(দিনাজপুর২৪.কম) বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা ফুটবল। যদিও সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ফলাফল করায় বাংলাদেশের ক্রিকেট বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ফুটবলের চেয়ে। এরপরও গ্রাম-বাংলায় এখনো যে কোনো ফুটবল টুর্নামেন্টে মাঠে থাকে উপচেপড়া দর্শক। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় প্রতিপক্ষ দলগুলো এখন তেমন একটা সমীহ চোখে দেখে না বাংলাদেশকে। তাই পেশাদার লিগে ৬৫ লাখ টাকা পারিশ্রমিক পাওয়া দেশি ফুটবলারের খেলা দেখতে মাঠে আসে না ফুটবলপ্রেমীরা। বরাবরের মতো এবারো বিদেশি ফুটবলারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে প্রিমিয়ার লিগে অংশ নেয়া ক্লাবগুলো। বিগত দিনে ফুটবলের পৃষ্ঠপোষকরা নানান কারণে বাফুফে থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। ফুটবল লিগে অংশ নেয়া বেশিরভাগ ক্লাবগুলোর করুণ অবস্থা। ঘরোয়া ফুটবলে তারকা ফুটবলার কারা? এমন প্রশ্নের উত্তর মেলা ভার! দেশের দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বি মোহামেডান-আবাহনীর খেলা কোন দিন সেটার খবর রাখে না কেউ। ঘরোয়া লিগে স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে নেই দর্শক। ফুটবলের এই ‘হ-য-ব-র-ল’ অবস্থার কারণেই দর্শকরা মাঠে আসে না। পাইপলাইনে মানসম্পন্ন ফুটবলার সংকট। নেই বাফুফের কোনো ফুটবল একাডেমি। মাঠে গড়ায় না নিয়মিত জেলা ফুটবল লিগ। পাইওনিয়ার, তৃতীয়, দ্বিতীয় ও প্রথম বিভাগ ফুটবল লিগ কবে মাঠে গড়াবে তার সঠিক উত্তর কারো জানা নেই। তাই নানান কারণে সমস্যায় জর্জরিত এখন দেশের ফুটবল। বহির্বিশ্বে এখন বাংলাদেশে ফুটবল যেন নিভুনিভু মশাল! তাই আলো হারিয়ে অন্ধকারে বাতি খোঁজার ব্যর্থ চেষ্টারত লাল-সবুজ জার্সিধারীরা। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) এক প্রভাবশালী কর্মকর্তার আচরণ ও কর্মকা-ে ক্ষুব্ধ হয়ে বাফুফে ছেড়ে বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী চলে গেছেন। গত ১০ বছরে ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান কেবলই নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে! ফুটবল উন্নয়নে ফিফার অনুদানের কোটি টাকা কোথায় খরচ হচ্ছে? এমন প্রশ্নের উত্তর অজানা! এদিকে, সিলেট বিকেএসপি ফুটবল একাডেমিকে দেয়া ফিফার অনুদানের সাত লাখ ডলার কোন খাতে ব্যয় হয়েছে সেটা এখনো পরিষ্কার করে বলতে পারেনি দেশের ফুটবল কর্তারা! বিশ্বকাপ ফুটবলের আয়োজক কাতারকে সমর্থনের বিনিময়ে বাংলাদেশের ফুটবলে সহযোগিতা দেয়ার কথা থাকলেও তেমন একটা সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায়নি। ফিফার সাবেক সভাপতি সেপ ব্লাটার ২০১২ সালে বাংলাদেশ সফরের