(দিনাজপুর২৪.কম) নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি ও আইনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে রুদ্ধ করে সরকারই জঙ্গিবাদ উত্থানের পথ তৈরি করে দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। একইসঙ্গে সংকট উত্তরণের প্রয়োজনে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সংকট নিরসনে সময়ক্ষেপণ না করতে সরকারের প্রতিও আহ্বান জানান তিনি। খালেদা জিয়া বলেন, বর্তমান সরকার এর দায় এড়াতে পারে না। নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি ও আইনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে রুদ্ধ করে দিয়ে তারাই জঙ্গিবাদের উত্থানের পথ করে দিচ্ছে বলে আমরা মনে করি। আমরা মানুষের নিরাপত্তা চাই। আমরা সকলের জন্য নির্বিঘ্ন জীবন চাই। আমরা মনে করি, সেই নিরাপত্তা সরকারকেই দিতে হবে। জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি-জাগপা’র ৩৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানীর কাকরাইলে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স মিলনায়তনে আয়োজিত কনভেনশনে তিনি এ কথা বলেন। খালেদা জিয়া বলেন, আমরা নির্বাচিত হয়ে সরকারে থাকতে জঙ্গিবাদী তৎপরতাকে কঠোর হাতে দমন করেছিলাম। জঙ্গি নেতাদের গ্রেপ্তার ও বিচারের আওতায় আনা হয়েছিল। তাদের নেটওয়ার্ক সম্পূর্ণ অকার্যকর করে ফেলা সম্ভব হয়েছিল। আজ আবারও সেই জঙ্গিবাদের উত্থানের আলামত দেখে আমরা দেশবাসীর সঙ্গে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার বৈধ নয়। কিন্তু রাষ্ট্র ক্ষমতা তো তারা অবৈধভাবে দখল করে রেখেছে। কাজেই নাগরিকদের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব তাদেরকেই পালন করতে হবে। তারা সেই দায়িত্ব এড়িয়ে চলছে। তারা বলছে, সকলকে নিরাপত্তা দেয়া সম্ভব নয়। এই কথা বলে, এইভাবে দায়িত্ব এড়িয়ে কারো ক্ষমতায় থাকার অধিকার থাকে না। খালেদা জিয়া বলেন, গুপ্তহত্যা ও অতর্কিতে হামলা চালিয়ে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। ব্লগার, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, লেখক, প্রকাশক, বিদেশী নাগরিক, দূতাবাস কর্মী এবং বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের লোকেরাও এ ধরনের হামলা ও হত্যার শিকার হচ্ছে। আতঙ্কের ব্যাপার হচ্ছে, বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠীর নামে এসব হত্যার দায় স্বীকার করা হচ্ছে। এসব ঘটনায় প্রতিটি নাগরিক আজ নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শংকিত ও উদ্বিগ্ন। সরকার এসব হামলা ও হত্যার ঘটনা বন্ধ করতে পারছে না। আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসীদের উপস্থিতির কথা তারা অস্বীকার করছে। কিন্তু প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে পারছে না। বরং তারা এর দায়-দায়িত্ব চাপাচ্ছে বিরোধী দলের উপর। এতে তদন্ত প্রভাবিত হচ্ছে এবং প্রকৃত অপরাধীরা আড়ালে থেকে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের শাসন আমলে এদেশে প্রথম জঙ্গিবাদের বিস্তার ঘটেছিলো। সে সময়, রমনার বটমূলে বর্ষবরণ উৎসব, যশোরে উদীচীর সাংস্কৃতিক আয়োজন, ঢাকার পল্টনে সিপিবি’র জনসভায়, বানিয়াচংয়ের গির্জায়, খুলনায় আহমদিয়া সম্প্রদায়ের উপাসনালয়ে বোমা হামলার ঘটনায় অনেক মানুষ হতাহত হয়েছিল। তখনও প্রকৃত সন্ত্রাসী ও জঙ্গিদের আড়াল করে আওয়ামী লীগ দায় চাপিয়েছে বিএনপি ও বিরোধী দলের ওপর।  