(দিনাজপুর২৪.কম) সেনাবাহিনীর সদস্যদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের সাফল্য বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ঢাকা সেনানিবাসের সেনাসদর কনফারেন্স হল (হেলমেট)-এ ‘সেনাসদর নির্বাচনী পর্ষদ-২০১৭’ এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করার আগে বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রী। এর মাধ্যমে সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের পদোন্নতির লক্ষ্যে পাঁচ দিনব্যাপী (৯-১৩ই জুলাই) আয়োজিত এ পর্ষদের কার্যক্রম শুরু হলো। এ পর্ষদের মাধ্যমে লেফটেন্যান্ট কর্নেল থেকে কর্নেল এবং কর্নেল থেকে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদবিতে পদোন্নতির জন্য সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানিয়েছে, সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের কর্মকর্তাবৃন্দের সমন্বয়ে গঠিত এ পর্ষদের মাধ্যমে সেনাবাহিনীর ভবিষ্যৎ জ্যেষ্ঠ নেতৃত্বের জন্য যোগ্য ও দক্ষ অফিসারগণ সরকারের অনুমোদন সাপেক্ষে পদোন্নতি পাবেন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সকল প্রাকৃতিক দুর্যোগে সেনাবাহিনীর সদস্যরা যেভাবে দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সাহায্য ও সহমর্মিতা প্রদর্শন করেছে তা জনগণের প্রভূত প্রশংসা ও বিশ্বব্যাপী সুনাম অর্জন করেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে সেনাসদস্যরা দ্রুতগতিতে সাড়া দিয়ে সাধারণ জনগণের পাশে দাঁড়ানোর ফলে সেনাবাহিনীর উপর জনগণের আস্থা বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি বলেন, সম্প্রতি রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানে পাহাড় ধসে সমগ্র এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে নিরলস প্রচেষ্টায় তা দ্রুত পুনরুদ্ধার অভিযান ও পাহাড় ধসে ক্ষতিগ্রস্তদের খাবার, পানি ও চিকিৎসাসেবা প্রদানসহ সাতটি আশ্রয়কেন্দ্রের দায়িত্ব গ্রহণ করে জনগণের সেবায় সেনাসদস্যরা নিজেদের নিয়োজিত করেন। সেনাসদস্যদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাঙ্গামাটিতে উদ্ধার কার্যক্রম চলাকালীন দুই জন সেনা কর্মকর্তাসহ পাঁচজন সহকর্মীকে হারানোর ব্যথা নিয়ে রোজা রেখে আর্তমানবতার সেবায় আপনাদের এই আত্মত্যাগ একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। আমি সেনাবাহিনীর সদস্যদের আত্মত্যাগকে গভীর সমবেদনার সঙ্গে স্মরণ করছি। তিনি বলেন, জাতির পিতার প্রণীত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের ধারাবাহিকতা আমাদের সরকার ১৯৯৬ হতে ২০০১ সাল পর্যন্তও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ব্যাপক উন্নতি-অগ্রগতি সাধন করেছিল। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণের মান আধুনিক ও যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে তার সরকার কয়েকটি নতুন প্রশিক্ষণ একাডেমিসহ সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পদাতিক কোরের উন্নয়ন ও কার্যক্রমে গতিশীলতা আনয়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ইনফেন্ট্রি রেজিমেন্টাল সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা হয়। এছাড়াও সেনাসদস্যদের চিকিৎসা, বেতন ভাতা ও আবাসনসহ বিভিন্ন উন্নয়ন ও পুনর্গঠনমূলক পদক্ষেপ গৃহীত হয়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতা গ্রহণের পর ২০০৯ সাল হতে ২০১৩ সাল পর্যন্ত সেনাবাহিনীর উন্নয়নের লক্ষ্যে নতুন পদাতিক ডিভিশন ও ব্রিগেড প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র ও সরঞ্জামাদিতে সজ্জিত করার বিভিন্ন বাস্তবমুখী পদক্ষেপ অব্যাহত ছিল। শেখ হাসিনা বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালের ১১ই জানুয়ারি বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির প্রথম শর্ট কোর্সের সমাপনী কুচকাওয়াজে উন্নত বিশ্বের চৌকস সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ একাডেমির সমতুল্য একটি একাডেমি প্রতিষ্ঠার আশাবাদ ব্যক্ত করেন। এরই ধারাবাহিকতায় প্রশিক্ষণ একাডেমিগুলো আজ বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। দেশ গঠনে সোনবাহিনীর গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পের নিরাপত্তা ও তদারকি, ‘পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প’ এর সুপারভিশন পরামর্শক হিসেবে স্বপ্নের পদ্মা সেতু নির্মাণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। বর্তমানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কর্তৃক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নকল্পে আরও বেশ কয়েকটি প্রকল্প চলমান রয়েছে। সরকার প্রধান বলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বিভিন্ন প্রতিকূলতায় থমকে যাওয়া মেরিন ড্রাইভ সড়কটি সকল প্রকার কারিগরি মান বজায় রেখে দেশজ সমপদ এবং মেধা ব্যবহার করে নির্ধারিত সময়ের আগেই অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে সমপন্ন