সময় সিলেট বিকেএসপি ফুটবল একাডেমির জন্য সাত লাখ ডলার অনুদান দেয়ার ঘোষণা দেন। পরবর্তীতে দুই দফায় ফিফা বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনকে (বাফুফে) সাত লাখ ডলার দেয়। প্রথম দফায় চার লাখ, পরে আরও তিন লাখ। প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি টাকার ফিফা অনুদান একাডেমির পেছনে খরচ হয়নি বলে জানা গেছে বিভিন্ন সূত্রে। অথচ ওই টাকা একাডেমি খাতে খরচ দেখিয়ে ফিফায় বিবরণী পাঠানো হয়েছে বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাফুফের এক কর্মকর্তা জানান। তিনি জানান, সম্প্রতি ব্লাটারের পদত্যাগের ঘটনায় বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন একটি জাতীয় দৈনিকে স্বীকার করেন ফিফার ওই অনুদানের কথা। অথচ সেই টাকার সামান্য অংশও একাডেমির পেছনে খরচ হয়নি। কিন্তু ফিফাকে দেখানো হয়েছে টাকা একাডেমি খাতে খরচ করা হয়েছে। জানা গেছে, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে সিলেট একাডেমিতে যে সংস্কার করেছে, ওই সংস্কার কাজের ব্যয়ও ফিফার টাকায় করা হয়েছে বলে বাফুফে বিবরণী জমা দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে বাফুফের সহ-সভাপতি বাদল রায় বলেন, একাডেমি খেলার উপযোগী করে গড়ে তোলার জন্য একাডেমিতে দুই কোটি টাকার সংস্কার করা হয়েছে। সেখানে ফিফার অনুদানের কোনো টাকা খরচ করা হয়নি। যদি ফিফার কাছে এমন কোনো বিবরণী পাঠানো হয়ে থাকে, তা খুবই দুঃখজনক। সম্প্রতি একটি ক্রীড়াবিষয়ক অনুষ্ঠানে দেশের সাবেক তারকা ফুটবলাররা ‘বর্তমানে দেশের ফুটবল কোন পথে?’ এই শিরোনামে আলোচনায় বলেন, ফুটবলের সংটাবস্থার প্রধান কারণ যুব ফুটবলের অবমূল্যায়ন। তবে বয়সভিক্তিক টুর্নামেন্টে মেয়েরা দুর্দান্ত খেলছে। তাদের আরও ভালো ফলাফল করতে নতুন নতুন স্পন্সররা এগিয়ে আসছে। তাদের বছরব্যাপী ট্রেনিংয়ে রাখার কারণেই কিশোরীরা ভালো করেছে। কিন্তু যুব-কিশোরদের উন্নয়নে বরাবরই উদাসীন বাফুফে। তাই পাইপলাইনে ফুটবলার সংকট দেখা দিয়েছে।ফুটবলার তৈরির ফ্যাক্টরি ‘ফুটবল একাডেমি’ বাফুফে এখনো গড়ে তুলতে পারেনি। নেই বাফুফের কোনো জিমনেশিয়াম, নেই খেলোয়াড়দের চিকিৎসা সেবাদানের জন্য একটি ক্লিনিক বা হাসপাতাল। অথচ ফিফার অনুদানে পাওয়া ওই অর্থে তার যে কোনো একটি করে দেখাতে পারতো ফুটবল ফেডারেশন বলে মনে করেন ফুটবল সংশ্লিষ্টরা। এদিকে, ২০০৩ সালে বাংলাদেশকে সাফে চ্যাম্পিয়ন করেছিলেন কোচ জর্জ কোটান। বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার আগে তিনি বলে গিয়েছিলেন এ দেশে কিছু হবে না। নেই কোনো স্ট্রাকচার, নেই কোনো তৃণমূলে কাজ। সবাই জাতীয় দল নিয়ে দৌড়ায়। গাছের গোড়ায় পানি না দিয়ে সবাই মাথায় পানি দিতে চাচ্ছে। সফলতা চাচ্ছে। এভাবে কোনো দেশের ফুটবল এগিয়ে যেতে পারে না। