(দিনাজপুর২৪.কম) অং সান সুচির জন্য শেষ সুযোগ। তিনি এই সুযোগকে ব্যবহার করে সেনাবাহিনীর চালানো বর্বরতা বন্ধ করতে পারেন। সুচি যদি এখন তা বন্ধে পদক্ষেপ না নেন তাহলে এই ট্র্যাজেডির পরিণতি হবে ভয়াবহ। মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো রাষ্ট্রীয় নৃশংসতার জবাবে এ মন্তব্য করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তনিও গুতেরাঁ। এর আগে কয়েক দফা তিনি রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো নৃশংসতার নিন্দা জানান। আহ্বান জানান সহিংসতা বন্ধে পদক্ষেপ নিতে। কিন্তু কারো কোনো কথায়ই কর্ণপাত করছে না মিয়ানমার সরকার। তার প্রেক্ষিতে অ্যান্তনিও গুতেরাঁর মুখোমুখি হয় বিবিসি। তাদেরকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে মিয়ানমার সরকারকে হুঁশিয়ার করে দিলেন গুতেরাঁ। সতর্ক করে দিলেন অং সান সুচিকে। জানিয়ে দিলেন, সহিংসতা বন্ধে পদক্ষেপ না নিলে পরিণতি হবে ভয়াবহ। তবে সেই ভয়াবহ পরিণতি কি ধরনের হবে সে বিষয়ে বিস্তারিত বলেন নি তিনি। বিবিসিকে তিনি বলেন, রাখাইন রাজ্যে সামরিক বাহিনীর অভিযান থামানোর একটি শেষ সুযোগ রয়েছে দেশটির কার্যত নেত্রী অং সান সুচির হাতে। এই সামরিক অভিযান লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য করেছে। রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো নির্যাতন নিয়ে মিয়ানমারের ভাষ্য হচ্ছে, সামরিক বাহিনী গত মাসে রাখাইনের পুলিশ পোস্ট ও সেনাবাহিনীর ঘাঁটিতে চালানো হামলার জবাবে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে। তারা দাবি করছে, বেসামরিক নাগরিকদের টার্গেট করা হচ্ছে না। বিবিসি’র ‘হার্ডটক’ অনুষ্ঠানের জন্য দেয়া সাক্ষাৎকারে গুতেরাঁ বলেন, ‘মঙ্গলবার দেশবাসীর উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখার সময় এই আক্রমণ বন্ধ করার একটি শেষ সুযোগ রয়েছে অং সান সুচির হাতে। তিনি যদি এখন এই পরিস্থিতি না পাল্টান, তাহলে আমি মনে করি, এই ট্র্যাজেডির পরিণতি হবে একেবারে ভয়াবহ। আর দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমি ভবিষ্যতে এই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটার কোনো সম্ভাবনা দেখি না।’ জাতিসংঘ মহাসচিব পুনরায় বলেন, রোহিঙ্গাদের তাদের বাড়িতে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেয়া উচিত। তিনি আরো বলেন, ‘এটা সপষ্ট যে, দেশটির নিয়ন্ত্রণ এখনো সামরিক বাহিনীর হাতে বেশি। আর রাখাইনে যা করা হচ্ছে, তা করার ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর ক্ষমতা বা নিয়ন্ত্রণ চাপ সৃষ্টি করছে।’ অং সান সুচি মিয়ানমারে গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করে দীর্ঘ সময় গৃহবন্দি ছিলেন। কিন্তু রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো সামপ্রতিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে নিন্দা না জানিয়ে তিনি ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছেন। জাতিসংঘের আসন্ন সাধারণ অধিবেশনে যোগ না দেয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছেন। বিশ্লেষকরা মনে করেন, জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বাংলাদেশ, তুরস্ক সহ বেশ কয়েকটি দেশ রোহিঙ্গা ইস্যুটি উত্থাপনের দৃঢ় প্রত্যয় ঘোষণা করেছে। ফলে সেখানে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে পারেন অং সান সুচি। এ জন্যই নিজের দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে তিনি জাতিসংঘের অধিবেশনে যোগ দিচ্ছেন না। এছাড়া, অনেক ভুল তথ্য দিয়ে রোহিঙ্গা সংকটটি ভুল দিকে চালনা করা হচ্ছে বলেও দাবি করেছেন তিনি। তিনি বলেন, ভুয়া খবরের মাধ্যমে সন্ত্রাসীদের পক্ষে প্রচারণা চালিয়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। তিনি রোহিঙ্গাদের সন্ত্রাসী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মি (আরসা) পুলিশ ও সেনাবাহিনীর ওপর হামলা চালিয়েছে ২৫শে আগস্ট। তারপর থেকেই তাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের পুলিশ, সেনাবাহিনী অকথ্য নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে। তাদেরকে কখনো ‘সন্ত্রাসী’ কখনো ‘বাঙালি’ হিসেবে আখ্যায়িত করছে সরকার ও নেত্রী অং সান সুচি। ওই অভিযান যদি আরসার বিরুদ্ধে পরিচালিত হয় তাহলে কেন লাখ লাখ রোহিঙ্গা সাধারণ মানুষকে ভিটেবাড়ি ছেড়ে, দেশ ছেড়ে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে হচ্ছে! শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী, মানবাধিকারের আইকন হিসেবে পরিচিত, গণতন্ত্রের লড়াকু অং সান সুচিকে তা নাড়া দেয় নি। তিনি সাধারণ এসব রোহিঙ্গাকে দেশছাড়া করার কারণে, তাদের ওপর গণহত্যা, গণধর্ষণ, নৃশংসভাবে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা, পানিতে শিশুদের ছুড়ে ফেলে হত্যার কারণে বিন্দুমাত্র দুঃখ, অনুশোচনা, মর্মবেদনা প্রকাশ করেন নি। তার মানবতায় খোঁচা লাগে নি। এ নিয়ে সারা বিশ্ব যখন সোচ্চার তখন তার সেনাপ্রধান জেনারেল মিন অং হয়াইং ঔদ্ধত্যের সঙ্গে বলে দিয়েছেন, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। এর মধ্য দিয়ে তিনি পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিলেন রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের কেউ নয়। প্রশ্ন আসতে পারে তাহলে রোহিঙ্গাদের পরিচয় কি! তাদের রাষ্ট্র কোন্‌টি। তাদের জন্ম মিয়ানমারে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম তারা বসবাস করছেন মিয়ানমারের রাখাইনে। এত বছর তাদের বিরুদ্ধে সরকার এমন কড়া অবস্থান নেয় নি। ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনের মাধ্যমে তাদেরকে অনাকাঙ্ক্ষিত করে ফেলা হয়। ওদিকে, রোহিঙ্গাদের চলাফেরা সীমাবদ্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ। পুলিশ জানিয়েছে, রোহিঙ্গাদেরকে তাদের জন্য বরাদ্দ করা বাড়ির বাইরে যেতে দেয়া হবে না। এমনকি পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে বাস করতেও না। তাদের জন্য কক্সবাজারের পাশে বিশাল পরিমাণের জমি বরাদ্দ করা হয়েছে। সেখানে তাদের থাকার ব্যবস্থা করে দেয়া হবে। গাড়িচালক ও মালিকদেরও কোনো শরণার্থীকে না তুলতে আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি কোনো শরণার্থীকে বাড়ি ভাড়া দিতেও নিষেধ করা হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ভবিষ্যতে সম্ভব হলে মিয়ানমারে ফেরত বা তৃতীয় কোনো দেশে পাঠানোর আশায় তাদেরকে আলাদা করে রাখার প্রচেষ্টায় এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সরকার চাইছে যাতে করে রোহিঙ্গারা সাধারণ জনগণের সঙ্গে মিশে না যায়। রোহিঙ্গারা বহুদিন ধরে মিয়ানমারে নিপীড়িত হয়ে আসছে। সেখানকার অধিকাংশ মানুষই তাদেরকে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া অবৈধ অভিবাসী হিসেবে দেখে। -ডেস্ক