(দিনাজপুর২৪.কম) হাইকোর্টের বেধে দেয়া সময়ে হাতিরঝিল থেকে এবারো সরছে না তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) ১৬ তলা ভবনটি। বারবার হাইকোর্টকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে তারা। এভাবে যদি হাইকোর্টকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখায় আর হাইকোর্ট এর জবাবে কিছু না করে তাহলে হাইকোর্টের প্রতি সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা কমে আসবে। মানুষ মনে করবে আইন সবার জন্য সমান না। কিছু মানুষের জন্য আইন পক্ষপাতিত্ব করে। এমনটিই মনে করেন মামলার অ্যামিকাস কিউরি। সময়সীমা বাড়াতে আবার আদালতের শরণাপন্ন হবে সংগঠনটি। তবে, মুচলেকা দেয়ার পরও সময় মতো ভবন না সরানো আদালত অবমাননার সামিল হবে বলেও মনে করেন এই মামলার অ্যামিকাস কিউরি। ভবনটিকে হাতিরঝিলের ক্যান্সার আখ্যা দিয়েছেন আদালত। ভেঙে ফেলতেও সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন কয়েকবার। তবে, পোশাকশিল্পের স্বার্থ বিবেচনায় প্রতিবারই বাড়ানো হয়েছে আগের বারের সময়সীমা। সবশেষ মুচলেকা দিয়ে ১ বছরের সময় নেয় বিজিএমইএ কর্তৃপক্ষ, যা শেষ হবে আগামী মাসের ১২ তারিখ। তাদের হাতে মাত্র এক মাসের মতো সময় থাকলেও এখান থেকে নির্দিষ্ট সময়ে চলে যাওয়ার কোনো আলামত আপাতত দেখা যাচ্ছে না। অন্যদিকে আদালতের রায় মাথায় রেখে রাজধানীর উত্তরায় চলছে তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন- বিজিএমইএর নতুন ভবনের নির্মাণকাজ। দুই তলা বেজমেন্টের ওপর ১৩ তলা এই ভবনের ১ম ও ২য় পর্যায়ের কাজ শেষ হয়েছে, চলছে ৩য় পর্যায়ের কাজ। প্রকৌশলী জানান, দুই অংশের কাজ শেষ হয়ে গেছে। তৃতীয় ধাপের কাজও ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ শেষ হয়েছে।পুরনো ভবন ছাড়তে আন্তরিকতার কোনো ঘাটতি নেই। তবে নতুন ভবনে বিজিএমইএর দাপ্তরিক কার্যক্রম শুরু করতে আরও কিছুদিন সময় লাগবে বলে জানালেন বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান। তিনি বলেন, এই বিল্ডিং যে আমরা ছেড়ে দেবো, এখানে কোনো দ্বিধা-দ্বন্দ্ব নেই। হাইকোর্টের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা রয়েছে। আমরা শ্রদ্ধা রেখেই বলছি আগামী ১২ এপ্রিলের মধ্যে এখান থেকে স্থানান্তর সম্ভব হচ্ছে না। নতুন বিল্ডিংয়ের কাজ কতটুকু হয়েছে সে সম্পর্কে তিনি কিছুই জানেন না। কবে নাগাদ সেখানে স্থানান্তরিত হবেন তাও জানেন না ব্যবসায়ী এই নেতা। এই ভবন সরাতে বারবার সময়সীমা বাড়ালে আদালতের প্রতি সাধারণ মানুষের ভিন্ন ধারণা তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন মামলার অ্যামিউকাস কিউরি মোনজিল মোরশেদ। তিনি বলেন, আদালত নিজেই বলেছেন আর কোনো সময় দেওয়া হবে না। যদি তারা না যায়, সেক্ষেত্রে আদালত স্বপ্রণোদিত হয়ে আদালত অবমাননার মামলা করতে পারেন। বারবার নির্দেশনার পরও কেন তারা সরছে না উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, বিজিএমইএ নিজেকে সুপ্রিম কোর্টের চেয়েও শক্তিশালী মনে করে। খালেদা জিয়া, মওদুদ, যমুনাসহ যাদের বিরুদ্ধে রায় হয়েছে তাদের আদালত কোনো সময় দেয়নি স্থানান্তরে। এদের ৩ বার সময় দেয়ার পরও তারা ছেড়ে যাচ্ছে না। তারা নিজেদের হাইকোর্ট, রাষ্ট্র ও সরকারের চেয়েও নিজেকে শক্তিশালী মনে করছে। এদের যদি সরানো না হয় তাহলে সাধারণ মানুষের হূদয়ে সুপ্রিম কোর্টের প্রতি অবিশ্বাস জন্ম নেবে। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ভবনটি নির্মাণে যেমন রাজউকের অনুমোদন ছিল না তেমনি জমি গ্রহণও করা হয়েছে অবৈধভাবে। জানা যায়, ভবনটি সরাতে ২০১১ সালের ৩ এপ্রিল রায় ঘোষণা করা হয়। ঘোষিত ৭২ পৃষ্ঠার রায়ে বলা হয়, বিজিএমইএ ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছে ঢাকা মাস্টার প্ল্যান, জলাধার আইন ও রাজউকের অনুমোদন গ্রহণ না করে এবং একান্তই বিজিএমইএর সদস্যদের নিজস্ব স্বার্থের খাতিরে। যার ফলে ভবনটি ভেঙ্গে দিতে সরকার ও অন্যান্য কর্তৃপক্ষ বাধ্য। এছাড়া বিজিএমইএ যাদের কাছে ওই ভবনের ফ্লোর বিক্রি করেছে এবং সে জন্য করা চুক্তি ছিল বেআইনি। কেননা বিজিএমইএর ওই ভবন নির্মাণ বা ভবনের অংশ কারো কাছে বিক্রি করার কোনো আইনগত অধিকার ছিল না। তবে ক্রেতারা যেহেতু নিজেরাও জানত বা তাদের জানা উচিত ছিল যে, এই জমির ওপর বিজিএমইএর মালিকানা নেই এবং ভবনটি বেআইনিভাবে নির্মাণ করা হয়েছে সুতরাং আদালতের মতে তারা কোনো সুদ পাওয়ার দাবিদার নয়। রায়ে বলা হয়, আর্থিক প্রতিপত্তির কারণে ভবনটি নির্মাণ করে বিজিএমইএ। হাতিরঝিল প্রকল্প বাস্তবায়নে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে তারা। রায়ে বলা হয়, আর্থিক পেশীশক্তির অধিকারী বলে একটি শক্তিশালী মহলকে আইনের ঊর্ধ্বে রাখতে হবে এমন যুক্তি অগ্রহণযোগ্য। দেশের অন্য দশজনের মতো এ আর্থিক পেশীশক্তির অধিকারী লোকেরাও দেশের সাধারণ আইনের আওতাধীন। সংবিধান অনুযায়ী ধনী দরিদ্রের মধ্যে আইনের প্রয়োগের ব্যাপারে কোনো বৈষম্য চলতে পারে না। বস্তুত একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা হিসাবে বিজিএমইএকে আইনের প্রতি আরও অধিক শ্রদ্ধাশীল হওয়া বাঞ্ছনীয় ছিল। অথচ তারা তা না করে আইনকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে ব্যবহার করেছে। রায়ে বলা হয়, বিজিএমইএর ওই ভবনের জমির ওপর কোনো মালিকানা নেই। কেননা জমিটি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল রেলওয়ের জন্য ১৯৬০ সালে। অধিগ্রহণ আইন অনুযায়ী কোনো দাবিদার কর্তৃপক্ষের জন্য শুধু জনস্বার্থে কোনো ভূমি অধিগ্রহণ করা যায়। পরে যদি দাবিদার কর্তৃপক্ষ অধিগ্রহণকৃত জমি বা সে জমির অংশ অপ্রয়োজনীয় মনে করে তাহলে দাবিদার কর্তৃপক্ষ সে জমি সরকার বা জেলা প্রশাসনকে ফেরত দিতে বাধ্য থাকে। সরকার সে অবস্থায় হয় ওই জমি অন্য কোনো জনস্বার্থে ব্যবহার করবে অথবা জমির মূল্য মালিকের কাছে ফেরত দিতে বাধ্য থাকবে। এখানে দেখা যাচ্ছে, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ অর্থাৎ যাদের প্রয়োজনে জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল তারাই মোট ৬.