(দিনাজপুর২৪.কম) ব্রিটিশ ভারতে ঔপনিবেশিক জুলুমের বিরুদ্ধে সাঁওতাল জাতির অনন্য সংগ্রামের এক পরম্পরাই সাঁওতাল বিদ্রোহ নামে পরিচিত। বস্তুত সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর মাধ্যমে সংগঠিত এক দুনিয়া কাঁপানো গণজাগরণের সাঁওতালি নাম ‘হুল’, বাংলায় একেই আমরা সাঁওতাল বিদ্রোহ বলে থাকি। ‘হুল’ কেবল নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা এবং বল প্রয়োগের বিরুদ্ধে গণবিদ্রোহই ছিল না; এটি ছিলো তখনকার বিরাজমান ক্ষমতা কাঠামোর বিরুদ্ধে নিম্নবর্গের রাজনৈতিক ও মনোজাগতিক মুক্তির আহ্বানও। এর প্রেরণায় দুই বছর পরেই ঘটেছিল সিপাহিদের নেতৃত্বে প্রথম ভারতীয় স্বাধীনতা যুদ্ধ। খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জাতিগত নিপীড়নের বিরুদ্ধে একাত্তরে বাঙালিরা যে সংগ্রাম করেছিল, এক অর্থে সাঁওতাল বিদ্রোহ সেই সংগ্রামেরও পথপ্রদর্শক| ১৮৫৫ সালের ৩০ জুন ভারতের বর্তমান ঝাড়খণ্ড রাজ্যের সাঁওতাল পরগনার সদর শহর বারহাইতের কাছাকাছি ভাগনাডিহি গ্রামের নিপীড়িত সাঁওতাল পরিবারের দুই বোন ফুলো মুর্মু ও ঝানো মুর্মু এবং তাদের চার ভাই সিধু-কানু-চাদ-ভৈরব মুর্মু এই বিদ্রোহের ডাক দেন। সেবার প্রায় ২০-২৫ হাজার সাঁওতাল সংগ্রামীকে হত্যা করা হয়েছিল, ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল বীর সিধু ও কানুকে এবং সেটাও ছিল একাত্তরের গণহত্যার পূর্বদৃষ্ঠান্ত।

কিন্তু গবেষক পাভেল পার্থ যথার্থই মনে করেন, ইতিহাস গ্রন্থনের বিদ্যমান পুরুষতান্ত্রিক কাঠামো সাঁওতাল বিদ্রোহকে কেবল একটি নিপীড়নমূলক ব্যবস্থায় অত্যাচারিত প্রজাদের সশস্ত্র লড়াই হিসেবেই পাঠ করে, যা হুলের বহুপক্ষীয় বিস্তার এবং প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় জনগণের বিরাজমানতার ঐতিহাসিকতাকে আড়াল করে ফেলে।

সাঁওতালরা এদেশে সেই জনগোষ্ঠী, যারা অরণ্য-পাহাড়ময় প্রকৃতির ভেতর নিজেদের শ্রমের মধ্য দিয়ে নতুন বসতি ও আবাদ তৈরি করেছিল। এ পথেই জমি-অরণ্য ও জাতভাইদের সঙ্গে গড়ে উঠেছিল কৌম সম্পর্ক। বর্ণহিন্দু জোতদার-বেনিয়া ও মহাজনদের কাছে এদের ফসল লুঠ করা, এদের ঋণের ফাঁদে ফেলার ন্যায্যতা ছিল। আর তাই এটা নিরেট অর্থনৈতিক শোষণ নয়, জাতিগত নিপীড়ন।

বিভিন্ন সময়ে বাঙালিরা যে শুধু জমির ওপর কর আকারেই সাঁওতালদের ফসলের ভাগ দাবি করতো তাই নয়, বড় শোষণটা চলতো সোজাসুজি লুণ্ঠনে। এর বৈধতাটা আসতো সাঁওতালদের থেকে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের দাবি মারফত।

তবে, আজও আদিবাসীদের প্রশ্নহীন মৃত্যু আর উদ্বাস্তুকরণ প্রক্রিয়া থামেনি। কেবল ‘প্রভাবশালী ব্যক্তি’, রাষ্ট্র ও এজেন্সি নয়; বিদ্যমান সংবাদমাধ্যমও আদিবাসীদের ওপর জুলুম-নির্যাতনের খবর প্রচার ও পরিবেশনার ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক ও বর্ণবাদী মনস্তত্ত্ব জিইয়ে রাখছে কিনা সেই প্রশ্ন আমাদের করতে হবে নিজেদের কাছে।

সাঁওতাল বিদ্রোহের ১৬০ বছরে আমরা স্মরণ করছি এই প্রজন্মের শহীদ দুই শিশু ও তরুণের স্মৃতি। ১৮৫৫ সালে ৬ সাঁওতাল বোন-ভাইদের কাছ থেকে বিদ্রোহের ডাক এসেছিল। সেই বিদ্রোহে যোগ দিয়েছিল বাঙালিসহ নানা জাতির শোষিত মানুষ। ১৬০ বছর পরও দেখা যাচ্ছে নিম্নবর্গের সেই ঐক্য বদলায়নি।

বিদ্রোহের প্রেরণা আর ন্যায্যতায় আমরা চাই, বাংলাদেশের সমস্ত মানুষ অধিকার সচেতন হোক। বিদ্রোহের মুহূর্তে ক্ষমতাকে অস্বীকার করে -সম্মিলত-বিদ্রোহ নিজেই পাল্টা–ক্ষমতা হয়ে উঠুক, এটাই আমাদের চাওয়া। -(ডেস্ক)