জাকির হোসেন,(দিনাজপুর২৪.কম) সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের জমা রাখা অর্থের পরিমাণ বেড়েছে। এক বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশিদের নামে গচ্ছিত অর্থ বেড়েছে ৩৬ শতাংশ। ভারতের মতো বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের একটি অংশ সুইস ব্যাংকগুলোতে জমা হয়। তবে অনেক কড়াকড়ি আরোপের কারণে ভারতীয়দের জমা রাখা অর্থের পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় কমেছে। অবশ্য সারাবিশ্ব থেকে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে অর্থ জমা রাখার পরিমাণ বেড়েছে।সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক (এসএনবি) প্রকাশিত ‘ব্যাংকস ইন সুইজারল্যান্ড ২০১৪’ শীর্ষক বার্ষিক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনটি গতকাল জুরিখ থেকে প্রকাশ করা হয়। এতে দেখা যায়, ২০১৪ সাল শেষে সুইস ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ৫০ কোটি ৬০ লাখ সুইস ফ্রাঁ গচ্ছিত রয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ (৮৫ টাকায় এক ফ্রাঁ) ৪ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। এটি আগামী অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার যে পরিমাণ বৈদেশিক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করেছে তার ছয় ভাগের এক ভাগ। ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজেটে নিট বিদেশি ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ২৪ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা।

সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে ২০১৩ সালে বাংলাদেশিদের গচ্ছিত অর্থের পরিমাণ ছিল ৩৭ কোটি ২০ লাখ সুইস ফ্রাঁ, যা এখনকার বিনিময় হার অনুযায়ী তিন হাজার ১৬০ কোটি টাকার সমপরিমাণ। এর আগে ২০১২ সাল শেষে সুইস ব্যাংকগুলোয় বাংলাদেশিদের অন্তত ২২ কোটি ৮৯ লাখ সুইস ফ্রাঁ জমা ছিল, যা এক হাজার ৯৪৫ কোটি টাকার সমান। এসএনবির তথ্য ভাণ্ডারে এ বিষয়ে গত ১৩ বছরের তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে ২০১৪ সালেই সবচেয়ে বেশি অর্থ জমা রয়েছে বাংলাদেশিদের।

সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বিভিন্ন দেশের বিপরীতে ‘দায়’ অথবা ‘গ্রাহকের কাছে দেনা’ হিসাবের খাতে থাকা অর্থকে এসএনবি সংশিল্গষ্ট দেশগুলো থেকে রাখা গচ্ছিত অর্থ হিসেবে বিবেচনা করে। দেখা গেছে, ২০১৪ সালে সুইস ব্যাংকগুলোতে বিদেশি গ্রাহকের গচ্ছিত অর্থের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ফ্রাঁ। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ১২৬ লাখ কোটি টাকা, যা বাংলাদেশের আগামী অর্থবছরের বাজেটের প্রায় ৪৫ গুণ। সুদের হার কমলেও অর্থ জমা রাখার ক্ষেত্রে তার কোনো প্রভাব পড়েনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক ম. মাহফুজুর রহমান দিনাজপুর২৪.কমকে বলেন. গত বছর সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের অর্থ থাকার খবর প্রকাশিত হওয়ার পর সে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে এ বিষয়ে তথ্য চেয়ে চিঠি দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে এখনও পর্যন্ত সে অনুরোধে সাড়া পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে আলোচনা চলছে। বাংলাদেশ ব্যাংক তথ্য পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী।সুইস ব্যাংকগুলোতে থাকা সব অর্থই পাচার হওয়া কি-না জানতে চাইলে মাহফুজুর রহমান বলেন, তাদের ধারণা এসব অর্থের বড় অংশই প্রবাসী বাংলাদেশিদের। বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ কম থাকতে পারে। তবে গ্রাহকভিত্তিক প্রকৃত তথ্য না পেলে এ বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয়।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, কর ফাঁকি, দুর্নীতি কিংবা মানি লন্ডারিংয়ের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে সে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবের তথ্য পাওয়া যায়। এ প্রক্রিয়ায় ভারতকে কিছু গ্রাহকের তথ্য সুইস কর্তৃপক্ষ দিতে রাজে হয়েছে। এর বাইরে তথ্য চাইলে সাধারণত পাওয়া যায় না। বাংলাদেশ ব্যাংক কয়েকটি দেশের সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদানের জন্য সমঝোতা স্মারক সই করেছে। তবে সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে এ ধরনের চুক্তি নেই। সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সইয়ের চেষ্টা করছে।

