জি কে সাদিক (দিনাজপুর২৪.কম) গত ২৪ আগস্ট মিয়ানমারে সন্ত্রাসীদের কথিত হামলাকে কেন্দ্র করে ২৫ আগস্ট থেকে মিয়ানমারে সন্ত্রাস দমনের নামে নতুন উদ্যমে রোহিঙ্গা নিধন শুরু হয়েছে। বিশ্বব্যাপী নিন্দার ঝড় ও নানা চাপ থাকলেও মিয়ানমার সরকার ও রক্তপিপাসু সেনাবাহিনী নিধনযজ্ঞ অবারিত রেখেছে। বিশ্বশান্তির প্রতিষ্ঠান জাতিসংঘ রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে নিতে পারছে না কোনো কার্যকর পদক্ষেপ। কারণ অর্থ ও শক্তি, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ এবং হত্যাযজ্ঞের ইন্ধনদাতা বন্ধুর কোনো টানাপোড়েনে অভাব পড়েনি এবং পড়ছে না মিয়ানমার সরকারের। সাম্রাজ্য বিস্তারের স্বার্থে বিশ্বমোড়লরা মানবতাকে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে নীরব ও সরব সমর্থন দিচ্ছে মিয়ানমারকে। তাই বিশ্বব্যাপী প্রতিবাদ শুরু হলেও মিয়ানমার একঘরে হয়ে পড়েনি। বরং বাড়তি সুবিধা ও মজবুত বন্ধুত্ব তৈরিতে বেশ সহায়তা পেয়েছে। তাই রোহিঙ্গা ইস্যু আর মানবতা বা জাতিগত নিধনে সীমবদ্ধ নয়। এটা এখন বিশ্ব রাজনীতি এবং সাম্রাজ্য বিস্তারের ক্ষেত্র সৃষ্টি করে দিয়েছে।

চীনের সঙ্গে মিয়ানমারের বন্ধুত্ব বেশ পুরাতন। ১৯৯৭ সালের পর থেকে মিয়ানমার পশ্চিমের (আমেরিকা ও ইউরোপের) বাণিজ্য অবরোধে মুখে পড়ে। সে সময় বাইরের রাষ্ট্র্রের সঙ্গে মিয়ানমারের বাণিজ্য বিনিয়োগ লেনদেন বন্ধ হয়ে যায়। তখন চীন বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে মিয়ানমারের সংযোগ সম্পর্ক রাখতে চেষ্টা চালিয়েছে। ২০০২-০৩ সালের পর থেকে চীন মিয়ানমারে বিনিয়োগ শুরু করে। সম্প্রতি চীনের বিনিয়োগ ঘটছে সুনির্দিষ্ট করে রাখাইন রাজ্যে। চীন চাচ্ছে রাখাইনে অর্থনৈতিক এলাকা গড়ে তুলতে। রাখাইনের পড়শী হলো চীনের ইউনান প্রদেশ, যার রাজধানী হলো কুনমিং। রাখাইনের আধিপত্য ও উন্নয়নের সঙ্গে ইউনানের উন্নয়ন জড়িত। তাই চীন এখানে অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলতে মরিয়া। গত এপ্রিল মাসে মিয়ানমারের নতুন প্রেসিডেন্ট চীন সফর করেন। ওই সফরে চীনের সঙ্গে ১০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ চুক্তি হয়। কিয়াওপিউতে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে ৭.৩ বিলিয়ন এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ার জন্য ২.৩ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি হয়। নির্মিত সমুদ্রবন্দরের ৮৫ ভাগ মালিকানা থাকবে চীনের। এই বন্দর নির্মাণ হলে চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ পরিকল্পনা সংশ্লিষ্ট ৬৫টি দেশ এতে জড়িত হবে। আর এতে একদিকে বেল্ট অ্যান্ড রোড়ের কাজ যেমন সহজ হবে, অন্যদিকে এশিয়ায় চীনের প্রভাব বাড়বে। গত মে মাসে চীনে বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের প্রথম সম্মেলন হওয়ার পর থেকে এশিয়ায় চীনের প্রভাব ঠেকাতে ভারত উঠে পড়ে লেগেছে। কিন্তু চীনের বিশাল বিনিয়োগ বাজার ঠেকানোর মতো আর্থিক সক্ষমতা ভারতের নেই। তাই ভারত কৌশলগত পদ্ধতি অবলম্বন করছে। চীন চাচ্ছে না মিয়ানমারে তার আধিপত্য কমে যাক বা কোনো ক্ষতির সম্মুখীন হোক। তাই নিজের ক্ষতির দিক বিবেচনায় রোহিঙ্গা গণহত্যা নিয়ে চীন নীরব। উল্টো পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ সমর্থন দিচ্ছে তারা। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমারের পক্ষাবলম্বন করে চীন ভেটো দেয়। আটকে যায় মিয়ানমার বিষয়ে জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত। রক্ষা হয় চীনের স্বার্থ আর জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ থেকে বেঁচে যায় মিয়ানমার।