খালেদা জিয়া বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের একটি আদালতে একটি মামলার রায় নিয়ে এখন আমাদের দেশে ব্যাপক আলোচনা চলছে। কি সে মামলা? এফবিআইয়ের একজন এজেন্টকে ঘুষ দিয়ে এক প্রবাসী বাংলাদেশী তরুণ বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর পুত্রের ব্যাপারে কিছু তথ্য সংগ্রহ করেছিলো। সেই মামলার নথিতেই আছে প্রধানমন্ত্রীর পুত্রের একটি একাউন্টেই আড়াই হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ তিনশ’ মিলিয়ন ডলার জমা আছে। এই টাকা কোথা থেকে গেছে? এই টাকার উৎস কি? এভাবে তাদের আরও কত টাকা আছে, বাংলাদেশের মানুষ তা জানতে চায়? বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, বাংলাদেশের মানুষ মনে করে এই টাকা বাংলাদেশের জনগণের টাকা। এভাবে দুর্নীতি ও লুটপাটের মাধ্যমে অর্জিত বিপুল টাকা বিদেশে পাচার করে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলা হয়েছে। এ নিয়ে তদন্ত হওয়া উচিত। এ টাকা ফিরিয়ে আনা দরকার। কিন্তু এ টাকার ব্যাপারে সরকার নীরব। খালেদা জিয়া বলেন, তারা এই টাকার কথা ধামাচাপা দিতে প্রবীণ সাংবাদিক শফিক রেহমানকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করেছে। কারারুদ্ধ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকেও এই মামলায় জড়িয়ে রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। মিথ্যা অভিযোগ আনা হয়েছে, তারা না-কি প্রধানমন্ত্রীর পুত্রকে অপহরণ ও হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের আদালতের রায়েই এ ধরনের অভিযোগকে নাকচ করে দেয়া হয়েছে। এভাবে মিথ্যা প্রচারণা, অত্যাচার, নানা ইস্যু সৃষ্টি করে তারা তাদের অপরাধগুলো ঢেকে রাখতে চায়। জনগণের দৃষ্টিকে অন্যদিকে সরিয়ে দিতে চায়। খালেদা জিয়া বলেন, এভাবে দেশ চলতে পারে না। দেশে গণতন্ত্র আনতে হবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সুবিচার ফিরিয়ে আনতে হবে। জুলুম-নির্যাতন বন্ধ করতে হবে। শান্তি ও নাগরিকদের নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনতে হবে। সেজন্য যে সেখানে আছেন সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে সংগ্রাম করতে হবে। তিনি বলেন, রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। সেই স্বাধীনতাকে সব মানুষের জীবনে অর্থবহ করে তুলতে হবে। আমরা একটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দল হিসাবে প্রতিবেশীসহ সকল দেশের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ ও মৈত্রীর সম্পর্ক চাই। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সব দেশের সঙ্গে সকল সমস্যা নিরসনের নীতিতে আমরা বিশ্বাসী। তবে একটি স্বাধীন দেশ হিসাবে আমরা সবকিছুই করবো সমমর্যাদার ভিত্তিতে। আমরা কারো কাছে মাথা নত করবো না। দেশজাতির এক গভীর সংকটকাল চলছে। দেশে গণতন্ত্র, প্রতিনিধিত্বশীল সরকার, বৈধ সংসদ, কার্যকর বিরোধী দল কিছুই নেই। নির্বাচনী ব্যবস্থাকে প্রহসনে পরিণত করা হয়েছে। দেশে আজ সুশাসন, সুবিচার, আইনের শাসন নেই। রাষ্ট্রীয় প্রথা ও প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। মানুষের কোন নিরাপত্তা নেই। সরকার কাউকে কোথাও কোনো নিরাপত্তা দিতে পারছে না। তবুও দাবি করছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক। যা কিছু ঘটছে তা সব বিচ্ছিন্ন ঘটনা। তিনি বরেন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীগুলো স্বাভাবিকভাবে আইন অনুযায়ী তাদের কর্তব্য পালন করতে পারছে না। তাদেরকে রাখা হয়েছে শুধু গণবিচ্ছিন্ন ও অবৈধ সরকারকে জনগণের ক্ষোভ থেকে রক্ষা করার জন্য। তারা সাধারণ মানুষের উপর নির্যাতন চালাচ্ছে। বিচার বহির্ভূতভাবে যাকে খুশি তাকে হত্যা করছে। জোর করে ধরে নিয়ে গিয়ে গুম ও খুন করে ফেলছে। যেখানে সেখানে খুনের শিকারদের লাশ পাওয়া যাচ্ছে। অনেকের লাশের সন্ধানও মিলছে না। জুলুম, নির্যাতন, গ্রেপ্তার, হামলা, মামলা চলছে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের ওপর। অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে বাড়িছাড়া। গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। মিথ্যা মামলা দিয়ে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নিয়ে সম্মানিত নাগরিকদেরকেও নির্যাতন করা হচ্ছে। খালেদা জিয়া বলেন, দেশে কোনো সুস্থ-স্বাভাবিক অবস্থা নেই। প্রতিদিন গড়ে ১৪ জন মানুষ খুন হচ্ছে। নারী ও শিশুরাও রেহাই পাচ্ছে না। গত তিন মাসে পত্রিকার হিসাবে দেড় হাজার লোক খুন হয়ে গেছে। দুর্নীতি ও লুটপাট করে দেশের সম্পদ বিদেশে পাচার করা হচ্ছে। শেয়ার বাজার থেকে লক্ষ কোটি টাকা লুটে নেয়া হয়েছে। