(দিনাজপুর ২৪.কম) বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হিসাবে দেশে নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ২২ লাখ ৬৯ হাজার ৮৫৮। আর লাইসেন্সপ্রাপ্ত চালকের সংখ্যা ১৫ লাখ ২৪ হাজার। সরকারি হিসাবেই নিবন্ধিত যানবাহন ও চালকের মধ্যে পার্থক্য ৭ লাখ ৪৫ হাজার। এ বিপুল সংখ্যক গাড়ি চালায় কারা? এ প্রশ্নের একমাত্র উত্তর- লাইসেন্সবিহীন চালকরাই এসব গাড়ির চালক।

বিআরটিএর হিসাবে মোটরসাইকেল বাদে যাত্রী ও পণ্যবাহী যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ ৩৪ হাজার। এসব যানবাহনের জন্য লাইসেন্সপ্রাপ্ত পেশাদার চালক আছেন ৮ লাখ ২৫ হাজার। সরকারি হিসাবেই যাত্রীবাহী যানবাহনে পেশাদার চালক ঘাটতি আছে ২ লাখ ১০ হাজার।

আর বিভিন্ন পরিবহন শ্রমিক সমিতি ও মালিক সমিতির হিসাবে, সরকারি অনুমোদন ছাড়াই অবৈধভাবে আরও প্রায় ১৫ লাখ যাত্রীবাহী গাড়ি চলছে সড়কে। এসবের নিবন্ধন ও ফিটনেস নেই। বৈধ ও অবৈধ সব মিলিয়ে দেশে যাত্রী ও পণ্যবাহী যানবাহন চলছে প্রায় ২৫ লাখ ৩৪। এ হিসাবেই দেখা যাচ্ছে, লাইসেন্সধারী চালক ঘাটতি প্রায় ১৭ লাখ।

সরকার সমর্থক বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের হিসাবে সারাদেশে পরিবহন শ্রমিকের সংখ্যা ৭০ লাখ। তাদের মধ্যে চালক ৩০ লাখ। সরকারি হিসাবে তাদের মধ্যে পেশাদার চালক মাত্র সোয়া ৮ লাখ। বাকি ৭ লাখ চালক অপেশাদার। তারা মূলত নিজস্ব মোটরসাইকেল চালক। এই হিসাবে ২২ লাখ চালক লাইসেন্স ছাড়াই গাড়ি চালাচ্ছেন।

শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী দিনাজপুর ২৪.কম)কে বলেন, ‘আমাদের হিসাবে সারাদেশে ৩০ লাখ পেশাদার চালক আছেন। সরকারি হিসাবে পেশাদার-অপেশাদার সব মিলিয়ে লাইসেন্স আছে ১৫ লাখ ২৪ হাজার। বাকিরা হয় লাইসেন্স ছাড়া নয়তো ভুয়া লাইসেন্সে গাড়ি চালাচ্ছে।’ কাগজপত্রের হিসাবের চেয়ে সরেজমিন দেখা যায় লাইসেন্সপ্রাপ্ত সোয়া ৮ লাখ চালকের বড় অংশ আর পেশায় নেই।

তবে বিআরটিএ বলছে, একইভাবে কাগজপত্রে যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ২৩ লাখ হলেও বাস্তবে এত নেই। সংস্থাটির পরিচালক (প্রশাসন) মসিউর রহমান দিনাজপুর ২৪.কমকে বলেন, ‘৪০ বছর আগে যে গাড়ির নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে তা এখন সড়কে নেই, কিন্তু হিসাবে রয়ে গেছে। বিআরটিএ প্রতিষ্ঠার পর থেকে নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ২৩ লাখ। এর বড় একটি অংশ সচল নেই।’

বৈধ চালকবিহীন গাড়ির সংখ্যা সাড়ে সাত লাখকে অতিরঞ্জিত বলে মন্তব্য করেন মসিউর রহমান। তবে বিপুল সংখ্যক অবৈধ যানবাহন ও চালক রয়েছে- এ কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, যেভাবে ১৮/১৯ লাখ লাইসেন্সবিহীন চালকের সংখ্যা প্রচার করা হচ্ছে, সংখ্যাটি এত বেশি হবে না। আমাদের ধারণা, ৮/১০ লাখ লাইসেন্স ছাড়া চালক আছে।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, বিআরটিএ যেমন দাবি করে- সব গাড়ি সচল নেই, তেমননি লাইসেন্সপ্রাপ্ত সব চালক পেশায় নেই। তিনি জানান, লাইসেন্সপ্রাপ্তদের একটি অংশ দেশের বাইরে চলে যান। সেখানেই চালকের কাজ করেন।

যাত্রী কল্যাণ সমিতি ছাড়াও পরিবহন মালিক শ্রমিক সংগঠনগুলোও স্বীকার করে, বিপুল সংখ্যক লাইন্সেবিহীন যানবাহন চলছে সড়কে। যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সারাদেশে অন্তত ১৩ লাখ নছিমন-করিমন-ভটভটি, ইজিবাইক সচল রয়েছে। নছিমন-করিমন চলছে অন্তত তিন লাখ ৭০ হাজার। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ব্যাটারি চালিত ইজিবাইক আমদানি করা হয়েছে অন্তত ১০ লাখ। সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের হিসাবে, গাড়ির শ্রেণী পরিবর্তন করে হিউম্যান হলার, লেগুনা তৈরি করা হয়েছে অন্তত দুই লাখ। এসব যানবাহনের যেমন লাইসেন্স নেই, তেমনি চালকেরও লাইসেন্স নেই।

