এম আহসান কবির(দিনাজপুর২৪.কম)প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, পেশীশক্তি, সন্ত্রাস ও মাদক নির্মূলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জেলা প্রশাসকদের প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন।প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ মঙ্গলবার সকালে তার তেজগাঁওস্থ কার্যালয়ে তিন দিনব্যাপী জেলা প্রশাসকদের সম্মেলন উদ্বোধনকালে বলেন, জেলা প্রশাসকদের শিল্পাঞ্চলে শান্তি রক্ষা, পণ্য-পরিবহন ও আমদানি-রপ্তানি নির্বিঘ্ন করতেও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এখানে আমি বলতে চাই- বিনা দ্বিধায় আপনারা এই টেন্ডারবাজি, পেশী শক্তি, সন্ত্রাস এবং মাদক নির্মূল করবেন।’সরকার প্রধান বলেন, ‘এখানে কে কোন দল করে, কে কি করে সেগুলো দেখার কোন দরকার নেই।’তিনি বলেন, ‘যদি কেউ বাধা দেয়, আপনারা সরাসরি আমার সঙ্গে বা আমার অফিসে যোগাযোগ করতে পারবেন।’‘সরকার প্রধান হতে পারি- আমি কিন্তু জাতির পিতার কন্যা, আপনাদের সেটাও মনে রাখতে হবে’ বলেন তিনি।শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা সমাজ থেকে এসব অশুভ তৎপরতা নির্মূল করে মানুষের শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাই।’প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকারের চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে ক্ষুধা, দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা, জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার অভিশাপমুক্ত একটি সুখী, সমৃদ্ধ, ন্যায়ভিত্তিক, জ্ঞান-নির্ভর ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ বিনির্মাণ। এ ক্ষেত্রে বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।শেখ হাসিনা দেশকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য জেলা প্রশাসকদের অতীতের ধ্যান ধারণা পরিহার করে সেবার মনোভাব নিয়ে দায়িত্ব পালন করে যাবার আহবান জানান।তিনি বলেন, ‘ঔপনিবেশিক মানসিকতা পরিহার করে আপনাদের সেবার মনোভাব নিয়ে সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে। তবেই, দেশ সামনের দিকে এগিয়ে যাবে।’প্রধানমন্ত্রী জেলা প্রশাসকদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘সরকারের পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নের দায়িত্ব আপনাদের, মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের। আমি বিশ্বাস করি যে, আপনাদের মাঝে অনেক উদ্ভাবনী শক্তি আছে। আপনারা এই উদ্ভাবনী শক্তি কাজে লাগিয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন।’একটি দেশের উন্নয়নে দেশে গণতন্ত্র বিদ্যমান থাকা এবং সরকারের ধারাবিহিকতা বজায় থাকা অত্যন্ত জরুরি বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা একটানা দুই মেয়াদে প্রায় সাড়ে ৯ বছর সরকার পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছি। এরফলে আমরা অনেক উন্নয়ন কাজ সম্পন্ন করতে পেরেছি। আর্থ-সামাজিক খাতে আজ বাংলাদেশের যে অভাবনীয় অগ্রগতি, তা সম্ভব হয়েছে এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকার জন্য।জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আর্থ-সামাজিক সূচকের ক্ষেত্রে আমরা শুধু দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলিকে নয়, অনেক উন্নত দেশকেও ছাড়িয়ে যেতে পেরেছি।তিনি দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের চুম্বক অংশ তুলে ধরে বলেন, তার সরকার ধারাবাহিকভাবে প্রবৃদ্ধির উচ্চ হার বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। গত অর্থ-বছরে প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৭৮ শতাংশে। আর মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশের নিচে রাখতে সক্ষম হয়েছে। বর্তমানে এই মূল্যস্ফীতির পরিমান ৫ দশমিক ৪ শতাংশ।তিনি বলেন, মাথাপিছু জাতীয় আয় ২০০৬ সালের ৫৪৩ মার্কিন ডলার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ১ হাজার ৭৫২ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। ২০০৫-০৬ অর্থ-বছরে বাজেটের আকার ছিল ৬৩ হাজার কোটি টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থ-বছরে বাজেটের আকার দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকায়। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে এডিপির আকার ছিল ২৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এডিপির আকার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭৩ হাজার কোটি টাকা। দারিদ্র্যের হার ২০০৬ সালের ৪১ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে হ্রাস পেয়ে বর্তমানে ২২ শতাংশে নেমে এসেছে। শিক্ষার হার বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার আমলের ৪৫ শতাংশ থেকে ৭৩ শতাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে।প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রত্যন্ত অঞ্চলের ২৮ লাখ ৪০ হাজার স্কুল শিক্ষার্থীকে ‘মিড-ডে মিল’ কর্মসূচির আওতায় আনা হয়েছে এবং প্রায় ২ কোটি ৩ লাখ ছাত্রছাত্রীকে বিভিন্ন ধরনের উপবৃত্তি এবং বৃত্তির আওতায় আনা হয়েছে।