(দিনাজপুর২৪.কম) ফৌজদারি অপরাধ করলেও সরকারের অনুমোদন ছাড়া কোনো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে গ্রেপ্তার করা যাবে না। তবে মামলা ও তদন্তে বাধা থাকছে না।
এই বিধান রেখে গতকাল সোমবার সরকারি কর্মচারী আইন, ২০১৫-এর খসড়া অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা। এখন আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত নেওয়ার পর এটি জাতীয় সংসদে উঠবে। আইনজ্ঞরা বলছেন, এর ফলে সরকারি কর্মচারীরা বিশেষ সুরক্ষা পাবেন। এ ছাড়া আইনের চোখে সবাই সমান—এই ধারণার ব্যত্যয় ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। আবার কারও কারও মধ্যে অপরাধ করার প্রবণতা বাড়তেও পারে।
তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে আলোচনা-সমালোচনা ও পর্যালোচনার পর প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করেই আইনের খসড়াটি অনুমোদন করা হলো।
নতুন আইনে বলা হয়েছে, আদালত অভিযোগপত্র অনুমোদন করলে গ্রেপ্তারে অনুমতি নিতে হবে না। এ প্রসঙ্গে আইনজ্ঞরা বলছেন, ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী সরকারি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়ার আগে সরকারের অনুমতি নেওয়ার কথা বলা আছে। এখন নতুন আইনে অভিযোগপত্র অনুমোদন হওয়ার আগে গ্রেপ্তার করতে চাইলেও অনুমতি নেওয়ার বিষয়টি যুক্ত করা হয়েছে।
জানতে চাইলে বিশিষ্ট আইনজীবী শাহ্দীন মালিক প্রথম আলোকে বলেন, কাউকে গ্রেপ্তার করা হবে কি হবে না, তা অপরাধের ওপর নির্ভর করবে। এটি যদি ব্যক্তির ওপর নির্ভর করে, তাহলে তা মধ্যযুগীয় বা সামন্তবাদী আইন বলতে হবে। তাঁর মতে, আগে রাজা-বাদশারা অপরাধ করলে এর জবাবদিহি ছিল না। এর বিপরীতে আসে গণতন্ত্র, যার মূল কথা আইনের চোখে সবাই সমান। কিন্তু যে আইন হয়েছে, তা সবার থেকে আলাদা, যা সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে।
দেশে প্রথম প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের জন্য এ ধরনের আইন হতে যাচ্ছে। এত দিন রাষ্ট্রপতির বিধি দিয়ে তাঁরা পরিচালিত হতেন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় প্রথমে সিভিল সার্ভিস অ্যাক্ট তৈরি করার উদ্যোগ নিলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংবিধানের সঙ্গে মিল রেখে
সরকারি কর্মচারী আইন প্রণয়নের অনুশাসন দেন।
জানতে চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী দিনাজপুর২৪.কমকে বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ১৯৭ ধারা অনুসরণ করে এ আইন করা হয়েছে। এটি ‘মাদার ল’ হিসেবে কাজ করবে। এত দিন সরকারি কর্মচারীদের জন্য বিভিন্ন বিধি বা আইন থাকলেও সেগুলো ছিল বিক্ষিপ্ত।
ফৌজদারি কার্যবিধির ১৯৭ ধারা অনুসারে সরকারি কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পেলে অভিযোগপত্র দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা দপ্তরের অনুমোদন লাগবে। তবে গ্রেপ্তারে বাধা নেই। কিন্তু নতুন আইনে অভিযোগপত্র দেওয়ার আগে গ্রেপ্তার করা যাবে না।
বিদ্যমান আইন অনুযায়ী রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় সাভার উপজেলার সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তাসহ (ইউএনও) ছয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করার অনুমতি দেয়নি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো।