২১ একর জমি অপ্রয়োজনীয় বিবেচনায় ছেড়ে দেয় একই বছরে অর্থাৎ ১৯৬০ সালে। পরে ১৯৯৮ সালে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো ওই জমি একটি স্মারকের মাধ্যমে বিজিএমইএকে এর নিজস্ব ভবন তৈরির জন্য বেআইনিভাবে প্রদান করে। অথচ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো ২০০৬ সালের আগ পর্যন্ত আদৌ ওই জমির মালিক ছিল না। রায়ে বলা হয়, ২০০১ সালে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো একটি লিখিত কিন্তু নিবন্ধনবিহীন দালিলের মাধ্যমে বেআইনিভাবে ওই জমি থেকে একটি অংশ বিজিএমইএকে প্রদান করার প্রয়াস পায়। অথচ তখনো রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো ওই জমির মালিকানা পায়নি। শুধু ২০০৬ সালেই সরকার টুইন টাওয়ার নির্মাণের জন্য একটি সাব কবালার মাধ্যমে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোকে ওই জমি প্রদান করে। ওই প্রদানকে বৈধ বলে ধরা যেতে পারে। কেননা অন্য একটি জনস্বার্থে অর্থাৎ একটি টুইন টাওয়ার নির্মাণের জন্য রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোকে জমিটি প্রদান করা হয়েছিল নিবন্ধনকৃত সাফ কবালার মাধ্যমে। এ থেকে যা দাঁড়ায়, ২০০৬ সালের ডিসেম্বর মাসে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো প্রথমবারের মতো ওই জমির মালিকানা পায়। রায়ের অভিমত, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো কোনোক্রমেই বিজিএমইএকে তার নিজস্ব ভবন তৈরির জন্য প্রদান করতে পারে না। সম্পত্তি হস্তান্তর ও নিবন্ধন আইন অনুযায়ী কোনো জমি লিখিত কবালা ও নিবন্ধন ছাড়া হস্তান্তর করা যায় না। এখানে স্বীকৃতভাবেই এখন পর্যন্ত কবালা বা সাফ কবালা বিজিএমইএর নামে নিবন্ধিত হয়নি। রায়ে বলা হয়, ওই জমি বিজিএমইএ জবরদখল করে আছে এবং অন্য যেকোনো জবরদখলকারীর মতোই বিজিএমইএকে উচ্ছেদ করতে এবং তার ভবন ভেঙ্গে দিতে সরকার বাধ্য। রায়ে আরও বলা হয়, জমিটি অধিগ্রহণকৃত জমি বিধায় সরকারের কাছে দুটি পথ খোলা আছে। হয় এটি আদি মালিকের কাছে ফেরত দিতে হবে অথবা টুইন টাওয়ার বা অন্য কোনোভাবে বিকল্প জনস্বার্থে ব্যবহার করতে হবে। হাইকোর্টের এ রায় স্থগিতের জন্য ২০০১ সালে বিজিএমইএর ততকালীন সভাপতি সফিউল ইসলাম সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় আবেদন করেন। পরদিন আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন হাইকোর্টের রায়ের উপর ছয় সপ্তাহের স্থগিতাদেশ দেন। পরে এ সময়সীমা বাড়ানো হয়। বর্তমানে এ রায়ের ওপর স্থগিতাদেশ রয়েছে। রাজউকের অনুমোদন ছাড়াই বিজিএমইএ ভবন নির্মাণ করা নিয়ে ২০১০ সালে একটি ইংরেজি দৈনিক