অন্যদিকে একঘরে হয়ে যাওয়া সু চির পাশে দাঁড়াতে গত সপ্তাহে মিয়ানমারে ছুটে যায় নরেন্দ্র মোদি (গত পাঁচ বছরে ভারতের তৃতীয় কোনো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এবং মাত্র তিন বছরের মেয়াদে মিয়ানমারে এটি মোদির দ্বিতীয় সফর)। নয়াদিল্লি রোহিঙ্গা বিষয়ে সরাসরি কোনো আচরণে জড়ায়নি। কিন্তু অসহায় সু চির পাশে মোদি তার শক্ত অবস্থানের কথা ব্যক্ত করেছেন। একই সঙ্গে সন্ত্রাস মোকাবিলায় একান্ত সহযোগিতার কথা জানিয়েছেন। মিয়ানমার একা নয়, তার পাশে ভারত রয়েছে-এমনটাই মোদির সফরের মূলমন্ত্র। মিয়ানমারে রয়েছে ভারতের ভূরাজনৈতিক এবং নিরাপত্তাসংক্রান্ত স্বার্থ। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে স্বাধীনতার দাবিতে বিদ্রোহী গ্রুপগুলো ক্রমশ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। যা কেন্দ্র থেকে নয়াদিল্লি মোকাবিলা করতে পারছে না। অন্যদিকে নাগা বিদ্রোহীদের দমন করা বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে ভারতের জন্য। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা রক্ষা এবং নাগা বিদ্রোহীসহ অন্য বিদ্রোহী গ্রুপগুলো দমনের জন্য মিয়ানমারকে দরকার। ভূ-রাজনীতির প্রশ্নে সরাসরি বলতে হয় চীনের প্রভাব মোকাবিলা। কিয়াওপিউতে সমুদ্রবন্দর নির্মাণের ফলে বঙ্গোপরসাগর ও ভারত মহাসাগরে চীনের প্রভাব বৃদ্ধি পাবে, যেটা ভারত চায় না। তাই একঘরে হয়ে পড়া সু চির পাশে শক্ত অবস্থান নিয়ে এই সঙ্গে ভূরাজনীতিতে চীনকে ঠেকাতে এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা রক্ষার্থে ভারত মানবতাকে স্বার্থের সামনে বলি দিয়েছে। স্বার্থের কাছে মানবতা টিকতে পারছে না। ভারতে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের বিতাড়িত করার জন্য বেশ জোর পাঁয়তারা শুরু হয়েছে। ১৯৬০ সঙ্গে তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তান থেকে ভারতে আশ্রয়প্রাপ্ত চাকমা ও হাজংদের ভারত নাগরিকত্ব দিচ্ছে। আর রোহিঙ্গাদের করছে বিতাড়িত।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র তাদের অবস্থান জানান দিচ্ছে সু চির পক্ষে। যদিও তারা রোহিঙ্গা গণহত্যার বিষয়ে নিন্দা জানিয়েছে। তথাপি কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। এখানে যুক্তরাষ্ট্র নিচ্ছে বিশেষ কৌশল। বার্তা সংস্থা এপির তথ্য মতে, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নির্মূল অভিযান অব্যাহত থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র এ সমস্যা সমাধানে কোনো ভূমিকা রাখবে না। সংস্থাটি আরো জানিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র অং সান সু চিকে খাটো করতে চায় না। যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারের সঙ্গে অস্ত্র বাণিজ্য বন্ধ করবে না এবং মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে প্রশিক্ষাণ প্রদানও বন্ধ করবে না। আবার আমেরিকা চীনের বিপক্ষ হয়ে কোনো কাজ করবে না। কারণ উত্তর কোরিয়া ইস্যুতে আমেরিকা চীনের সাহায্য পেতে চায়। তাই আমেরিকা চায় না রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে চীন বা মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটাতে। দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে আধিপত্য এবং কর্তৃত্ব ধরে রাখতে হলে মিয়ানমারকে হাতে রাখা খুব গুরুত্বপূর্ণ। সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা এশিয়াতে তার আধিপত্য খর্ব হোক-এমন কাজ করবে না। আর ইতোমধ্যে আমেরিকার মনোভাব স্পষ্ট হয়েছে। বিশেষ করে এপির রিপোর্ট তাই বলে। ১৯৯৭ সালে বাণিজ্যিক অবরোধ আরোপ করে আমেরিকা ও পশ্চিমা বিশ্ব চীনের জন্য মিয়ানমারে আধিপত্য বিস্তারে সুযোগ করে দিয়েছিল। ২০০৬ সালের দিকে আমেরিকা ভারতকে কাছে টেনে চীনকে ঠেকানোর জন্য অবরোধ তুলে নেয়।