গাড়ির তুলনায় বৈধ চালকের ঘাটতির বিষয়টি কয়েকটি চালক ইউনিয়নের তথ্য থেকে আরও পরিষ্কারভাবে পাওয়া যায়। নিবন্ধিত বাস, মিনিবাস ও অটোরিকশার সংখ্যা ৭২ হাজার ৮১৫। এসব গাড়িতে কমপক্ষে দুইজন চালকের প্রয়োজন হয়। নামি-দামি কোম্পানির বাসে চালক থাকে চারজন পর্যন্ত। এনা ট্রান্সপোর্টের মালিক ও সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ সমকালকে বলেন, দূরপাল্লার সব বাসেই কমপক্ষে দু’জন চালক থাকে। দুইজন করে হিসাব করলেও এসব গাড়িতে চালকের প্রয়োজন ১ লাখ ৪৫ হাজার। অর্থাৎ যাত্রীবাহী যানে বৈধ পেশাদার চালকের ঘাটতি আরও ৭২ হাজার বৃদ্ধি পায়।

বৈধ চালকের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে বলে জানান ট্রাক কাভার্ড ভ্যান চালক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হাসান মন্টু। তিনি জানান, সারাদেশে সোয়া এক লাখ ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানের সংখ্যা ১ লাখ ২৭ হাজার। আর ইউনিয়নভুক্ত চালকের সংখ্যা ৮৬ হাজার। ইউনিয়নের বাইরে আরও কয়েক হাজার চালক আছেন।

মাহমুদুল হাসান দিনাজপুর ২৪.কমকে বলেন, ‘অন্যান্য কম দামের গাড়িতে লাইসেন্সপ্রাপ্ত ড্রাইভার থাকলেও কোনো মালিকই লাইসেন্স ছাড়া ড্রাইভারকে ট্রাক চালাতে দেন না। বাস, সিএনজি, ইজিবাইক একটি নির্দিষ্ট পথে চলে। আর ট্রাক চলে সারাদেশে। তাই একজন মালিক লাইসেন্স নিশ্চিত না করে কাউকে ট্রাক দেন না। এ কারণে ট্রাক-কাভার্ড ভ্যানের ড্রাইভার সহজে পাওয়া যায় না। বৈধ চালক না থাকার কারণেই এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।’

অবৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স জব্দ করতে সম্প্রতি অভিযান শুরু করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। অভিযানে প্রায় প্রতিদিন ৫/৭ জন লাইসেন্সবিহীন চালক ধরা পড়ছে বলে জানান ডিএমপির ভ্রাম্যমাণ আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট মশিউর রহমান। তিনি দিনাজপুর ২৪.কম)কে বলেন, লাইসন্সেবিহীন চালকের সংখ্যা ধারণার চেয়েও অনেক বেশি।

লাইসেন্সবিহীন চালকে শুধু পণ্য ও যাত্রীবাহী যানবাহনই চলছে না। মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। বিআরটিএর হিসাবে নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের সংখ্যা ১২ লাখ ৩৪ হাজার ৬৫০। আর অপেশাদার চালকের সংখ্যা ৭ লাখ ১ হাজার। এই যানবাহনের ক্ষেত্রেও গাড়ির তুলনায় চালক কম। সরকারি হিসাবেই দেখা যাচ্ছে ৫ লাখ ৩৩ হাজার নিবন্ধিত মোটরসাইকেল চলছে বৈধ চালক ছাড়াই। অনিবন্ধিত মোটরসাইকেল হিসাবে ধরলে সংখ্যাটি ১০ লাখ ছাড়িয়ে যাবে।

এসব বিষয়ে বিআরটিএর চেয়ারম্যান নজরুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অবৈধ চালকের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করা হয়েছে।’ ঘাটতি দূর করতে বৈধ চালক তৈরিতে বিআরটিএর উদ্যোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বিআরটিএ চালকদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। সচেতনমূলক কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।’

তবে সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের অভিযোগ, এ অবস্থার জন্য বিআরটিএ দায়ী। সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী দিনাজপুর ২৪.কম)কে বলেন, ‘আমরা চাই না লাইসেন্স ছাড়া ড্রাইভার গাড়ি চালাক। কিন্তু বিআরটিএ ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার পথ কঠিন করে রেখেছে। প্রক্রিয়াটি সহজ করলেই চালকরা সহজে লাইসেন্স পাবে। ভুয়া লাইসেন্স থাকবে না।’

বিআরটিএর এক কর্মকর্তা দিনাজপুর ২৪.কমকে বলেন, মন্ত্রী-এমপি ও শ্রমিক নেতারা পরীক্ষা ছাড়াই লাইসেন্স দিতে বলেন। কিন্তু এভাবে লাইসেন্স দেওয়া সম্ভব নয়। প্রক্রিয়াটি দ্রুত করার দাবি যৌক্তিক। কিন্তু পরীক্ষা ছাড়া লাইসেন্স দিলে দুর্ঘটনার দায় কে নেবে?(ডেস্ক)