পত্রিকায় একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনটি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ডিএইচএম মনির উদ্দিন আদালতে উপস্থাপন করেন। বিজিএমইএ ভবন কেন ভাঙার নির্দেশ দেয়া হবে না তার কারণ জানতে চেয়ে হাইকোর্ট স্বপ্রণোদিত হয়ে (সুয়োমোটো) রুল জারি করেন। ওই রুলের চূড়ান্ত শুনানি শেষে হাইকোর্ট ২০১১ সালের ৩ এপ্রিল বিজিএমইএ ভবন নির্মাণকে অবৈধ ঘোষণা করে তা ভেঙ্গে ফেলার নির্দেশ দেয়। পরবর্তীতে অবৈধ এই ভবনকে বৈধ করতে চেষ্টা তদবির করেও কোনো ফায়দা হয়নি। হাতিরঝিল প্রকল্পের ক্যান্সার বিজিএমইএ ভবন ভেঙে ফেলতে উচ্চ আদালত নির্দেশ দিয়েছেন বহু আগে। বেধে দিয়েছে ভাঙার সময়ও। কিন্তু হাইকোর্টের দেয়া রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি প্রকাশের পরপরই আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন করে প্রক্রিয়াটি থামিয়ে দেয়া হয়েছিল। জানা গেছে, বিজিএমইএ ভবন ৯০ দিনের মধ্যে ভেঙে ফেলতে হাইকোর্ট রায় দিলেও আপিল বিভাগ তা স্থগিত রেখেছিল। এদিকে ২০১১ সালে ভবনটি ভেঙে ফেলতে হাইকোর্ট রায় দেয়ার পরপরই বিজিএমইএ কর্তৃপক্ষ আপিল বিভাগে আবেদন করে। এ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে একই বছরের ৫ এপ্রিল আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতির আদালত হাইকোর্টের ওই রায়ের ওপর প্রথমে ৬ সপ্তাহের জন্য স্থগিতাদেশ জারি করেন। এরপর সময়ে সময়ে এই স্থগিতাদেশের মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়। পরে ১৯ মার্চ হাইকোর্ট ওই রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি প্রকাশ করেন। আইন অনুযায়ী রায় পছন্দ না হলে রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি হাতে পাওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল করতে হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে বিজিএমইএর সভাপতি ২১ মে আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন) দায়ের করেছিলেন। সর্বশেষ গত বছর এক বছরের মুচলেকা নামায় স্বাক্ষর করে সময় নেয়। কিন্তু এবারও নির্দিষ্ট সময়ে সরে যাওয়া সম্ভব নয় বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন বিজিএমইএ এর সভাপতি। বিজিএমইএ ভবন নিয়ে বিভিন্ন সময় অসন্তোষ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। এমনকি বিজিএমইএ-র অনুষ্ঠানে গিয়েও তিনি ভবনটি সরিয়ে ফেলার কথা বলেছেন একাধিকবার। বেআইনিভাবে পাওয়া জমিতে ১৯৯৮ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মধ্য দিয়ে নির্মাণ কাজ শুরু হয়। জলাধার সংরক্ষণ আইন অমান্য করে চলতে থাকে নির্মাণকাজ। ২০০৬ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ভবনটি উদ্বোধন করেন। বিজিএমইএ ভবন নির্মাণের পর তা কেবল হাতিরঝিলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহকেই ব্যাহত করেনি, বরং বেগুনবাড়ি খালের অংশবিশেষ ভরাট করে তৈরি ভবনটি নিজেও রয়েছে ঝুঁকিতে। -ডেস্ক