অন্যদিকে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ সামলাতে মিয়ানমার রাশিয়াকে নিজেদের হাতে রাখতে চেষ্টার ঘাটতি করেনি। রাশিয়ার অস্ত্রবাজারের বড় ক্রেতা মিয়ানমার। তাই রাশিয়াও রোহিঙ্গা ইস্যুতে নাক গলাতে ইচ্ছুক নয়। ফলে রাখাইনে রোহিঙ্গা নিধনে সা¤্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর স্বার্থ জড়িয়ে পড়েছে। কেউ চাইবে না মিয়ানমারের হীনকর্মকে বন্ধ করার চাপ দিয়ে নিজের সাম্রাজ্য বিস্তারের বৃহৎ স্বার্থ ত্যাগ করতে। এ বিষয়টি এখন খুবই স্পষ্ট বিশেষ কিছু কারণে। কারণ, সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসহ সারা বিশ্ব মিয়ানমারকে বিশেষ কোনো চাপ প্রয়োগ করছে না। নিন্দা করেই তাদের কার্য শেষ করছে। গত ২৫ আগস্ট থেকে বাংলাদেশে তিন লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে এসেছে, পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে মিয়ানমারকে কোনো ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলছে না। বরং মানবিকতার দোহাই দিয়ে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের জন্য স্থায়ী বসত গড়ার পাঁয়তারা চলছে। মার্কিন উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ঢাকায় ছুটে এসে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে প্রবেশ ও আশ্রায় দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছেন। কিন্তু মিয়ানমারকে কোনো অনুরোধ বা চাপ দেননি বা তেমন কোনো ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে না। অং সান সু চি রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার ব্যাপারে কোনো ইতিবাচক মনোভাব দেখাননি। বরং তিনি একটু প্যাঁচ রেখে কথা বলেছেন। যারা মিয়ানমারের নাগরিক তাদের ফেরত নেওয়ার কথা ব্যক্ত করেছেন তিনি। অন্যদিকে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হয়েছে ১৯৮২ সালে।

সু চির কথা মতো রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক নয়। সেহেতু তাদের ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে রয়েছে কূটচাল। ভারতের দাবি, ৪০ হাজার বাংলা ভাষাভাষী রোহিঙ্গা রয়েছে, যদি ভারত সরকার তাদের বাঙালি বলে বাংলাদেশকে গ্রহণ করার জন্য চাপ প্রয়োগ করে তাহলে মনে হয় না যে বাংলাদেশ তা প্রতিহত করতে পারবে। বিশ্বশক্তিগুলোকে পাশে পেয়ে মিয়ানমার জাতিসংঘ, ওআইসি, মানবাধিকার সংস্থাসহ কোনো ধরনের আন্তর্জাতিক বা আঞ্চলিক সংস্থার কথা তোয়াক্কা করছে না। শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোও রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে মিয়ানমারকে চাপ দেবে না। আর শক্তি প্রয়োগ বা কূটনৈতিকভাবে বাংলাদেশও মিয়ানমারকে রোহিঙ্গাদের ফিরত নিতে চাপ দিতে পারছে না। ফলে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের পথ খুব সঙ্কীর্ণ।

মিয়ানমারকে অর্থনৈতিক বা সামরিক কোনো দিক থেকেই আর ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। কারণ রোহিঙ্গা নিধনের জন্য বিশ্বব্যাপী প্রতিবাদ ও নিন্দা হলেও বিশ্বের বৃহৎ অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান বিশ্বব্যাংক কোনো কথা বলেনি। বরং মিয়ানমারে তাদের বিশাল বিনিয়োগ করেছে। এই নিধনযজ্ঞ শুরু হওয়ার আগেও ভারতের সঙ্গে মিয়ানমারের সম্পর্ক এত গলায় গলায় ছিল না। ভারত এখন উঠতি অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তির দেশ। চীন, রাশিয়া, আমেরিকা তো মিয়ানমারের পাশে আছেই। অন্যদিকে ইসরায়েলের সঙ্গে মিয়ানমারের সম্পর্ক নতুন নয়। গত শতকের ৫০-এর দশক থেকেই সুসম্পর্ক রয়েছে। তাই রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে আশার আলো ক্ষীণ। -ডেস্ক

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট