(দিনাজপুর২৪.কম) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সরকার যে কোন সহিংস ঘটনা প্রতিরোধে বদ্ধপরিকর। আজ বুধবার সংসদে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে সরকারি দলের সদস্য সামশুল হক চৌধুরীর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি একথা বলেন। তিনি বলেন, বিএনপি ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচন পূর্ববর্তী সময়ে এবং বিগত ৫ জানুয়ারি থেকে তিন মাসেরও অধিককাল ধরে হরতাল, অবরোধ ও আন্দোলনের নামে মানুষ পুড়িয়ে মারাসহ নাশকতা চালিয়ে দেশের হাজার হাজার কোটি টাকা ক্ষতি করেছে। তিনি আরও বলেন, ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ১২৮ জন নিহত হয়েছে, যার মধ্যে ৭৩ জন আগুনে পোড়া। ১ হাজার ৩৯৫টি যানবাহন তারা পুড়িয়েছে। এছাড়া ৬টি লঞ্চ এবং ১৩টি ট্রেন সহিংসতার শিকার হয়েছে। ইস্যুবিহীন আন্দোলন করে তারা শুধু দেশের সম্পদের ক্ষতিই করেনি তাদের এ সকল কর্মকান্ডে দেশের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ অনেকাংশে নিরুৎসাহিত হয়েছে। এ সকল নাশকতামূলক কর্মকান্ড ও অরাজকতার বিরুদ্ধে সারাদেশে বিপুলসংখ্যক মামলা হয়েছে।
শেখ হাসিনা বলেন, এসব মামলাসমূহের দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে সরকার সন্ত্রাস বিরোধী আইন, ২০০৯ ও ২৭ ধারা অনুযায়ী প্রত্যেক জেলার দায়রা জজ ও অতিরিক্ত দায়রা জজকে এসব আইনের অধীন আনীত অপরাধের বিচার করার এখতিয়ার প্রদান করেছে। এসব ঘটনায় দায়েরকৃত মামলাসমূহের তদন্ত কাজ দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে ঊর্ধ্বতন অফিসার কর্তৃক তদন্ত কার্যক্রম মনিটরি করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে যে সব মামলা বিচারিক আদালতে গেছে সেগুলোতে অপরাধীদের সাজা নিশ্চিত করার জন্য পুলিশ ও প্রসিকিউশন সচেষ্ট রয়েছে। এছাড়া অতি গুরুত্বপূর্ণ মামলাসমূহের বিষয়ে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের মনিটরিং উপ-কমিটির সভায় আলোচনা এবং প্রয়োজনীয় দিক-নির্দেশনা প্রদান করা হচ্ছে।
এদিকে সরকারি দলের সদস্য শরীফ আহমেদের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ অবৈধ মানব পাচারের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান গ্রহণ করেছে। তিনি বলেন, অবৈধভাবে মানবপাচারের বিষয়টি আশংকাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি আরও বলেন, মানব পাচার প্রতিরোধে প্রতি জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে কাউন্টার ট্রাফিকিং কমিটি গঠন করা হয়েছে। মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমনের লক্ষ্যে সরকার গত ২০১২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন প্রণয়ন করেছে। মানব পাচারের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদন্ড ও যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
শেখ হাসিনা বলেন, মানব পাচার একটি আন্তর্জাতিক সমস্যা এবং মানব পাচারকারীরা আন্তর্জাতিক চক্রের সাথে জড়িত। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরো উন্নত ও আধুনিক ট্রেনিং প্রদান, সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের সাথে তথ্য আদান-প্রদান এবং সর্বমহলের সহযোগিতার মাধ্যমে মানব পাচার প্রতিরোধে জাতীয় কর্ম পরিকল্পনা ২০১২-২০১৪ প্রণীত ও বাস্তবায়িত হয়েছে। এছাড়া মানব পাচার প্রতিরোধে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা ২০১৫-২০১৭ এর খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে, যা শিগগির প্রকাশিত হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে মানব পাচার প্রতিরোধ সংক্রান্ত কমিটির সভা প্রতি মাসে অনুষ্ঠিত হয়। মানব পাচার বিশেষ করে নারী ও শিশু পাচার সংক্রান্ত বিচারাধীন মামলার অগ্রগতি মনিটর করার বিষয় কমিটিতে পর্যালোচনা হয়। মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করতে সকল আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, সম্প্রতি বাংলাদেশ থেকে সমুদ্র পথে অবৈধভাবে মানব পাচার উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় কোস্ট গার্ডের বর্তমান সময়ের কার্যক্রম আরো বিস্তৃত হয়েছে। সমুদ্র পথে মানব পাচার রোধে কোস্ট গার্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
শেখ হাসিনা বলেন, মানব পাচার প্রতিরোধে বর্তমান কোস্ট গার্ডের টহল বৃদ্ধি করা হয়েছে। এ প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের ১টি পেট্রোল ক্রাফট এবং ১টি অত্যাধুনিক হাই স্পিড মেটাল শার্ক বোট সার্বক্ষণিকভাবে চট্টগ্রাম ও গহিরা অঞ্চলে টহল নিয়োজিত রয়েছে। টহল কার্যক্রম বৃদ্ধির জন্য ১টি করে হাই স্পিড মেটাল শার্ক বোট কুতুবদিয়া এবং সাঙ্গু স্টেশনে মোতায়েন করা হয়েছে। এছাড়া শাহপুরী, টেকনাফ এবং সেন্টমার্টিন্স উপকূলীয় অঞ্চলে ২টি অত্যাধুনিক হাই স্পিড মেটাল শার্ক বোট দ্বারা টহল প্রদান করা হচ্ছে। তাছাড়া কক্সবাজার, ইনানী ও মহেশখালী উপকূলীয় এলাকায় স্থানীয় কাঠের বোট দ্বারা টহল প্রদান করা হচ্ছে।
সংসদ নেতা বলেন, মানব পাচার বিষয়ক তথ্য পাওয়ার সাথে সাথে সম্ভাব্য স্বল্পতম সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড কর্তৃক অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তাছাড়া দ্রুত ও নিশ্চিত অভিযান পরিচালনার জন্য উল্লিখিত অঞ্চলসমূহে জনবল বৃদ্ধি করা হয়েছে। মানব পাচার রোধে নদী ও সমুদ্র পথে এবং দালাল চক্র আটক করতে চট্টগ্রামের সমুদ্র তীরবর্তী এলাকাসমূহে কোস্ট গার্ড নিয়মিত ফুট পেট্রোল পরিচালনা করছে। কোস্ট গার্ড সমুদ্র পথে অবৈধভাবে বিদেশ গমনকালে এ পর্যন্ত সর্বমোট ১ হাজার ৭৩৬ জন বিদেশগামী নাগরিককে সাগর থেকে আটক করেছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানব পাচারের কুফল সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে কোস্ট গার্ড তার অধীনস্থ অধিক্ষেত্রসমূহের এলাকায় নিয়মিত প্রচারণা এবং প্রয়োজনীয় দিক-নির্দেশনামূলক তথ্য সধারণ জনগণের মাঝে প্রচার করছে। সীমান্ত এলাকা দিয়ে অবৈধভাবে মানব পাচার রোধে আইন প্রণয়ন, অবকাঠামো বিনির্মাণ ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সীমান্তে সর্বোচ্চ নজরদারি জারি রয়েছে।
মহাজোট নেতা বলেন, ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৫ সালের মে পর্যন্ত অবৈধভাবে মালয়েশিয়াগামী ২৫৫ জন বাংলাদেশী নাগরিককে আটক করে পরবর্তী আইন ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। পাশাপাশি দালাল চক্রকে গ্রেফতারের নিমিত্তে গোয়েন্দা নজরদারী বৃদ্ধি করা হয়েছে। মানব পাচারসহ অন্যান্য আন্তঃসীমান্ত অপরাধ প্রতিরোধে সীমান্তে ৫৯৯টি বিওপি সক্রিয় রয়েছে। এছাড়া বিওপিসমূহের মধ্যবর্তী স্থানে ১২৪টি বর্ডার সেন্ট্রি পোস্ট তৈরি করা হয়েছে এবং আরো ১২৫টি বিএসপি তৈরির কাজ চলমান রয়েছে।
শেখ হাসিনা বলেন, মানব পাচার রোধে পুলিশ কর্তৃক গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে এবং অপরাধপ্রবণ এলাকায় টহল ডিউটি বৃদ্ধি করা হয়েছে। মানব পাচার অপরাধের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ার লক্ষ্যে কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। মানব পাচারে মামলাগুলো তদন্ত ও অপরাধীদের গ্রেফতার কার্যক্রম মনিটরি করার জন্য পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে একটি বিশেষ সেল কাজ করছে। মানব পাচারকারীদের অর্থের লেনদেন বন্ধ করার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট মোবাইল কোম্পানিগুলোর সাথে সমঝোতার ভিত্তিতে ব্যক্তিগত মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা লেনদেনের উপর নজরদারি করার জন্য মাঠ পর্যায়ে নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।
সংসদ নেতা বলেন, পুলিশের ক্রাইম ডাটা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম-এ মানব পাচার সংক্রান্ত মামলা ও অপরাধীদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য ইনপুট দেয়া হচ্ছে, যার মাধ্যমে সারাদেশের পুলিশ ইউনিটগুলোর মধ্যে দ্রুত মানব পাচার সংক্রান্ত তথ্যাদি আদান প্রদান সহজতর হয়েছে। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে পাচারকৃত বাংলাদেশী নাগরিকদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা এবং মানব পাচার রোধে এতদাঞ্চলের দেশসমূহ যাতে সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারে এ জন্য সর্বাত্মক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। (ডেস্ক)