বাংলাদেশি বা অন্য কোনো দেশের নাগরিক বা প্রতিষ্ঠান যদি নিজের বদলে অন্যের নামে কোনো অর্থ গচ্ছিত রেখে থাকে, তাহলে তা এই হিসাবের মধ্যে আসেনি। আর তাই এই হিসাব সুইস ব্যাংকে গচ্ছিত পাচার হয়ে যাওয়া অর্থের পূর্ণ পরিমাণও নির্দেশ করে না। একইভাবে সুইস ব্যাংকে গচ্ছিত রাখা মূল্যবান শিল্পকর্ম, স্বর্ণ বা দুর্লভ সামগ্রীর আর্থিক মূল্যমান হিসাব করে এখানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। অনেক দেশের নাগরিকই মূল্যবান শিল্পকর্ম বা দুর্লভ সামগ্রী সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকের ভল্টে রেখে থাকেন। গ্রাহকের তথ্য গোপন রাখা কিংবা সেভ হ্যাভেন হিসেবে সু্ইস ব্যাংকগুলোর পরিচিতি রয়েছে।

মতামত জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন দিনাজপুর২৪.কমকে বলেন, সুইস ব্যাংকগুলোতে রাখা অর্থ বেড়ে যাওয়ার মানে হলো, বাংলাদেশ থেকে টাকা পাচার বাড়ছে। এর কারণ, এখানে প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল। ব্যাংক এবং কাস্টমস যদি কঠোরভাবে তদারকি করে তাহলে দেশের বাইরে অর্থ পাচারের প্রবণতা কমে আসবে।তিনি বলেন, সাধারণত নির্বাচনের বছরে বাইরে টাকা পাচারের পরিমাণ বেড়ে যায়। সবাই এটা জানেন। যারা পাচার করেন তারা জানেন. তাদের কিছুই হবে না। ‘প্রায়ই স্বর্ণ কিংবা টাকা পাচারের চালান ধরা পড়ে। কারও কোনো সময় শাস্তি হয়েছে বলে শোনা যায় না। অতএব আগে প্রতিরোধ করতে হবে। ঘটনা ঘটে গেলে তার পর পদক্ষেপ নিয়ে তেমন লাভ হয় না।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, সুইস ব্যাংকে মানুষ সাধারণত অর্থ রাখে নিরাপত্তার জন্য। কেননা সেখানে সুদের হার খুবই কম।দিনাজপুর২৪.কমকে তিনি বলেন, যারা অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তাদের মধ্যে সুইস ব্যাংকে অর্থ নিরাপদে রাখার প্রবণতা দেখা যায়। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাও অনেক সময় দেশ থেকে বাইরে অর্থ পাচার বাড়িয়ে দেয়।এসএনবির রিপোর্টের তথ্যমতে, সু্ইস ব্যাংকগুলোতে ২০১৪ সালে ভারতীয়দের জমা থাকা অর্থের পরিমাণ ১৮৬ কোটি ৪০ লাখ ফ্রাঁ বা প্রায় ১২ হাজার ৬২৫ কোটি রুপি। আগের বছর এর পরিমাণ ছিল ২০২ কোটি ৭০ লাখ ফ্রাঁ বা প্রায় ১৪ হাজার কোটি রুপি। এক বছরের ব্যবধানে কমেছে ১০ শতাংশের বেশি। ভারতে নতুন সরকার গঠনের পর পাচার করা অর্থ ফেরত আনতে নানা পদক্ষেপ নেয়। সে দেশের সুপ্রিম কোর্ট এ বিষয়ে অনুসন্ধানের নির্দেশ দেয়। ভারত সরকারের সঙ্গে সুইস কর্তৃপক্ষের কিছু বিষয়ে সমঝোতাও হয়েছে।২০১৪ সালে সুইস ব্যাংকে পাকিস্তানিদের জমা থাকা অর্থের পরিমাণ ১৩০ কোটি ফ্রাঁ। শ্রীলংকার অর্থের পরিমাণ খুবই কম, মাত্র ৮ কোটি ২০ লাখ ফ্রাঁ। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্পদ ব্যবস্থাপক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ভারত ও পাকিস্তানের কিছু অর্থ জমা রয়েছে। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ ধরনের কোনো অর্থ নেই।

বিদেশে অর্থ পাচারের ওপর তথ্য প্রকাশ করে থাকে ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান গ্গ্নোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি বা জিএফআই। এ সংস্থার সর্বশেষ রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশ থেকে বিদেশে টাকা পাচার এক বছরের ব্যবধানে তিন গুণ বেড়েছে। ২০১২ সালে দেশ থেকে ১৭৮ কোটি ডলার বা প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে । এর আগের বছর ২০১১ সালে পাচার হয়েছিল ৫৯ কোটি ৩০ লাখ ডলার বা ৪৬২৫ কোটি টাকা। গত এক দশকে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে ১ হাজার ৩১৬ কোটি ডলার। প্রতি ডলার ৭৮ টাকা ধরে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লাখ ২ হাজার ৬৫৬ কোটি টাকা। রফতানির ক্ষেত্রে কম মূল্য দেখানো (আন্ডার ইনভয়েসিং) ও আমদানির ক্ষেত্রে বেশি মূল্য দেখানো (ওভার ইনভয়েসিং) এবং নানাভাবে পুঁজি দেশের বাইরে নেওয়ার মাধ্যমে ওই পরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে ।( ডেস্ক)