(দিনাজপুর২৪.কম) ইরাকের বাগদাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যেদিন আল-কুদস ফোর্সের প্রধান মেজর জেনারেল কাসেম সোলাইমানি যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলার শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন, একইদিনে ইয়েমেনে আরেক ইরানি সামরিক কর্মকর্তাকে হত্যা করতে ব্যাপক গোপনীয় অভিযান চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী।

দেশটির কর্মকর্তাদের বরাতে ওয়াশিংটন পোস্ট ও নিউইয়র্ক টাইমস এমন খবর দিয়েছে।

ইরানের অভিজাত আল-কুদস ফোর্সের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কমান্ডার ও অর্থযোগানদাতা আবদুল রেজা শাহলেই যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেনে সক্রিয় রয়েছেন।

সেদিন মার্কিন হামলার লক্ষ্যবস্তু হলেও তিনি প্রাণে বেঁচে গেছেন বলে ঘটনা সম্পর্কে অবগত মার্কিন কর্মকর্তারা দাবি করেছেন।

বিপ্লবী গার্ডসদের কমান্ডারদের বিরুদ্ধে ইরাকে সফল ও ইয়েমেনে ব্যর্থ মার্কিন অভিযান ইরানের এই অভিজাত বাহিনীকে বিভ্রান্তিতে ফেলে দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের জ্যেষ্ঠ সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা মনে করেন, বিপ্লবী গার্ডসের বিরুদ্ধে সরাসরি হামলায় সিরিয়া, ইরাক, লেবানন ও ইয়েমেনে তাদের ছায়াযুদ্ধের সক্ষমতা ধ্বংস হয়ে যাবে।

তবে এই অসফল অভিযান এই আভাস দিচ্ছে যে, আগে যে বিবরণ দেয়া হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের তার চেয়েও ব্যাপক বিস্তৃত মিশনের অংশ ছিল জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হত্যা। ইরানি সামরিক ও আধাসামরিক বাহিনীর একটি বড় অংশের ওপর হামলার চেষ্টা চালিয়েছিল ট্রাম্প প্রশাসন।

এতে ট্রাম্পের দাবি করা আসন্ন হামলা থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সুরক্ষায় নাকি বিপ্লবী গার্ডসের নেতৃত্ব ধ্বংস করে দেয়ার পরিকল্পনা থেকেই এই অভিযান চালানো হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

গেল পাঁচ বছর ধরে গৃহযুদ্ধে বিশ্বের সবচেয়ে মারাত্মক মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে ইয়েমেনে।

তবে মার্কিন বাহিনীর এই অভিযান ছিল ব্যাপক গোপনীয়তার চাদরে ঢাকা। দেশটির কর্মকর্তারা বলছেন, ইরানের ছায়াযুদ্ধের অন্যতম অর্থদাতা শাহলেইর বিরুদ্ধে এই অভিযান ছিল অতিগোপনীয়।

মিশনের ব্যর্থতার বাইরে কোনো বিস্তারিত তথ্য দিতে অস্বীকার করেছেন অধিকাংশ মার্কিন কর্মকর্তা। দুই অভিযানের সফলতা ঘোষণা নিয়েই আলোচনা করেছিল সেদিন পর্যবেক্ষণে থাকা পেন্টাগন ও ফ্লোরিডার কর্মকর্তারা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক যুক্তরাষ্ট্রের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, যদি তাকেও আমরা হত্যা করতে পারতাম, তবে সেই রাতটি নিয়ে বড়াই করতে পারতাম।

আরেক কর্মকর্তা বলেন, একই সময় এই দুই অভিযানের অনুমোদন দেয়া হয়েছিল। কিন্তু পরিকল্পনা অনুসারে সফল না হওয়ায় আবদুল রেজা শাহলেইর বিরুদ্ধে অভিযানের খবর প্রকাশ্যে আনতে চায়নি যুক্তরাষ্ট্র।

সোলাইমানি ও শাহলেইকে হত্যায় অভিযানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একইসময় অনুমোদন দিলেও একই সময় হামলা সংঘটিত হয়েছিল কিনা; সেই তথ্য নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হয়নি।

আগামীতেও তার বিরুদ্ধে অভিযান চলবে বলে জানিয়েছেন মার্কিন কর্মকর্তারা। যদিও দুই দেশই উত্তেজনা কমানোর আভাস দিয়েছে।