করেছে। ৬ জন সেনাসদস্যের অমূল্য প্রাণের বিনিময়ে এ প্রকল্প বাস্তবায়নে সেনাবাহিনী তার পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়েছে। সন্ত্রাস ও জঙ্গি দমনে সেনাবাহিনীর ভূমিকার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় ও জঙ্গি তৎপরতা দমনে সেনাবাহিনীর ভূমিকা অনস্বীকার্য। গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় ও সিলেটের আতিয়া মহলে সেনাবাহিনীর কমান্ডো ইউনিটের জঙ্গিবিরোধী অভিযান দেশ-বিদেশে সেনাবাহিনীর উন্নত প্রশিক্ষণ, দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়েছে। সেনাসদস্যরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে আতিয়া মহল থেকে ২১ জন শিশুসহ সর্বমোট ৭৮ জনকে নিরাপদে উদ্ধার করে। সফলভাবে এই দু’টি জিম্মি উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করার জন্য আমি আপনাদেরকে আবারো আন্তরিক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেনাসদস্যদের মনোবল বৃদ্ধিতে বর্তমান সরকারের সময়ে বিভিন্ন ধরনের উন্নয়ন, সম্প্রসারণ ও কল্যাণমুখী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। আধুনিক বিজ্ঞান ও তথ্য-প্রযুক্তির এই যুগে বাংলাদেশকে উন্নত বিশ্বের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য বিভিন্ন সেনানিবাসে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। আধুনিক চিকিৎসা সুবিধাসহ ঢাকা সিএমএইচকে একটি আন্তর্জাতিক মানসমপন্ন হাসপাতালে পরিণত করার পাশাপাশি বিভিন্ন সেনানিবাসে আর্মি মেডিক্যাল কলেজ, বাংলাদেশ আর্মি ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি এবং আর্মি স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড এডমিনিস্ট্রেশন গঠন করা হয়েছে। এছাড়াও সেনাবাহিনীতে আরও ৫টি ডেন্টাল কলেজ এবং ৫টি নার্সিং ইনস্টিটিউট স্থাপনের পরিকল্পনা প্রক্রিয়াধীন আছে। এর ফলে চিকিৎসা ও কারিগরি শিক্ষার মান বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। বাংলাদেশের একমাত্র বার্ন ইউনিট ও প্লাস্টিক সার্জারি হাসপাতাল নির্মাণের কাজ সেনাবাহিনীকে অর্পণ করা হয়েছে। যা দক্ষিণ এশিয়ায় অন্যতম একটি হাসপাতাল হবে। শেখ হাসিনা বলেন, জন প্রসাশনের বেতন-ভাতাদি বৃদ্ধির দিকে নজর রেখেই সেনাসদসদের জন্য নতুন বেতন-ভাতার কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। এ সময় ‘জলসিঁড়ি’ আবাসন প্রকল্পের কাজও দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে বলে প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন। প্রধানমন্ত্রী ৭ দশমিক ২ শতাংশ জাতীয় প্রবৃদ্ধি অর্জনসহ তাঁর সরকারের নেতৃত্বে দেশের সুষম আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের একটি খণ্ডচিত্রও তুলে ধরে বলেন, তাঁর সরকারের এই মেয়াদেই একই সঙ্গে মুদ্রাস্ফীতি দুই অংকের সংখ্যা থেকে ৫ শতাংশে নেমে এসেছে। দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ফলে মানুষের গড় আয়ু বৃদ্িধ পেয়ে বর্তমানে ৭২ বছরে উন্নীত হয়েছে। বর্তমান সরকার নারীর ক্ষমতায়নে বিশ্বাসী উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের সরকারই সর্বপ্রথম বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে মহিলা অফিসার এবং আর্মি মেডিকেল কোরে প্রথমবারের মত মহিলা সৈনিক অন্তর্র্ভুক্ত করে। এছাড়াও, বর্তমানে সেনাবাহিনীর বিভিন্ন কোরে মহিলা সৈনিকরা অত্যন্ত সফলতার সাথে তাদের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে জেনে আমি খুশি হয়েছি। তিনি বলেন, আমি আরও খুশি হয়েছি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মহিলা অফিসারগণ স্টাফ কলেজ সমপন্ন করে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ পাচ্ছেন এবং ইতিমধ্যে ২ জন নারী অফিসার সেনা বিমানে পাইলট হিসেবে প্রশিক্ষিত হয়েছেন। সরকার প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কর্তৃক কঙ্গোতে প্রেরিত একটি মেডিকেল কন্টিনজেন্টের কন্টিনজেন্ট কমান্ডার হিসেবে মহিলা অফিসার এর সফল শান্তিরক্ষা কার্যক্রম জাতিসংঘ ও বিশ্বে নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়ে বাংলাদেশের উদ্যোগকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে। এ সকল অর্জনগুলো নারীর ক্ষমতায়নের প্রক্রিয়াকে আরো বেগবান করবে। ফলে সামগ্রিক আর্থ-সামাজিক অবস্থার ব্যাপক উন্নতি হবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। এর আগে প্রধানমন্ত্রী সেনাসদরে পৌঁছালে তাকে স্বাগত জানান সেনাবাহনী প্রধান জেনারেল আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হক। এয়াড়া অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল তারিক আহমেদ সিদ্দিক (অব.), প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. কামাল আবদুল নাসের, ভারপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষা সচিব আকতার হোসাইন ভূঁইয়া এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিমসহ সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। –ডেস্ক