(দিনাজপুর২৪.কম) নিরাপদ সড়কের দাবিতে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের অরাজনৈতিক আন্দোলনে সরকার পতনের গভীর ষড়যন্ত্র হচ্ছে। আন্দোলন কেন্দ্র করে গত ৩ দিনের কর্মকাণ্ডে সরকারবিরোধী চক্রান্ত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে সরকারকে মারমুখী অবস্থানে আনতে আন্দোলনকে সহিংসতায় রূপ দেবার তৎপরতা দেখা গেছে। বিগত সময়ে আন্দোলনে ব্যর্থ হয়ে বিএনপি-জামায়াত কোমলমতি শিক্ষার্থী ওপর ভর করে সরকার পতন ঘটানোর নকশা কষছে বলে মনে করছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন শুরুতে জনগণের সমর্থন পেলেও অতি বাড়াবাড়ির কারণে তা উল্টোরূপ ধারণ করেছে। ইতোমধ্যে আন্দোলনে বিরক্ত হয়ে উঠেছে জনগণ। সরকার ৯ দফা দাবি বাস্তবায়ন শুরু করলেও আন্দোলনে রাজনৈতিক প্রলেপ দেওয়া হয়েছে। আন্দোলন দীর্ঘায়িত এবং সহিংস করে সরকার পতনের অপচেষ্টা করছে বিএনপি-জামায়াত। আন্দোলনে ছাত্রদল ও শিবিরকর্মীদের উপস্থিতি, প্রভাবশালী বিদেশি এক রাষ্ট্রের কূটনীতিকের ওপর হামলা, বিএনপিনেতা আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ফোনালাপ ফাঁস, আওয়ামী লীগ অফিসে হামলা, ফেসবুকে মিথ্যা তথ্যে গুজব রটানোয় এটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সরকারের সহনীয় মনোভাব এবং কড়া নজরদারির কারণে কোনো ষড়যন্ত্র সফল হয়নি। তবে এখনো আন্দোলন ইস্যুতে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার অপচেষ্টা চলছে বলে মনে করে আওয়ামী লীগ। তথ্য মতে, গত বৃহস্পতিবার থেকে আন্দোলনে অনুপ্রবেশকারী নিয়ে বেশ আলোচনা চলছে। সরকারি দল আওয়ামী লীগ, সুশীলসমাজসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ অনুপ্রবেশকারীরা আন্দোলন ভিন্ন খাতের নেওয়ার চেষ্টা করছে বলে শঙ্কা প্রকাশ করছিলো। গত শনিবার থেকে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে অনুপ্রবেশকারীদের প্রকাশ্য রূপ দেখা যায়। বৃহস্পতিবার ও শনিবার আন্দোলনে বিভিন্ন স্থানে ছাত্রদের সঙ্গে ছাত্রদল ও শিবিরকর্মীদের উপস্থিতির কথা জানায় প্রশাসন। অনেক স্থানে আন্দোলনরতদের খাবার সরবরাহ করতে দেখা যায় বিএনপি নেত্রীদের। গতকাল রোববার কয়েকজন ছাত্রের ব্যাগ তল্লাশি চালিয়ে কয়েকশ আইডি কার্ড উদ্ধার করে পুলিশ। যাতে আন্দোলনে অনুপ্রবেশকারীর অবস্থান পরিষ্কার হয়ে পড়ে। আন্দোলনের শুরু থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে শিক্ষার্থীদের উসকে দেওয়ার অপচেষ্টা করা হয়। ফেসবুকে গুজব ছড়িয়ে শনিবার বিকালে ধানমন্ডিস্থ আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে স্কুল-ড্রেস পরিহিত একদল যুবক হামলা করে। এ ঘটনায় আওয়ামী লীগের ১৭ জন নেতাকর্মী আহত হয়। গতকাল রোববারও দুপুরের দিকে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ের দিকে আসতে থাকে। মিছিলটি ঝিগাতলার জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালের সামনে এলে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। মিছিল থেকে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়ে। পুলিশ টিয়ার শেল ছোড়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে। পরে ঐ এলাকায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পুলিশের সঙ্গে একদল যুবককে লাঠি-রামদা হাতে শিক্ষার্থীদের ধাওয়া করতে দেখা যায়। এ ঘটনায় কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মীও আহত হন। ঘটনার একপর্যায়ে বিজিবিও লাঠিচার্জ করে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করে। শনিবারের হামলার পরপরই আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তরা দেশকে অশান্ত করতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনুপ্রবেশ করে তাদের বেশ ধরে আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে হামলা চালিয়েছে। হামলাকারীরা আওয়ামী লীগের দিকে লক্ষ্য করে পাথর ছুড়েছে। পাথরের নমুনা দেখে আমি বলতে পারি, এই হামলা পরিকল্পিত ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তারা ছাত্র নয়, অনুপ্রবেশকারী। অন্যদিকে, শনিবারই শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে পুঁজি করে ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা প্রকাশ পায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ফাঁসকৃত ফোনালাপে। ভাইরাল হওয়া একটি অডিও ক্লিপে নওমি নামের এক ব্যক্তিকে কুমিল্লা থেকে ঢাকায় এসে বন্ধুদের নিয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সক্রিয় হতে বলেন। একইসঙ্গে কুমিল্লায়ও মানুষজন রাস্তায় নামানোর নির্দেশ দেন।