সরকারি অনুমোদন ছাড়াই পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ইউএনওকে বাদ দিয়ে পাঁচ সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে। সিআইডির যুক্তি হচ্ছে, তাঁদের জড়িত থাকার তথ্য-প্রমাণ পাওয়ায় তাঁরা অভিযোগপত্র থেকে তাঁদের বাদ দেননি। এখন আদালত এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন।
জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সাবেক সচিব আলী ইমাম মজুমদার দিনাজপুর২৪.কমকে বলেন, কিছু কাজ বা দায়িত্ব সরকারি কর্মচারীরা সম্পাদন করেন, যেগুলো কেন তাঁরা করেন তার জবাব ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষই দিতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতি থেকে সুরক্ষায় আইনটির ক্ষেত্রবিশেষ গুরুত্ব আছে।
তবে সরকারি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বিশেষ পরিস্থিতির জন্য এ আইন প্রয়োজন হলেও খুন, ধর্ষণ, নারী নির্যাতনের মতো ফৌজদারি মামলায় গ্রেপ্তার বা বিচারে বাধা থাকার কথা নয়।
এর আগে সরকারের অনুমতি ছাড়া কোনো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের বা গ্রেপ্তারের বিপক্ষে জোরালো অবস্থান নেয় সচিব কমিটি। কাউকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে গ্রেপ্তার করা হলে তা প্রচলিত আইন ও সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করে কমিটি। গত বছরের ১৪ আগস্ট সচিব কমিটির ওই সুপারিশ নিয়ে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।
সরকারি কর্মচারীদের গ্রেপ্তারের আগে অনুমতি লাগবে কি না, তা নিয়ে সরকার ছাড়াও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও জাতীয় সংসদে কয়েক দফা আলোচনা হয়। এমনকি বিষয়টি উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে।
এ প্রসঙ্গে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা বলেন, সরকারি কর্মচারীদের এমন কোনো সুবিধা দেওয়া হচ্ছে না, যা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
দুদক আইন থেকে রক্ষা মিলবে না
সরকারের একাধিক সূত্র জানায়, সরকারি কর্মচারী আইনে সুরক্ষা পেলেও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আইনে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা রেহাই পাবেন না। যদিও সরকারি কর্মচারী আইনে বলা আছে, দুদক বা অনুরূপ সাংবিধানিক ক্ষমতাপ্রাপ্ত সংস্থা তদন্ত করতে বা উপযুক্ত আদালতে অভিযোগ দায়ের করতে পারবে। তবে এ-সংক্রান্ত ফৌজদারি মামলায় আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণের আগে কর্মচারীকে গ্রেপ্তার করতে হলে সরকারের পূর্বানুমোদন নিতে হবে।
সরকারের অনুমোদন ছাড়া সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে মামলা করা যাবে না—এই বিধান রেখে ২০১৩ সালের ১০ নভেম্বর জাতীয় সংসদে দুদক সংশোধন বিল, ২০১৩ পাস হয়। এর মাধ্যমে দুদকের ক্ষমতা খর্ব করার অভিযোগ ওঠে বিভিন্ন মহল থেকে।
এরপর ২৫ নভেম্বর মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের পক্ষে চার আইনজীবী সংশোধনী আইন চ্যালেঞ্জ করে রিট করেন। এরপর গত ৩০ জানুয়ারি দুদক আইনের সংশোধনীতে আনা ৩২(ক) ধারা অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেন হাইকোর্ট। ওই ধারায় বলা হয়েছে, জজ, ম্যাজিস্ট্রেট বা সরকারি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৯৭ (১) ধারা আবশ্যিকভাবে পালন করতে হবে। এই ধারা অনুযায়ী, সরকারের অনুমোদন ছাড়া ফৌজদারি আদালত কোনো সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আমলে নিতে পারবেন না।
