(দিনাজপুর২৪.কম)প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্থানীয় প্রশাসন ও দলীয় নেতাকর্মীদের নির্দেশনা দিয়েছেন সুনামগঞ্জের হাওরের বোরো ফসল কাটায় কৃষককে সবধরনের সহায়তা করতে। সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরও আলাদাভাবে আগাম বন্যার আগেই যাতে হাওরের ধান গোলায় তুলতে পারে এই নির্দেশনা দিয়েছে। তাছাড়া স্থানীয় প্রশাসনও স্বেচ্ছাশ্রমে বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনকে ধানকাটার আহ্বান জানিয়েছে। এই আহ্বানে সম্প্রতি বিপুল সাড়া মিলেছে। মানবিক এই সংকটে কৃষকের পাশে দাড়ানোয় কৃষকরাও স্বেচ্ছাসেবীদের কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন।

উল্লেখ্য সুনামগঞ্জে এবার ২ লাখ ১৯ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এ পর্যন্ত হাওরের ৩৬ ভাগ জমির ধান কাটা শেষ হয়েছে। জেলার ৫ লক্ষ মে.টন চালের খাদ্য চাহিদা মিটিয়ে আরো ৮ লক্ষ মে.টন উদ্বৃত্ত থাকে সুনামগঞ্জে। তাই সুনামগঞ্জ জেলা খাদ্যভাণ্ডার হিসেবে সরকারের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ন থাকায় প্রধানমন্ত্রী করোনাকালে আগাম খাদ্য সংকটের কথা আশঙ্কা করে যে কোন মূল্যেই হাওরের বোরো ফসল কাটার নির্দেশনা দিয়েছেন।

এদিকে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনকেই হাওরে স্বেচ্ছাশ্রমে কৃষকের ধান কেটে দিতে দেখা যাচ্ছে। গত তিনদিন ধরে বিভিন্ন হাওরেই স্বেচ্ছাশ্রমে ধানকাটার দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। কৃষকের ধান কেটে দিতে হাওরে নেমেছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী, সংস্কৃতিকর্মী, সমবায় সমিতি, আনসার ভিডিপি সদস্য সদস্যসহ বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের লোকজন। জেলা প্রশাসন বন্যার আশঙ্কায় আগামী ১৫ দিনের মধ্যে হাওরের সম্পূর্ণ ফসল কেটে তোলার উদ্যোগ নিয়ে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

গত তিনদিন ধরে সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগ, কৃষক লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, ছাত্র লীগকে জেলার বিভিন্ন হাওরে ধান কাটতে দেখা গেছে। সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য শামীমা শাহরিয়ার প্রায় দেড় শতাধিক কৃষক লীগ কর্মী নিয়ে গত তিনদিন কৃষকের ধান কেটে দিয়েছেন বিভিন্ন হাওরে। জামালগঞ্জে উপজেলা প্রশাসনের আহ্বানে বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের অন্তত দেড় শতাধিক স্বেচ্ছাসেবক কৃষকের ধান কেটে দিয়েছে। তাহিরপুরে উপজেলা চেয়ারম্যান করুনা সিন্ধু চৌধুরী বাবুলের উদ্যোগে স্বেচ্ছায় বিভিন্ন হাওরে ধান কাটছে কিছু স্বেচ্ছাসেবী।

২৩ এপ্রিল বৃহষ্পতিবার সুনামগঞ্জ জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের উদ্যোগে বিভিন্ন হাওরের ধান কেটেছেন নেতাকর্মীরা। জগন্নাথপুর ও দক্ষিণ সুনামগঞ্জেও উপজেলা ছাত্র লীগ হাওরে কৃষকের ধান কেটে দিয়েছে। দিরাই, শাল্লা, তাহিরপুর ও ধর্মপাশা উপজেলায়ও ছাত্রলীগ হাওরে ধান কেটে দিয়েছে। কমিউনিস্ট পার্টি, ছাত্র ইউনিয়ন ও ক্ষেত মজুর সমিতিও বিভিন্ন স্থানে হাওরের কৃষকের ধান কেটে দিয়েছে। বিয়ানীবাজার থেকে কমিউনিস্ট পার্টির ৫০ জনের একটি স্বেচ্ছাসেবী টিম বৃহস্পতিবার সুনামগঞ্জে এসে ধান কাটতে শুরু করেছে।

