মো. জাকির হোসেন (দিনাজপুর২৪.কম) নীলফামারী জেলার বাণিজ্যিক শহর সৈয়দপুরের আবাসিক এলাকায় একের পর এক গড়ে উঠছে গুল ফ্যাক্টরী। ফলে এখানকার বাতাসে উড়ছে তামাকের গুড়া। পরিবেশের উপর বিরুপ প্রভাব বিস্তারকারী এ গুল ছড়িয়ে পড়েছে শহরময়। এর ঝাঁঝালো গন্ধে বিষাক্ত ও দুষণমুক্ত হয়ে পড়েছে পরিবেশ। জনজীবনের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর এই গুল ফ্যাক্টরীর কারণে স্বাভাবিকভাবে বসবাস করাও দুরুহ হয়ে পড়েছে। দেখা দিয়েছে নানা রোগ-ব্যধিসহ অসংখ্য সমস্যা। সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছে শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থরা। আবাসিক এলাকায় গড়ে উঠা গুল ফ্যাক্টরীগুলোতে দিনরাত উন্মুক্ত পেষাই মেশিনে তামাক গুড়া করার ফলে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সৈয়দপুর শহরের বাঁশবাড়ি, নতুন বাবুপাড়া, হাজী কলোনী, মিস্ত্রিপাড়া, গোলাহাটসহ কয়েকটি আবাসিক এলাকায় ছোট-বড় মিলে ৩০টির বেশি গুল ফ্যাক্টরি আছে। তবে বড় গুল ফ্যাক্টরি রয়েছে ৫টি। এগুলো হলো তারেক, খালেদ, শাকিব, ওয়ান স্টার ও নিউ স্টার গুল ফ্যাক্টরি। প্রায় ১০ হাজার শ্রমিক কাজ করে এসব ফ্যাক্টরিতে। শ্রমিকদের শতকরা ৯০ ভাগই নারী ও শিশু। অত্যন্ত সস্তায় মেলে এসব শ্রমিকের শ্রম। ফ্যাক্টরিগুলোতে শ্রমিকদের জীবন মান উন্নয়নে মালিকদের নেই কোন পরিকল্পনা। অল্প আয়ের মানুষ বসবাস করে এমন আবাসিক এলাকায় গুল ফ্যাক্টরিগুলো গড়ে তোলা হয়েছে। কোন প্রকার নিয়মনীতি মানেননা ফ্যাক্টরি মালিকরা। প্রশাসনও এ ব্যাপারে কোন পদক্ষেপ নেননা বলে অভিযোগ রয়েছে। আবাসিক এলাকা থেকে গুল ফ্যাক্টরিগুলো সরিয়ে নেয়ার এলাকাবাসীর দাবি বরাবরই থেকেছে উপেক্ষিত।
এসব ফ্যাক্টরীতে তামাক পাতা ভাজার পর হলার মেশিনে গুড়া করা হয়। দিনরাত অনবরত গুল ফ্যাক্টরীগুলোতে তামাক গুড়া করার সময় তা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশে। গুলের ঝাঁঝালো গন্ধে এলাকার পরিবেশ চরমভাবে দুষিত হওয়ায় স্বাভাবিক বসবাস করাও কষ্টকর হয়ে পড়েছে। চোখ-নাক ও মুখে তামাক গুড়া ঢুকে শ্বাসকষ্ট, হুপিং কাশি, নিউমোনিয়া, যাসহ চোখের নানা সমস্যা দেখা দিচ্ছে। সৈয়দপুর এমনিতে ঘিঞ্জি শহর, তার উপর আবাসিক এলাকায় এভাবে গুল ফ্যাক্টরী গড়ে উঠায় পরিবেশ মারাত্মকভাবে দুষিত হয়ে পড়েছে। এলাকাবাসী সমস্যায় থাকলেও ফ্যাক্টরী কর্তৃপক্ষ তা কর্ণপাত করছেন না। এ ব্যাপারে পৌরসভার ওযার্ড কাউন্সিলর, পৌর মেয়র, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, উপজেলা চেয়ারম্যান, জেলা প্রশাসকসহ প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দেয়া হলেও কেউ কোন পদক্ষেপ নেয়নি। পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন ছাড়াই শুধুমাত্র পৌর ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে এভাবে ব্যবসা করার সুযোগ পেয়ে সৈয়দপুরে ইতোমধ্যে ১০/১২টি গুল ফ্যাক্টরী গড়ে উঠেছে। এসব ফ্যাক্টরীর বেশির ভাগই আবাসিক এলাকায় গড়ে উঠায় জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে।
গুল ফ্যাক্টরির মালিকরা জানান, সমাজ বাস্তবতার কারণে ইচ্ছে থাকা সত্বেও নারী ও মিশু শ্রমিকদের কাজে নিতে হয়। ফ্যাক্টরিগুলোতে শিশু ও কিশোর- কিশোরী শ্রমিক দিনহাজিরা কাজ করেন বলে জানান তারা। সৈয়দপুর পৌরসভার মেয়র অধ্যক্ষ আমজাদ হোসেন সরকার জানান, পৌর এলাকা থেকে বিশেষ করে আবাসিক এলাকা থেকে গুল ও তামাক পণ্যের কারখানাগুলো সরিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত অচিরেই বাস্তবায়ন করা হবে।
সৈয়দপুরে গুল ফ্যাক্টরিতে কর্মরত শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ঝুঁকির বিষয়ে কথা হয় মেডিসিন বিশেষজ্ঞ বিএমএ সৈয়দপুর শাখার সভাপতি ডা. শেখ নজরুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি জানান, স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হলো গুল ফ্যাক্টরি। তামাক পণ্যের ফ্যাক্টরিতে কর্মরত শ্রমিকদের ফুসফুস ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে নারী ও কিশোরী শ্রমিকরা বিয়ের পর যে সন্তান জন্ম দেবে তা জন্ম নেবে ক্যান্সার আক্রান্তের আশঙ্কা নিয়ে। আর যেসব শিশু গুল ফ্যাক্টরিতে কাজ করছে তারা ক্যান্সার আক্রান্তের আশঙ্কা নিয়ে বেড়ে উঠছে। এজন্য কাজ করার সময় শ্রমিকদের হাতে গ্লোাভস, পায়ে গাম বুট, নাকে উন্নতমানের মাস্ক এবং অ্যাপ্রোন পড়তে হবে। এর ব্যতয় ঘটলে তামাক পণ্যের ফ্যাক্টরির ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। তাঁর মতে, দেশের প্রচলিত শ্রম আইনের সঠিক প্রয়োগ না থাকায় তামাক ফ্যাক্টরিগুলোতে নারী ও শিশু শ্রমিকদের সংখ্যা দিনদিন বাড়ছে।