সোলাইমানিকে হত্যার সিদ্ধান্তে ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি কংগ্রেসের তদন্তের মুখে পড়েছে। কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া ইরানের বিরুদ্ধে হামলায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কর্তৃত্ব খর্ব করতে বৃহস্পতিবার একটি প্রস্তাব পাস করা হয়েছে।

মার্কিন প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের দাবি, আসন্ন হুমকি থেকে কয়েক শত না হলেও কয়েক ডজন আমেরিকানের জীবন রক্ষা করেছে সোলাইমানি হত্যা। কিন্তু আবদুল রেজা শাহলেইর বিরুদ্ধে অভিযান সেই যুক্তিকে সম্ভবত আরও জটিল করে তুলেছে।

ব্রুকিং ইনস্টিটিউশনের ইরান বিষয়ক গবেষক সুজান্নে ম্যালোনে বলেন, দীর্ঘ পরিকল্পিত ও বড় উদ্দেশ্যরই ইঙ্গিত দিচ্ছে এই মিশন। আসন্ন হমকির কথা বলেই কেন এই অভিযানকে ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

বিশেষভাবে শাহলেইকে একজন প্রভাবশালী শত্রু হিসেবেই দেখছে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন। পেন্টাগনের মুখপাত্র কমান্ডার রেবারিচ বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের অভিযানগুলো নিয়ে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় কোনো আলোচনা করে না।

ইয়েমেনকে সন্ত্রাসী ও যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুদের নিরাপদ আস্তানা আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, ২ জানুয়ারিতে অভিযান নিয়ে আমরা প্রতিবেদন দেখেছি।

কমান্ডার শাহলেই ও বিপ্লবী গার্ডসের অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া ব্যহত করতে তথ্য দিতে পারলে দেড় কোটি ডলার পুরস্কার দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ঘোষণায় বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও দেশটির মিত্রদের হামলার লক্ষ্যবস্তু বানাতে ইয়েমেনভিত্তিক শাহলেইর সংশ্লিষ্টতার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। যার মধ্যে ২০১১ সালে ওয়াশিংটনে একটি ইতালীয় রেস্তোরাঁয় সৌদি রাষ্ট্রদূতের বিরুদ্ধে হামলার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ রয়েছে।

মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, ১৯৫৭ সালের দিকে জন্মগ্রহণ করেছেন বিপ্লবী গার্ডসের এই কমান্ডার। ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর ওপর হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। যেমন, কারবালা শহরে ২০০৭ সালে এক দুঃসাহসিক অভিযানে পাঁচ মার্কিন সেনাকে অপহরণ করে হত্যা করে ইরান-সমর্থিত শিয়ারা।

গত বছর এক সংবাদ সম্মেলনে ইরান বিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ প্রতিনিধি ব্রিয়ান হুক বলেন, ইয়েমেনে শাহলেইর উপস্থিতি ও আমাদের দিক থেকে নিষিদ্ধ হুতি বিদ্রোহীদের অত্যাধুনিক অস্ত্র সরবরাহে সম্ভাব্য ভূমিকা রাখায় তার ব্যাপারে ওয়াশিংটন মারাত্মক উদ্বিগ্ন।

ইয়েমেনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোটের বিরুদ্ধে গত কয়েক বছর ধরে রক্তক্ষয়ী লড়াই চালিয়ে আসছে হুতি বিদ্রোহীদের। লড়াইয়ে ইরান তাদের সহায়তা ও প্রশিক্ষণ দিচ্ছে বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।

তবে এই অভিযান কেন সফল হয়নি, তা পরিষ্কার হওয়া সম্ভাব হয়নি। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও হোয়াইট হাউস এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চায়নি।

সোলাইমানিকে হত্যার মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথম কোনো বিদেশি সামরিক বাহিনীর জ্যেষ্ঠ সদস্যকে হামলার লক্ষ্যবস্তু বানায় যুক্তরাষ্ট্র। তবে শাহলেইর বিরুদ্ধে অভিযান এমন এক সময় চালানো হয়েছে, যখন ইয়েমেন যুদ্ধের রাজনৈতিক সমাধানের প্রতি জোর দিয়েছে জাতিসংঘ। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ২০১৫ সালে হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করলে এই যুদ্ধ শুরু হয়।

হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জয়ী হতে মরিয়া সৌদি সমর্থিত ইয়েমেন সরকার। এতে যুদ্ধ, রোগ ও ক্ষুধায় আক্রান্ত হয়ে হাজার হাজার বেসামরিক লোক নিহত হয়েছেন। -ডেস্ক