দিরাইয়ে ভাটিবাংলা সমবায় সমিতি কিষাণী প্রণতি সূত্রধরের ধান কেটে দিয়েছে বৃহষ্পতিবার। এই সংগঠনের কর্মীরা গত এক সপ্তাহ ধরে স্বেচ্ছাশ্রমে ধান কাটছে হাওরে। জগন্নাথপুরে নলুয়ার হাওরে কাদিরপুর এলাকার স্কুল, কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীরাও হাওরের কৃষকের ধান কেটে দিয়েছে। ওই উপজেলার বিভিন্ন প্রাথমিক ও হাইস্কুলের শিক্ষকরাও স্বেচ্ছাশ্রমে বিভিন্ন হাওরে ধান কেটেছেন। এভাবে জেলার প্রতিটি উপজেলাতেই বিভিন্ন হাওরে স্বেচ্ছাশ্রমে বিভিন্ন পেশাজীবীরা কৃষকের ধান কেটে দিতে দেখা গেছে। গত এক সপ্তাহ ধরে শাল্লা উপজেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক জয়ন্ত সেন স্বেচ্ছাশ্রমে কৃষকের ধান কেটে দিচ্ছেন। তিনি প্রতিদিন ৫ ঘন্টা বিনা পারিশ্রমিকে ধান কাটছেন।

জানা গেছে গত ১৯ এপ্রিল জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে ধানকাটা বিষয়ে জরুরি সভা হয়। এতে আগাম বন্যার আশঙ্কায় আগামী ১৫ দিনের মধ্যে হাওরের ধান কেটে তোলার সিদ্ধান্ত হয়। এ লক্ষ্যে স্থানীয় শ্রমিকদের উৎসাহ দিয়ে মাঠে নামানো, তাদের ত্রাণের আওতায় নিয়ে আসাসহ স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী গঠন করে মাঠে দ্রুত নামার সিদ্ধান্ত হয়। এর পরদিন থেকেই বিভিন্ন হাওরে স্বেচ্ছাসেবীরা বিভিন্ন হাওরে ধান কাটতে দেখা গেছে। এতে কৃষকের কিছুটা হলেও উপকার হচ্ছে। স্বেচ্ছাসেবীদের উৎসাহ ও স্থানীয় শ্রমিকদের সমন্বয় করে দ্রুত ধান কেটে তুলতে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ গত ২২ এপ্রিল জেলা প্রশাসনের মনিটরিং টিম গঠন করেছে। ওই টিম স্বেচ্ছাসেবীদের ধান কাটার কাচিসহ সাবান ও শুকনো খাবারও দিচ্ছে।

শাল্লায় স্বেচ্ছা শ্রমে ধানকাটায় নিয়োজিত সাংবাদিক জয়ন্ত সেন বলেন, আমি অকৃতদার মানুষ। কোন পিছুটান নেই। তাই মনে হলো বেকার না থেকে এই দুঃসময়ে কৃষকদের স্বেচ্ছাশ্রমে ধান কেটে দিবো। তাই করছি। ক্ষেতে ধান থাকা পর্যন্ত এটা করব। তিনি বলেন, আমাদের এলাকায়ও সংসদ সদস্য মহোদয়ের আহ্বানে বিভিন্ন সংগঠন স্বেচ্ছায় কৃষকের ধান কেটে দিচ্ছে। এমন উদ্যোগ অতীতে ছিল। এক কৃষক আরেক কৃষকের ধান কাটা ও লাগানোর সময় সহযোগিতা করতেন।

সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ বলেন, আবহাওয়া পূর্বাভাস ও বন্যা সতর্কীকরণ কেন্দ্র চলতি সপ্তাহে আগাম বন্যার আশঙ্কার কথা জানানোর পর আমরা বাইরের শ্রমিক নিয়ে আসার পাশাপাশি স্থানীয় শ্রমিকদেরও ত্রাণের আওতায় নিয়ে এসে হাওরে নামিয়েছি। পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী গঠনেও উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। এতে প্রতিদিনই বিভিন্ন হাওরে স্বেচ্ছাসেবীরা ধান কাটতে নামছেন। আশা করি এই সপ্তাহেই হাওরের পুরো ধান কাটা সম্ভব হবে।-ডেস্ক