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদেরকে নিঃস্ব করে ফেলা হয়েছে। ব্যাংকগুলো থেকে লুটপাট হয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকা। বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে রিজার্ভের আটশ’ কোটি টাকা ডিজিটাল কারচুপির মাধ্যমে পাচার করা হয়েছে। দফায় দফায় অবিশ্বাস্য রকমের ব্যয় বাড়িয়ে উন্নয়ন প্রকল্পগুলো থেকে কোটি কোটি টাকা লুণ্ঠন করা হচ্ছে। বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, কোনো শ্রেণী-পেশার মানুষই আজ ভালো নেই। কৃষকেরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম পাচ্ছে না। অথচ তাদের উৎপাদন খরচ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। নিত্যপণ্যের দাম হু হু করে বেড়ে যাচ্ছে। কোথাও নিয়ন্ত্রণ নেই। সীমিত আয়ের মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎখাতে দুর্নীতি ও লুটপাটের অবাধ লাইসেন্স দেয়া হলো। তারপরেও ভয়াবহ লোডশেডিংয়ে জনজীবন আজ অতিষ্ঠ। আজ যে সীমাহীন নির্যাতন ও লুটপাট চলছে বাংলাদেশের মানুষ এর আগে তা কখনো দেখেনি। খালেদা জিয়া বলেন, বর্তমান ক্ষমতাসীনদের কোনো গণভিত্তি নেই। জনগণের মধ্যে তাদের কোনো সমর্থন নেই। তাই তারা অন্যের শক্তির ওপর ভর করে দেশের মানুষকে পদানত করে রাখতে চায়। এভাবে বেশিদিন চলা যায় না। আমি মনে করি, বর্তমান শাসকেরাও এইভাবে বেশিদিন ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারবে না। তাই তাদেরকে বলবো, দেশের মানুষের উপর নির্ভর করুন। দেশের অভ্যন্তরে যে সঙ্কট সৃষ্টি করেছেন তা দেশের ভেতরেই আলাপ-আলোচনার পথে নিরসন করুন। সময় দ্রুত বয়ে যাচ্ছে। আর সময় ক্ষেপণের চেষ্টা করবেন না। জাগপার কনভেনশনে তিনি দলটির নেতাকর্মীদের অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, আমাদের সঙ্গে ২০ দলীয় জোটে থেকে জাগপা  দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং জনগণের অধিকার কায়েমের সংগ্রামে সাধ্যমতো ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। আপনাদের দলের নেতা-কর্মীরাও কারা নির্যাতন ও জুলুম-অত্যাচারের শিকার হচ্ছেন। দল হিসাবে জাগপা ছোট হতে পারে। কিন্তু দেশজাতির সংকটের সময়ে আপনারা যে দেশপ্রেম ও সাহসের পরিচয় দিচ্ছেন তা গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে। আমি আপনাদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি। এর আগে বিকাল সাড়ে ৪টায় কনভেনশনে উপস্থিত হন তিনি। জাগপা সভাপতি শফিউল আলম প্রধানের সভাপতিত্বে কনভেশনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক এমাজউদ্দিন আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সুকোমল বড়ুয়া, সাংবাদিক সঞ্জীব চৌধুরী ও দলটির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার লুৎফর রহমান বক্তব্য দেন। এছাড়া কনভেশনে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, সেলিমা রহমান, ২০ দলীয় জোটের শরিক সিনিয়র নেতা লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, এনপিপি চেয়ারম্যান ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, জাতীয় পার্টি (জাফর) মহাসচিব মোস্তফা জামাল হায়দার, এনডিপির সভাপতি খন্দকার গোলাম মোর্ত্তজা, খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির সৈয়দ মুজিবুর রহমান বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, খায়রুল কবির খোকন, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক নাজিম উদ্দিন আলম, সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস জাহান শিরিন, শামা ওবায়েদ, বিএনপি চেয়ারপারসনের প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান সোহেল ও বিএনপি নেতা আতাউর রহমান ঢালী উপস্থিত ছিলেন।-ডেস্ক