(দিনাজপুর২৪.কম) বাংলাদেশের এই ব্যাটসম্যানকে তার সময়ের ক্রিকেটারদের মধ্যে কিছুটা ভাগ্যবানই বলা যায়। ২০০৩ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত দেশের হয়ে ২৪ টেস্ট ম্যাচ খেলার সুযোগ হয়েছে সিলেটের এ ক্রিকেটারের। অভিষেক টেস্টে পাকিস্তানের বিপক্ষে ফিফটি হাঁকানো এই ব্যাটসম্যানের অবশ্য বড় কোনো অবদান রাখার সুযোগ হয়নি। ৭ ফিফটিতে ২৫.৯৩ গড়ে ১১৪১ রান করে শেষ হয়েছে তার টেস্ট ক্যারিয়ার। তার ৫ বছরের টেস্ট ক্যারিয়ারে বাংলাদেশ দুটি টেস্টে জয়ের অনেক কাছ থেকে ফিরে এসেছে। একটি পাকিস্তানের বিপক্ষে মুলতানে এক উইকেটের জন্য হেরে যায় বাংলাদেশ। অপরটি ২০০৬ সালে দেশের মাটিতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৩ উইকেটে হার। দুটি হারের আক্ষেপ এখনো তাকে তাড়া করে বেড়ায়। আবার সেই দুই টেস্টে খেলতে পারার গর্ববোধও কম নয়। দুটি টেস্টে বাংলাদেশ দল হেরেছিল অভিজ্ঞতার জন্য। ১১ বছর পর ফের অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট খেলতে যাচ্ছে টাইগাররা। রাজিন বিশ্বাস করেন এবার তাদের ভুলের পুনরাবৃত্তি করবেন না মুশফিক, সাকিবরা। অস্ট্রেলিয়া টেস্টের সেই স্মৃতি ও বদলে যাওয়া টাইগারদের প্রত্যাশা নিয়ে কথা বলেছেন দৈনিক মানবজমিনের স্পোর্টস রিপোর্টার ইশতিয়াক পারভেজের সঙ্গে। সেই কথোপকথনের মূল অংশ তুলে ধরা হলো-
প্রশ্ন: কেমন ছিল আপনার সময়ের সেই অস্ট্রেলিয়া দল?
রাজিন: ২০০৬-এর সেই দলকে কিন্তু এখনো অস্ট্রেলিয়ার সেরা একাদশই বলা হয়। কে ছিল না সেই দলে? রিকি পন্টিং অধিনায়ক, শেন ওয়ার্ন, ব্রেট লি, মাইকেল ক্লার্ক এই নাম গুলোতো ছিল স্বপ্নের মতো। আমি সেই দলের বিপক্ষে দেশের হয়ে খেলতে পেরেছি সেটি ছিল আমার জন্যও স্বপ্নের মতো। এরপর যত দিন ক্রিকেট খেলেছি ওদের সঙ্গে খেলার প্রতিটি স্মৃতি ছিল আমার ক্যারিয়ারের অনুপ্রেরণা। আমি গর্বিত এমন একটি সিরিজে খেলতে পেরে। আমরাতো ফতুল্লাতে সেই টেস্ট প্রায় জিতেই গিয়েছিলাম। মাশরাফি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে একটি ক্যাচ ফেলে দিয়েছিল নয়তো জিতেই যেতাম।
প্রশ্ন: আপনার ক্যারিয়ারে মুলতানের পর অস্ট্রেলিয়া টেস্টটাও একই আপেক্ষের কিনা?
রাজিন: ২০০৩ এ পাকিস্তানের বিপক্ষে সেটি ছিল আমার অভিষেক টেস্ট সিরিজ। মুলতানের ম্যাচটি ছিল আমাদের তৃতীয় টেস্ট। আমি দুই ইনিংসে ৪০ এর মতো রান করেছিলাম। কিন্তু শেষ মুহূর্তে ইনজামামুল হকের এলবিডাব্লিউটি না দেয়াতে আমরা এক উইকেটে হেরে যাই। সেবারই আমরা প্রথম টেস্ট জিততে পারতাম। এরপর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষেও ফতুল্লাতেও আমরা জিততে জিততে হেরে যাই। সেই ম্যাচেও আমার ব্যাট থেকে একটি ফিফটি আসে। আমি যেটা মনে করি আমাদের অভিজ্ঞতার কারণেই টেস্ট দুটিতে হেরে গিয়েছিলাম। সেই আক্ষেপতো কোনো দিনই ভুলতে পারবো না। সেই টেস্ট দুটি জিততে পারলে দেশের ইতিহাসে আমার নামটাও লেখা থাকতো।
প্রশ্ন: সে সময় মাঠে অস্ট্রেলিয়ানদের আচরণ কেমন ছিল?