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব তো আছেই, নেই কোনো উদ্যোগও।সাবেক জাতীয় দলের তারকা ফুটবলার আশরাফ উদ্দীন আহমেদ চুন্নু ও গোলাম সারোয়ার টিপু, হাসানুজ্জামান বাবলু বলেন, দেশের ফুটবলের মৃত্যু হয়ে গেছে। ফেডারেশনের কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেই। দেশের ফুটবলের অচলাবস্থা দূর করতে বড় বিজ্ঞাপন হিসেবে সাবেক ফুটবলার কাজী সালাউদ্দীনকে নির্বাচিত করা হয়েছিল, আমরা সবাই সমর্থনও করেছিলাম কিন্তু তিনি তেমন উল্লেখ করার মতো কিছু করে দেখাতে পারেননি। তবে তিনি সাউথ এশিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের (সাফ) সভাপতি হয়ে দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছেন বটে। এদিকে, ফুটবল একাডেমির কথা বলে পাঁচ বছরের জন্য লিজ নিয়ে চার বছর অযত্ন-অবহেলায় ফেলে রাখা হয়েছিল সিলেট বিকেএসপিকে। এক বছর পর পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় একাডেমিটি। নতুন করে বাফুফে সাইফ পাওয়ারটেকের হাতে তুলে দেয়ার কথা ছিলো সিলেট বিকেএসপিকে। কিন্তু পরে সেটা নানা কারণে সম্ভব হয়ে উঠে নাই। ফিফার কাছ থেকে অনুদান হিসেবে পাওয়া সাত লাখ ডলার (প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা) হাতিয়ে নিয়েছে বাফুফে, এমন খবরের গুঞ্জন নিয়মিত শোনা যায় ফুটবলপাড়ায়। সে সময়ে সিলেট বিকেএসপির টেকনিক্যাল ডিরেক্টর জোবায়ের নিপু একটি টিভি অনুষ্ঠানে সম্প্রতি বলেন, ফিফা অনুদান পাওয়া সাড়ে পাঁচ কোটি টাকার মধ্যে আমার জানা মতে, ১ কোটি টাকা সিলেট বিকেএসপির (সিলেট ফুটবল একাডেমি) অবকাঠামো, কোচিং এবং ফুডিংয়ের জন্য ব্যয় হয়েছে। বাকি টাকার খবর নেই তার কাছে! এরপর টাকার অভাবে বন্ধ হয়ে গেছে ওই প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম। বর্তমানে সেখানে আবার ফুটবল একাডেমির সাইনবোর্ডের জায়গায় সিলেট বিকেএসপির সাইনবোর্ড লাগিয়ে দেয়া হয়েছে। এখন প্রশ্ন কোথায় গেলো ফিফার দেয়া বাকি ফুটবল উন্নয়নের অর্থ? এদিকে, সিলেট বিকেএসপিতে প্রায় ৫০০ ছাত্রছাত্রীর পড়াশোনা ও খেলাধুলার সুযোগ রয়েছে। অথচ বাফুফে একাডেমির লিজ নিয়ে কয়েকমাস মাত্র ৪০ জন ফুটবলারকে প্রশিক্ষণ দেয়। প্রায় শত কোটি টাকার স্থাপনা অযত্ন অবহেলায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। মজার ব্যাপার হলো, মাসিক ৫০ হাজার টাকা ভাড়ার চুক্তিতে সিলেট একাডেমিপাঁচ বছরের জন্য লিজ নিলেও একটি টাকাও বাফুফে বিকেএসপিকে দেয়নি। পাঁচ বছরে ভাড়া বাবদ বিকেএসপির পাওনা ২৪ লাখ টাকা। ৭৭ হাজার টাকা বকেয়া বিদ্যুৎ বিল। বকেয়া টাকা চেয়ে কয়েকবার চিঠি দেয়া হলেও বাফুফে সেটা পাত্তা দেয়নি। পরে জানা যায়নি ওই বকেয়া শোধ করা হয়েছে কিনা।-ডেস্ক