর ব্যতিক্রম ঘটলো। দলের সাধারণ সম্পাদক হলেও এলজিআরডি মন্ত্রীর দায়িত্ব হারালেন সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। তার স্থলাভিষিক্ত হওয়া ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন অবশ্য আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে কখনওই প্রভাবশালী হিসেবে বিবেচিত ছিলেন না। যদিও সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম সাধারণ সম্পাদক পদে বহাল থাকেন কি-না সে প্রশ্নও এখন আলোচিত হচ্ছে। একসময়কার প্রবল প্রতাপশালী সৈয়দ আশরাফের জীবনে এখন দুঃসময়ই যাচ্ছে। তার এই দুর্দিনে অবশ্য অনেকে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাজউদ্দীন আহমেদের বিচ্ছেদের কথাও স্মরণ করছেন। বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে যা অন্যতম বড় ভুল হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।

অন্যদিকে, দুঃসময় কাটাচ্ছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও। গত ৬ই জানুয়ারি থেকে কারাবন্দি রয়েছেন তিনি। অল্প আগে আপিল বিভাগের এক রায়ে তার জামিন বহাল রাখা হয়েছে। এতে ফখরুলের মুক্তি পেতে আর কোনো বাধা নেই বলে জানিয়েছেন আইনজীবীরা। গণতান্ত্রিক যুগে বাংলাদেশে প্রধান দুটি রাজনীতিক দলের সেক্রেটারিকে কখনওই এত দীর্ঘসময় টানাকারাভোগ করতে হয়নি। গত ২১শে জুন সর্বশেষ তিন মামলায় তিনি হাইকোর্ট থেকে জামিন পান। তবে এখনও তার মুক্তি মিলেনি। তার জামিনের বিরুদ্ধে সরকারপক্ষ আপিল বিভাগে আবেদন করেছে। এ আবেদন এখনও নিষ্পত্তি হয়নি। যদিও মির্জা ফখরুল আসলে ব্যতিক্রম হয়ে যান ২০১২ সালের ১৬ই মে’তেই। যেদিন গণতান্ত্রিক সময়ে প্রথমবার প্রধান বিরোধী দলের মহাসচিব হিসেবে তিনি গ্রেপ্তার হন। সেবার ৩০ দিন কারাভোগ করে মুক্তি মিলে তাঁর। এরপর অবশ্য আরও পাঁচ দফায় গ্রেপ্তার হতে হয়েছে তাকে। তার বিরুদ্ধে প্রায় ৯০টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। সহিসংতার উস্কানি আর পরিকল্পনার অভিযোগে এসব মামলা দায়ের করেছে পুলিশ।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিদ্বেষের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। স্বৈরাচার এরশাদের পতনের পর গণতান্ত্রিক সময়েও সে বিদ্বেষের মাত্রা কমেনি। নানা রাজনীতিক মামলায় হেনস্তা করা হয়েছে প্রতিপক্ষকে। কারাগারে ঠাঁই পেতে হয়েছে সিনিয়র রাজনীতিবিদদেরও। তবুও আওয়ামী লীগ-বিএনপি পরস্পরের প্রতি অলিখিত কিছু শ্রদ্ধা দেখিয়েছে। কখনওই প্রতিপক্ষের সভাপতি ও সেক্রেটারিকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। ২০০৪ সালে সালে বিএনপির ক্ষমতায় থাকার সময় ৩০শে এপ্রিলের ট্যাম্পকার্ড ঘোষণা করে ব্যাপক আলোচিত হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের তখনকার সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল। সেসময় বিরোধী নেতা-কর্মীদের ওপর ব্যাপকভাবে দমন পীড়ন চালানো হয়েছিল। কিন্তু আবদুল জলিলকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।
প্রধান দুই দলের সভাপতি-সেক্রেটারি গ্রেপ্তার না হওয়ার এ রীতি ভঙ্গ হয় সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে। যখন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনকে তখন গ্রেপ্তার করা না হলেও তাকে নানামুখী হেনস্তার শিকার হতে হয়েছিল। ওয়ান ইলেভেনের হেনস্তার মূল্যবোধ কি রাজনীতিতে স্থায়ী হয়ে গেছে সে প্রশ্নও এখন জোরেশোরে উঠেছে।
ওদিকে, জাতীয় চার নেতার অন্যতম সৈয়দ নজরুল ইসলামের ছেলে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম জরুরি জমানার সময় আওয়ামী লীগ তথা দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়েছিলেন। সেসময় আওয়ামী লীগের বাঘাবাঘা নেতাদের অনেকেই সংস্কারের খাতায় নাম লিখিয়েছিলেন। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় নিতে পর্দার আড়ালে প্রধান ভূমিকা রাখেন সৈয়দ আশরাফ। এ অবদানের জন্য অবশ্য দলে পুরস্কৃতও হন তিনি। দলের সাধারণ সম্পাদক পদের পাশাপাশি এলজিআরডি মন্ত্রীর পদও পান তিনি। তবে শুরু থেকেই দলের একটি অংশ সৈয়দ আশরাফের বিরুদ্ধে সক্রিয় ছিল। তারা দলে তার উত্থানকে মেনে নিতে পারেনি। দল এবং মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমে সৈয়দ আশরাফের অনুপস্থিতির বিষয়টি কাজে লাগাতেও সক্রিয় ছিল তারা। সৎ রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত সৈয়দ আশরাফ কেন নিয়মিত মন্ত্রণালয়ে যেতেন না তা অবশ্য এক রহস্যই। কেউ কেউ বলেন, দল এবং মন্ত্রণালয়ে নানা রকম তদবিরবাজদের থেকে দূরে থাকার জন্যই তিনি এ কৌশল অবলম্বন করেছেন। তবে সৈয়দ আশরাফকে মন্ত্রীর পদ থেকে অব্যাহতি দেয়ার ক্ষেত্রে তার বিরোধীরা আপাতত সফলই হয়েছেন। এমনকি তাকে পদত্যাগেরও কোনো সুযোগ দেওয়া হয়নি। আপাতত দুটি বিষয়ের দিকেই দৃষ্টি রাখছেন পর্যবেক্ষকরা। প্রথমত, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদে সৈয়দ আশরাফ বহাল থাকেন কি-না? ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগের কাউন্সিলেই হয়তো এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, দফতর বিহীন মন্ত্রীর পদ আশরাফ ধরে রাখেন কি-না তাও হবে দেখার বিষয়।
সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের অবশ্য বহু বিষয়েই মিল রয়েছে। দুই জনই রাজনীতিতে কখনওই বিতর্কিত ছিলেন না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে যদিও তাদের সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে কখনওই দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপিত হয়নি। তারা কখনওই অশালীন ভাষায় প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করেননি। যদিও সবচেয়ে বড় অমিল মির্জা ফখরুলের দীর্ঘদিনেও ভারমুক্ত হতে না পারা। রাজনীতি শেষ পর্যন্ত দুই প্রধান দলের মহাসচিবকে একই বিন্দুতে এসে দাঁড় করিয়েছে। তাদের দু জনেরই এখন দুঃসময় যাচ্ছে। যা অবশ্য রাজনীতির জন্য ভালো নয় বলেই বলছেন পর্যবেক্ষকরা।(ডেস্ক)