‘উপবৃত্তির টাকা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সরাসরি মায়েদের একাউন্টে পাঠানো হচ্ছে। এসব কর্মসূচির ফলে বাংলাদেশের বিদ্যালয়গামী প্রায় সবশিশু আজ বিদ্যালয়ে যাচ্ছে। ঝরে পড়া বন্ধ হয়েছে, ’বলেন প্রধানমন্ত্রী।সারাদেশে প্রায় সাড়ে ১৮ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। যেখান থেকে বিনামূল্যে ৩০ প্রকারের ওষুধ প্রদান করা হচ্ছে, – যোগ করেন তিনি।শেখ হাসিনা বলেন, দারিদ্র্য নিরসন এবং বৈষম্য দূর করে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে তার সরকার পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার পাশাপাশি ১০ বছর মেয়াদি প্রেক্ষিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।তিনি এ সময় ২০২১ সাল থেকে ২০৪১ সালের বাংলাদেশকে আমরা কেমন দেখতে চাই সেই প্রেক্ষিত পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ চলছে উল্লেখ করে জেলা প্রশাসকদের এসব পরিকল্পনা প্রণয়নে তাদের অভিজ্ঞতালব্দ জ্ঞানের সন্নিবেশন ঘটানোর আহ্বান জানান।সরকার প্রধান বলেন, তার সরকার দুর্নীতি দমন ও শুদ্ধাচার প্রতিষ্ঠায় ‘জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশ (সুরক্ষা) বিধিমালা, ২০১৭’ প্রণয়ন করেছে। সাধারণ মানুষের সেবা প্রাপ্তিতে যেকোন সমস্যা নিরসনে গণশুনানি কার্যক্রম চলমান রয়েছে। সরকারি কাজে গতিশীলতা আনয়নে সকল সরকারি দপ্তরে ই-সেবার পাশাপাশি পর্যায়ক্রমে ই-ফাইলিং বাস্তবায়ন ও সম্প্রসারণ করা হচ্ছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।সরকারি সেবা পেতে সাধারণ মানুষ যাতে কোনভাবেই হয়রানি বা বঞ্চনার শিকার না হন, সেদিকে কঠোর নজরদারি রাখা এবং চলমান মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত রাখাসহ অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসকদের ২৩ দফা নির্দেশনা প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী ।২৩ দফা নির্দেশনা ছাড়াও জাতীয় গৌরব, মুক্তিযুদ্ধ এবং ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে আগামী প্রজন্মকে জানানোর জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন, পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা, ট্রাফিক রুল সম্পর্কে গণসচেতনতা গড়ে তোলা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সচেতনতা গড়ে তোলার আহবান জানান তিনি।শেখ হাসিনা তার রাজনৈতিক অঙ্গীকার পুণব্যক্ত করে বলেন, বাংলাদেশকে আমরা ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়তে চাই। এ জন্য সবাইকে যার যার জায়গা থেকে কাজ করতে হবে।প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামীতে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে ঢাকা- চট্টগ্রাম, সিলেট, দিনাজপুর এবং বরিশালের মধ্যে বুলেট ট্রেন (দ্রুতগতির ট্রেন) চালুর পরিকল্পনা তাঁর সরকারের রয়েছে।তিনি এ সময় রেল যোগাযোগের পরিসর আরো বাড়ানোর জন্য ঢাকা থেকে বরিশালসহ পায়রা বন্দর পর্যন্ত রেল যোগাযোগ স্থাপন এবং ভবিষ্যতে বিমান ও হেলিকপ্টার নির্মাণের লক্ষ্যে লালমনির হাটে একটি অ্যারোনটিক্যাল সেন্টার স্থাপনের পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করেন।প্রধানমন্ত্রী জেলা প্রশাসকদের উদ্দেশ্যে আরো বলেন, সরকারের একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প, কমিউনিটি ক্লিনিক, শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।তিনি বলেন, আমাদের দেশে ছোট ছোট জমি চাষ করার চাইতে কিভাবে জমি বড় করে সমবায়ভিত্তিক চাষাবাদ করা যায় তা দেখতে হবে। এ ছাড়া কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। এটা হলে বাংলাদেশের কৃষিপণ্য যেমন বিদেশে বাজার পাবে তেমনি দেশেও বিক্রি করা যাবে।
অনুষ্ঠানে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ইসমত আরা সাদেক এবং মুখ্য সচিব মো.নজিবুর রহমান বক্তৃতা করেন। মন্ত্রী পরিষদ সচিব অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তৃতা করেন।এতে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের পক্ষে নওগাঁর জেলা প্রশাসক মো. মিজানুর রহমান, চুয়াডাঙ্গার জেলা প্রশাসক জিয়াউদ্দিন আহমেদ ও মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক বেগম শায়লা ফারজানা এবং রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনার মো.নূর-উর-রহমান বক্তৃতা করেন।সরকারের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সরাসরি মতবিনিময়ের সুযোগ সৃষ্টির জন্যই এই সম্মেলনের আয়োজন। তৃণমূল পর্যায়ে সরকারের নীতি ও কর্মসূচি বাস্তবায়নে সমস্যাসমূহ এবং সেগুলোর সমাধানের পথ ও কৌশল নির্ধারণে এ সম্মেলন কার্যকর ভূমিকা পালন করে থাকে। এ নিয়ে পঞ্চম বারের মত এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদ সদস্যরা, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টারা, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ও সচিবরা, পদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা, সকল জেলার জেলা প্রশাসক এবং বিভাগীয় কমিশনাররা উপস্থিত ছিলেন।-ডেস্ক