এছাড়া শনিবার রাতে সুশাসনের জন্য নাগরিক ‘সুজন’-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারের বাড়ি হতে ফেরার পথে কয়েকজন যুবক রাষ্ট্রদূতের গাড়িতে হামলা করে। হামলাকারীরা রাষ্ট্রদূতের গাড়ির পেছনে ধাওয়া করে ঢিল ছোড়ে। মূলত চলমান আন্দোলন ইস্যুতে সরকারের ওপর বহির্বিশে^র চাপ বাড়াতে পরিকল্পিতভাবে এ হামলা করা হয়। এসব ঘটনার পেছনে সরকার পতনের ষড়যন্ত্র রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। আওয়ামী লীগের উপদেষ্টাম-লীর সদস্য ও কূটনীতিক অ্যাম্বাসেডর মোহাম্মদ জমির বলেন, ছাত্রদের আন্দোলন যৌক্তিক। আন্দোলন যৌক্তিক বলেই প্রধানমন্ত্রী তাদের দাবি মেনে নিয়েছেন এবং বাস্তবায়নও শুরু করেছেন। সাধারণ জনগণের কতটা কষ্ট হচ্ছে। মিডিয়ার উচিত সরকারের পদক্ষেপ তুলে ধরা। যাতে তারা গুজবে কান না দেয় এবং ক্লাসে ফিরে আসে। বিএনপি নেতা আমির খসরুর ফোনালাপ উল্লেখ করে তিনি বলেন, কিছু কিছু ব্যক্তি আন্দোলনকে রাজনীতিকরণ করতে চেষ্টা করছেন। মিথ্যা তথ্য প্রচার করে অসাধু ফায়দা লোটার চেষ্টা করছে। এটা মোটেই কাম্য নয়। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গতকাল বলেন, নেতিবাচক রাজনীতির হোতা বিএনপি নিরাপদ সড়কের আন্দোলনকে নিরাপদ ক্ষমতার পথ হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। সেই এজেন্ডা নিয়ে এরা এগিয়ে যাচ্ছে। গত তিন দিনে পরিষ্কার হয়ে গেছে। গতকাল তো দিবালোকের মতো পরিষ্কার হয়ে গেছে। ওবায়দুল কাদের বলেন, আমীর খসরু মাহমুদের ফোনালাপে মির্জা ফখরুলের সমর্থন দেয়ায় বিএনপির ষড়যন্ত্র ফাঁস হয়ে গেছে। ফলে প্রমাণ হলো বিএনপি ও তার দলের দোসররা শিক্ষার্থীদের এ অরাজনৈতিক আন্দোলনের ওপর ভর করে সরকার পতনের ষড়যন্ত্র করছে। শনি ও রোববারের হামলার পর এটা প্রমাণিত যে, মির্জা ফখরুল ও তার দল এ হামলায় জড়িত। বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছি, প্রধানমন্ত্রী দলীয় নেতাকর্মীদের সতর্ক ও সংযত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। এদিকে, গতকাল রোববার আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনুপ্রবেশ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, আমরা এখন যেটা দেখতে পাচ্ছি আন্দোলনে তৃতীয় পক্ষ চলে এসেছে। সেখানে গাউসিয়া মার্কেট থেকে স্কুল ইউনিফর্ম বিক্রি হয়ে গেছে হঠাৎ করে। পলাশি থেকে আইডি কার্ড তৈরি করা হচ্ছে। ওগুলো কারা নিচ্ছে? এরা কি আদৌ ছাত্র? কখনো মুখে কাপড় বেঁধে, হেলমেট পরে চেহারা ঢেকে ঢুকে পড়ছে। আমি এখন শঙ্কিত স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে। বিএনপিকে ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঢাকার বাইরে থেকে লোক নিয়ে আসছে। এখানে তাদের কাজটা কী? সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করা। আর যারা এগুলো করতে পারে তারা যে এসব কোমলমতি শিশুদের ওপর কোনো আঘাত করবে না, কোনো ক্ষতি করবে না, তার নিশ্চয়তা কী? যারা আগুন দিয়ে মানুষ পুড়িয়ে মারতে পারে, তারা নিজের স্বার্থে যেকোনো পথে যেতে পারে। গত ২৯ জুন বিমানবন্দর সড়কের কুর্মিটোলায় বাসচাপায় নিহত হন রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী দিয়া খানম মিম ও আবদুল করিম রাজীব। এ ঘটনার পর নিরাপদ সড়কের দাবিতে গত সোমবার থেকে ৯ দফা দাবিতে টানা ৭ দিন ধরে বিভিন্ন সড়ক অবরোধ করে আন্দোলনে নামে বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। -ডেস্ক