হাইকোর্ট ওই ধারাটি বাতিল করার পর সাবেক গৃহায়ণ ও গণপূর্তসচিব খন্দকার শওকত হোসেনের বিরুদ্ধে প্রথম দুর্নীতির মামলা করে দুদক। এ ক্ষেত্রে সরকারের অনুমতি নেওয়া হয়নি।
সচিবের বিরুদ্ধে এ ধরনের মামলা হওয়ায় সরকারি কর্মকর্তারা নড়েচড়ে বসেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সচিব দিনাজপুর২৪.কমকে বলেন, সচিবেরা প্রচলিত আইন ও সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো সুবিধা চাননি। তাঁরা চেয়েছেন, সরকারের অনুমতি নিয়ে মামলা করতে হবে। অভিযুক্তকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে।
বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ১৯৭(১) ধারা উল্লেখ করে এই কর্মকর্তা বলেন, ওই ধারা অনুযায়ী সরকারের পূর্বানুমতি ছাড়া কোনো আদালত অভিযুক্ত ব্যক্তির অপরাধ আমলে নিতে পারবেন না।
তবে রিট আবেদনকারীদের অন্যতম সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ দিনাজপুর২৪.কমকে বলেন, সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ অনুসারে সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান। কিন্তু দুদক আইনের সংশোধনীতে জজ, ম্যাজিস্ট্রেট ও সরকারি কর্মচারীদের বিশেষ সুরক্ষা দেওয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, সরকারি কর্মচারী আইনেও এমন সুরক্ষা দেওয়া হলে তাঁরা আবারও তা চ্যালেঞ্জ করবেন।
দুদকের চেয়ারম্যান মো. বদিউজ্জামান দিনাজপুর২৪.কমকে বলেন, নতুন আইনটি তিনি দেখেননি। তবে দুদক আইনে বলা আছে, অন্য আইনে যা কিছু থাকুক না কেন, দুদক আইন প্রাধান্য পাবে।
সরকারি কর্মচারী আইনেও বলা আছে, আপাতত বলবৎ অন্য কোনো আইন, অধ্যাদেশ, বিধি, আদেশ বা নির্দেশে ভিন্নরূপ যাহা কিছুই থাকুক না কেন, এই আইনের আওতাভুক্ত প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের ক্ষেত্রে এই আইনের বিধান কার্যকর হবে।
উল্লেখ্য, নিজস্ব আইন থাকায় সাংবিধানিক পদে ও বিচার বিভাগে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ, পোশাকধারী শৃঙ্খলিত যেকোনো বাহিনী, রেলওয়ের কর্মচারী, সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারী, উন্নয়ন প্রকল্পের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সরকারি কর্মচারী আইনের আওতায় পড়বেন না।
বেতন কমিশন গঠন: আইনে বলা হয়েছে, সরকারি কর্মচারীদের জন্য স্থায়ী বেতন ও প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন থাকবে। কমিশন প্রতিবছর বাজারমূল্যের গতি-প্রকৃতি বিশ্লেষণ করে বেতন বৃদ্ধির বিষয়টি সমন্বয় ও তা বাস্তবায়নের সুপারিশ করবে।
আইনের আওতায় ১০টি ক্ষেত্রে প্রয়োজনে বিধি করা যাবে। পদোন্নতির জন্য পরীক্ষা ও কর্মমূল্যায়নের বিধি হবে।
জনপ্রশাসন সচিব কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী বলেন, সরকারি কর্মচারীদের জনমুখী করতে, তাঁদের দক্ষতা বাড়াতে ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতেই আইনটি করা হয়েছে।
গ্রেড থাকবে, শ্রেণি থাকবে না: নতুন আইন অনুযায়ী সরকারি কর্মচারীদের শ্রেণি তুলে দেওয়া হবে। অর্থাৎ প্রথম শ্রেণি, দ্বিতীয় শ্রেণি বলে কিছু থাকবে না। জনপ্রশাসন সচিব জানান, পর্যালোচনায় দেখা গেছে, শ্রেণি থাকার প্রয়োজন নেই। আইনটি প্রণয়নে ভারতের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।(ডেস্ক)