রাজিন: অস্ট্রেলিয়ানরা সব সময় প্রফেশনাল। আর ব্রেট লি, শেন ওয়ার্ন, পন্টিং, ক্লার্ক, ম্যাকগিলরাতো মাঠে ভয়ঙ্কর ছিল। আমি আর শাহরিয়ার যখন জুটি বাঁধি শেন ওয়ার্ন স্লিপে এসে দাঁড়িয়েছিল শুধু স্লেজিং করার জন্য। আমরা যখন আউট হচ্ছিলাম না এমনিতে বাংলাদেশে গরম। সেই গরমে শেন ওয়ার্নের মুখ লাল হয়ে গিয়েছিল আর মুখে যে গালি আসছিল তাই বলছিল। আমরাও ঠিক করেছিলাম ওদের গালি কানে তুলবো না। শেন ওয়ার্ন বল করতে আসছিল তখনই ঠিক করে ছিলাম ওকে উইকেট দিবো না। এতে সে আমাকে আরো বেশি করে স্লেজিং করতে থাকে। আমরা যখন মাঠে খেলতে নামতাম তখন ওরা আমাদের চিনতই না। মাঠে ওদের দিকে তাকিয়ে হাসলে ওরা এমন ভাব করতো যে ছোট দলের ক্রিকেটার হিসেবে অপরাধ করে ফেলেছি।
প্রশ্ন: মাঠের বাইরে কেমন আচরণ করেছে?
রাজিন: না, না, ওদের মাঠের রূপ দেখে ভেবেছিলাম ওরা ভীষণ অহঙ্কারি হবে। কিন্তু আমি রান করেছিলাম বলে হোটেলে এসে আমাকে ব্রেট লি ডেকে নিয়ে গেছে। আমাকে নিয়ে বাইরে গিয়েছিল। শেন ওয়ার্ন আমাকে নিয়ে সিগারেট কিনতে গিয়েছিল। বলেছে তোমরা শুরুতে যে ভাবে ভালো খেলেছো দিন দিন আরো উন্নত করবে। সেই সময় পন্টিং বলেছিল তোমরা টেস্টে না হলেও ওয়ানডেতে দ্রুত উন্নতি করবে। দেখেন তাই কিন্তু হয়েছে। ওদের বাইরের রূপটা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা।
প্রশ্ন: অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ব্যাট করতে ভয় লাগেনি?
রাজিন: ভয় ছিল না, কিন্তু আলাদা একটা উত্তেজনা কাজ করেছে আমাদের মধ্যে। তখন আমাদের ভয় করেনি কারণ হারানোর মতো কিছু্‌ ছিল না। তখন খেলতে পারাটাই ছিল আমাদের জন্য অনেক বড় বিষয়। ব্রেট লি যখন বল করছিল মনে হচ্ছিল আমাকে সহই উড়িয়ে দিতে চায়। শেন ওয়ার্ন বল করছিল মনে হচ্ছে চোখ দিয়েই আউট করে দিবে। কিন্তু আমরা ভয় না পেয়ে অন্য রকম আনন্দে ছিলাম।
প্রশ্ন: ফতুল্লাতে দারুণ খেললেও চট্টগ্রামে বাজে ছিল পারফরম্যান্স। কেন?
রাজিন: আমরা তখন নতুন দল। মাত্র টেস্ট খেলাটা বুঝতে শুরু করেছি। ওরা ফতুল্লাতে প্রথম টেস্ট খেলার পরই আমাদের শক্তি ও দুর্বলতা বুঝতে পেরেছিল। তাই চট্টগ্রামে ভালো হয়নি। আরেকটা বিষয় হলো তখন আমাদের ব্যাটিং ভালো ছিল না। আমার মনে হয়, সেই সময় আমরা যে ম্যাচ হেরেছি তার বেশির ভাগই ছিল ব্যাটিং ব্যর্থতার কারণে।
প্রশ্ন: এখনকার স্পিনারদের ওপর কতটা ভরসা করেন?
রাজিন: তখনের তুলনাতে এখন বাংলাদেশ দল অনেক শক্তিশালী। রফিক ভাই সেরা স্পিনার ছিলেন এখনো আছেন। তবে সাকিবের মতো একজন বিশ্বসেরা স্পিন অলরাউন্ডার কিন্তু তখন দলে ছিল না। এখন সাকিবের সঙ্গে তাইজুল আছে। আর অফ স্পিনারদের মধ্যে মিরাজ, মোসাদ্দেক, মাহমুদুল্লাহ তো আছেই। আমি বলবো এখনকার স্পিন আক্রমণ অনেক বেশি ভরসা করার মতো।
প্রশ্ন: অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টিম কম্বিনেশন কেমন হওয়া উচিত?
রাজিন: আমি আমার মতামত দিচ্ছি। তামিম ইকবালের সঙ্গে সৌম্য বা ইমরুলকে খেলানো যেতে পারে। আর কোনো কারণে যদি তিনে মুমিনুলকে না খেলানো হয় সেখানে অবশ্য যেন ইমরুলকে আনা হয়। আর টেস্টে সাব্বিরকে তিনে খেলানোর জন্য আলোচনা তা ঠিক হবে না। ওকে ৭-৮ নাম্বারে খেলানো যেতে পারে। তবে আমি মনে করি মিরাজ আর মোসাদ্দেক খেললে সাব্বিরের জন্য জায়গা পাওয়া কঠিন হবে। কারণ মোসাদ্দেক ব্যাটে-বলে দারুণ প্রতিভাবান ক্রিকেটার। তিনে আমার প্রথম পছন্দ মুমিনুল। তিন স্পিনার ও দুই পেসার নিয়ে খেললে ভালো হবে।
প্রশ্ন: বর্তমান দল নিয়ে কতটা আশা করেন?
রাজিন: ভীষণ আশা করি। এখনকার দলটি দারুণ। আমরা হেরেছিলাম অভিজ্ঞতার কারণে কিন্তু এখন যারা খেলছে ওরা সেই ভুলগুলো করবে না বলেই বিশ্বাস করি। -ডেস্ক