(দিনাজপুর২৪.কম) ‘সাধন কুঠির’ থেকে ‘ছায়ানীড়’। দুটি বাড়ির অবস্থান চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড পৌর এলাকায়। একেবারেই কাছাকাছি। প্র্রথমটি নামাবাজারে। অপরটি ৫নং প্রেমতলা ওয়ার্ডের ডিগ্রি কলেজের পেছনে। এ দুটি বাড়িতেই আস্তানা গেড়েছিল জঙ্গিরা। বাড়ির মালিকের সহযোগিতায় বুধবার দুপুরে ‘সাধন কুঠির’ থেকে আটক করা হয় এক জঙ্গি দম্পতিকে। ওই বাড়িতে পুলিশ তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে। তারা জানায়, ‘ছায়ানীড়’-এ রয়েছে তাদের আরেকটি আস্তানা। পুলিশ ওই বাড়িতে অভিযানে যায়। বিকাল তখন ৩টা। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়েই বাড়ির দোতলায় অবস্থান নেয়া জঙ্গিরা ভেতর থেকে গ্রেনেড ছুড়তে থাকে। এ সময় পুরো বাড়িটি ঘিরে ফেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। উভয় পক্ষের মধ্যে চলে গুলিবিনিময়। ঢাকা থেকে ঘটনাস্থলে পাঠানো হয় পুলিশের বিশেষ টিম। রাতভর থেমে থেমে গোলাগুলিও চলে উভয়পক্ষের মধ্যে। এরই মধ্যে ঘটনাস্থল রেকি করে বিশেষ টিম। গতকাল সকাল ৬টার দিকে শুরু হয় পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট ও  সোয়াট’র নেতৃত্বে ‘অপারেশন অ্যাসল্ট সিক্সটিন’। মূল অপারেশনটি চলে ১ ঘণ্টা ধরে। এরপর সকাল সকাল ১০টার দিকে সমাপ্ত ঘোষণা করা হয় দীর্ঘ ১৯ ঘণ্টার শ্বাসরুদ্ধর অভিযান। এ সময় ৫ জন নিহত হন। এদের মধ্যে ২ জঙ্গি আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণে এবং অপর দুই জঙ্গি গুলিতে নিহত হন। নিহত জঙ্গিদের একজন নারী। এছাড়া আস্তানায় এক শিশুর লাশও পাওয়া যায়। পুলিশ বলছে, ওই এলাকায় বিদেশিরা উন্নয়নমূলক কাজ করছে। তাদের ধারণা, ওইসব বিদেশির ওপর জঙ্গি হামলার পরিকল্পনা ছিল নিহত জঙ্গিদের। গতকাল সন্ধ্যায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ওই আস্তানায় মজুতকৃত বিপুল পরিমাণ  গ্রেনেড নিষ্ক্রিয়ের প্রক্রিয়া চলছিল।
পুলিশ, প্রত্যক্ষদর্শী ও বাড়ির মালিক সূত্রে জানা যায়, পৌরসদরের নামার বাজার এলাকায় সুভাষ দাসের মালিকানাধীন ‘সাধন কুঠির’ নামক একটি বাড়িতে গত ১০ দিন আগে এক দম্পতি জসিম উদ্দিন (৩০) ও আনজিনা বেগম (২০) নামে তাদের এক শিশুসন্তান নিয়ে বাসা ভাড়া নেয়। বাড়ির মালিক তাদের গতিবিধি সন্দেহ হলে বুধবার দুপুর ১টার সময় স্থানীয়দের সহায়তায় তাদের বেঁধে রেখে পুলিশকে খবর করে। সাধন কুটির নামের দোতলা ওই বাড়ির নিচ তলা থেকে অস্ত্র ও বিস্ফোরকসহ তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ বলছে, তারা দুজনই নব্য জেএমবির সদস্য। এ সময় ওই বাড়িতেই পুলিশ তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে। তারা জানায়, কয়েক মিটার দূরেই চৌধুরীপাড়ার প্রেমতলা এলাকায় ছায়ানীড় নামক একটি দ্বিতল ভবনে জঙ্গিদের আরো একটি ইউনিট রয়েছে। তাদের স্বীকারোক্তি মোতাবেক পুলিশ বিকাল ৩টার দিকে পুরো বাড়িটি ঘেরাও করে অভিযানের প্রস্তুতি নেয়। এ সময় জঙ্গিদের হামলার মুখে পড়েন পুলিশ সদস্যরা। জঙ্গিরা তাদের লক্ষ্য করে বেশ গ্রেনেড ছুড়ে। ছায়ানীড়ের দোতলা থেকে ছোড়া একটি গ্রেনেড বিস্ফোরিত হয়ে পায়ে আঘাত পান সীতাকুণ্ড থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোজাম্মেল হক। খবর পেয়ে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি শফিকুল ইসলাম ঘটনাস্থলে আসেন। পরে সীতাকুণ্ডের ওসি ইফতেখার হাসানের নেতৃত্বে আরেকটি দল এসে বাড়িটি ঘিরে ফেলে। পুলিশের ঘেরাওয়ের মধ্যে থেকেই ওই বাড়ি থেকে জঙ্গিরা দফায় দফায় গ্রেনেড ছুড়তে থাকে। মাঝে মাঝে  গোলাগুলিও চলতে থাকে। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ওই বাড়ি ঘিরে অবস্থান নেন। রাত ৯টার দিকে সেখানে হাজির হয় সাঁজোয়া যান। সন্ধ্যার দিকে মাইকে জঙ্গিদের আত্মসমর্পণ করতে বলা হয়। কিন্তু জঙ্গিরা আত্মসমপর্ণ না করে পুলিশকে লক্ষ্য করে গ্রেনেড ও বোমা নিক্ষেপ করে। এ সময় পুলিশের হেড কোয়ার্টারে যোগাযোগ করে সহযোগিতা চাওয়া হয়। অভিযানের প্রস্তুতি চলার মধ্যেই ঢাকা থেকে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট, সোয়াট ও বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল এবং পুলিশ সদর দপ্তরের ‘এলআইসি’ দলের সদস্যরা রাত ১টার দিকে সীতাকুণ্ডে পৌঁছান। পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের অতিরিক্ত উপকমিশনার ছানোয়ার হোসেনও ওই দলের সঙ্গে সীতাকুণ্ডে যান। সীতাকুণ্ডের প্রেমতলা ওয়ার্ডের চৌধুরীপাড়ার ‘ছায়ানীড়’ নামের ওই দোতলা বাড়ির কাছে পৌঁছে এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে জঙ্গিবিরোধী এই অভিযানে পুলিশের সফলতার জন্য ‘দোয়া’ চান তিনি। তিনি জানান, ঢাকা থেকে যাওয়া তাদের দলে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ছাড়াও সোয়াট, বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দলের সদস্য এবং পুলিশ সদর দপ্তরের ‘এলআইসি’ দলের সদস্যরা রয়েছেন। এছাড়া চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ, চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের সোয়াট টিম ও বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দলের সদস্যরা ঘটনাস্থলে রয়েছেন। ঢাকা থেকে পুলিশের এই দল যাওয়ার পরই ভবনটিতে চূড়ান্ত অভিযানে যাওয়ার বিষয়ে আলোচনা শুরু হয় বলে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত সুপার (উত্তর) মসিউদ্দোল্লাহ রেজা জানান। বাড়িটিতে অভিযান শুরুর আগে সেখান থেকে আটকেপড়াদের নিরাপদে বের করে আনার ওপর গুরুত্ব দেয়ার কথা বলেছিলেন পুলিশ কর্মকর্তারা। এরই মধ্যে ওই ভবনে আটকা পড়া পরিবারগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে পুলিশ। তারা বাইরে আসতে চাইলেও পুলিশের পক্ষ থেকে নিরাপত্তার স্বার্থে দরজা বন্ধ করে ভেতরে অবস্থান করতে বলা হয়।
অপারেশন অ্যাসল্ট সিক্সটিন: বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে শুরু হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ‘অপারেশন অ্যাসল্ট সিক্সটিন’। পুলিশ বাইরে থেকে গুলি চালালে জঙ্গিরা একের পর এক শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটায়। এ সময় সাত থেকে আট মিনিট ধরে টানা গুলির পাশাপাশি সাত-আটটি বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পান দূরে সংবাদ সংগ্রহের দায়িত্বে নিয়োজিত সংবাদকর্মীরা। এক পর্যায়ে প্রচণ্ড বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে পুরো এলাকা। কিছুক্ষণ পর পুলিশের ঘেরাওয়ের ভেতর থেকে একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে দুই সোয়াট সদস্যকে নিয়ে যেতে দেখা যায়। অভিযান শেষে ব্রিফিংয়ে এসে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি সফিকুল ইসলাম বলেন, চূড়ান্ত অভিযান শুরুর পর পাশের একটি ভবনের দোতলা থেকে সোয়াট সদস্যারা ছায়ানীড়ের ছাদে যান। এ সময় ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি দিতে দিতে বিস্ফোরকের ভেস্ট পড়া দুজন ছাদে চলে আসে। তারা বিস্ফোরণ ঘটাতে যাচ্ছে দেখে সোয়াট সদস্যরা গুলি করে। এতে এক জঙ্গি মাটিতে পড়ে  গেলেও অন্যজন বিস্ফোরণ ঘটাতে সক্ষম হয়। সফিকুল জানান, নিহত চার জঙ্গির মধ্যে দুজন পুরুষ ও একজন নারী। তাদের দুজনের শরীরে সুইসাইড ভেস্ট ছিল। বাকি দুজনের মৃত্যু হয়েছে পুলিশের গুলিতে।
ডিআইজি সফিকুল বলেন, জঙ্গিরা দোতলায় দুটি ঘরে ছিল। সেখানে প্রচুর বিস্ফোরক রয়েছে। ছাদেও প্রচুর বোমার মজুদ দেখা গেছে। আমাদের অপারেশন শেষ হয়েছে। তবে ভবনটি নিরাপদ করার জন্য বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দল কাজ করছে। তিনি আরো বলেন, দুই তলা ছায়ানীড়ের চারটি ইউনিটের একটিতে আস্তানা গেড়েছিল জঙ্গিরা। বাকি তিন ফ্ল্যাটের বাসিন্দাদের সারারাত আতঙ্কের মধ্যে ভেতরে আটকে থাকতে হয়। সকালে নারী-শিশুসহ ২০ জনকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায় পুলিশ। সফিকুল ইসলাম বলেন, সাধারণ নাগরিকদের বের করে আনার জন্য গতরাতে আমরা কয়েকবার চেষ্টা করেছি, কিন্তু পারিনি। আজ সকালে তারা আত্মঘাতী বিস্ফোরণ ঘটানোর পর আবার চেষ্টা শুরু করি। পরে জানালার গ্রিল কেটে বিভিন্ন ঘরের বাসিন্দাদের উদ্ধার করে নিয়ে আসি। তিনি আরো বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের আশপাশে বড় বড় উন্নয়ন কাজ চলছে। সেখানে অনেক বিদেশি নাগরিক কাজ করছেন। হয়তো তাদের টার্গেট করেই এখানে গ্রেনেড ও বিস্ফোরক মজুদ করা হয়েছিল।
কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের ছানোয়ার হোসেন বলেন, আত্মঘাতী বিস্ফোরণে যারা নিহত হয়েছেন তাদের শরীর ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে,  চেনার উপায় নেই। সন্ধ্যায় পুলিশের আরেকটি সূত্র জানায়, আস্তানায় এক শিশুর লাশ দেখা গেছে। সফিকুল বলেন, বুধবার আরেক আস্তানা থেকে গ্রেপ্তার জঙ্গি দম্পতিকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও তারা মুখ খোলেনি। ঢাকার পুলিশের আলাদা দলের মাধ্যমে তাদের আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
সীতাকুণ্ড মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ ইফতেখার হাসান বলেন, জঙ্গিদের দুটি কক্ষে বেশ কিছু গ্রেনেড অবিস্ফোরিত অবস্থায় রয়েছে। ঢাকা থেকে সিআইডি ও বোমা নিষ্ক্রিয়কারী একটি দল বেলা ১১টায় ঘটনাস্থলে এসে সেগুলো ধ্বংসে কাজ করছে। বেলা ১২টার সময় সাংবাদিকরা ভবনটির কাছাকাছি যেতে সক্ষম হন। সরেজমিন সেখানে গিয়ে দেখা যায়, আত্মঘাতী বোমার বিস্ফোরণে সিঁড়ি রুমের ছাদটি উড়ে যায়। নিহত দুজনের ক্ষতবিক্ষত দেহ বাড়ির চতুর্দিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। –ডেস্ক