(দিনাজপুর২৪.কম) শুরু করা যাক জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনে একজন মহিলা এমপি সাবিনা আক্তার তুহিনের কথা দিয়ে। তিনি বলছিলেন, তার পুরুষ সহকর্মীরা নারী নেতৃত্বের ব্যাপারে সভায় ও সংসদে বড় বড় কথা বলেন। কিন্তু যখন দেখেনএই নারীদের কারণে প্রতিযোগিতায় পড়ে গেছেন তখনই তারা তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যান। তার ভাষায়, “এটাই বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা।”

মিজ আক্তার যুব মহিলা লীগের একজন নেত্রী। ঢাকা মহানগরের প্রেসিডেন্ট তিনি। ছাত্রাবস্থা থেকে রাজনীতি করে আসছেন। জেনারেল এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তার রাজনৈতিক জীবনের শুরু।এবারের নির্বাচনে ঢাকার একটি আসনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন চেয়েছিলেন তিনি। এই আসনে তার মতো আরো ১৬ জন মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছিলেন দল থেকে। তাদের মাত্র দু’জন নারী।

সাবিনা আক্তার তুহিন বলেন, “স্বপ্ন ছিল রাজনীতির মাঠে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করে জাতীয় সংসদে নির্বাচিত হয়ে আসা।” কিন্তু শেষ পর্যন্ত দল থেকে মনোনয়ন না পাওয়ায় তার সেই স্বপ্ন ভঙ্গ হয়েছে। তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম কী কারণে মনোনয়ন পাননি বলে তিনি মনে করছেন?

“নারীর জন্যে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হলো তিনি একজন নারী,” আক্ষেপের সুর ছিল তার কণ্ঠে, “প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চান নারীদের ক্ষমতায় নিয়ে আসতে। কিন্তু তার চারপাশে তো সবাই পুরুষ। রাজনীতি তো এই পুরুষতন্ত্রের কবল থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি।”

এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি থেকে যাদের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে তাদের মাত্র পাঁচ থেকে ছয় শতাংশ নারী। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের জোট থেকে ২০ জন এবং বিএনপির জোট থেকে ১৪ জন নারী প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।ছোটখাটো অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর নারী প্রার্থীর সংখ্যাও এর চেয়ে খুব একটা বেশি নয়। আগের জাতীয় নির্বাচনগুলোতেও নারী প্রার্থীর সংখ্যা ছিল কমবেশি এরকমই।

যুবলীগের নেত্রী সাবিনা আক্তার তুহিনের মতো বেশিরভাগ রাজনীতিকেরই হাতেখড়ি হয় ছাত্র রাজনীতির মধ্য দিয়ে। যেসব ছাত্র সংগঠন দিয়ে তাদের কেরিয়ারের সূচনা হয় সেখানেও প্রচুর নারী সদস্য থাকা সত্ত্বেও তাদের নেতৃত্বে উঠে আসা বিরল ঘটনা।তাদেরই একজন শিরীন আখতার। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদের ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের মধ্য দিয়ে তার রাজনৈতিক জীবনের শুরু। বর্তমানে জাতীয় সংসদের একজন এমপি এবং জাসদের সাধারণ সম্পাদক। তার গল্পটা ব্যতিক্রম। তিনিও বলছিলেন, পুরুষতান্ত্রিকতার বাধা ডিঙ্গিয়ে তাকে এই পর্যায়ে আসতে হয়েছে।

আশির দশকের শুরুতে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সভাপতি হয়েছিলেন শিরীন আখতার। তিনি বলেন, প্রথমবার তিনি যখন সাধারণ সম্পাদক হতে চেয়েছিলেন তখনও নারী নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।”আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে নারী নেতৃত্বকে সামনে নিয়ে আসা হবে। কিন্তু কাউন্সিলে গিয়ে দেখলাম সবাই একেবারে উল্টো কথাটা বলছে। আগের দিন তারা যা বলেছিল সেরকম বলছে না। তার পরের বছর যখন সভাপতি হতে চাইলাম তখনও সারা দেশ থেকে আসা কর্মীরা সেই একই প্রশ্ন তুললো- ছাত্রলীগের মতো একটি সংগঠনকে কিভাবে একজন নারী পরিচালনা করবে!” বলেন তিনি।

শিরীন আখতার বলেন, সেসময়ে তার আশেপাশে আরো যেসব নারী ছিলেন তারাও কোন এক সময়ে রাজনীতি থেকে ঝড়ে পড়েছে। “তখন মাত্র এক ঘণ্টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নারীদের দুটো হল থেকে পাঁচশোর মতো মেয়ে মিছিলে চলে আসতো। কিন্তু তাদের কাউকে আমি এখন আর রাজনীতিতে দেখতে পাই না।”

ছাত্র রাজনীতিতে যেমন বহু নারী সক্রিয় থাকেন, তেমনি ইউনিয়ন এবং উপজেলা পরিষদের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও সংরক্ষিত ও সরাসরি ভোটে অনেক নারীকে অংশ নিতে দেখা যায়। কিন্তু এর পরে জাতীয় নির্বাচনে এই নারীদেরকেই আর চোখে পড়ে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ওমেন এন্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষক, সমাজ বিজ্ঞানী ড. সানজিদা আখতার বলছেন, বৃহত্তর পর্যায়ে নারীরা পুরুষদের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারে না।”নারীবান্ধব তো কতো কিছু হচ্ছে। এখন নারীবান্ধব রাজনীতির বিষয়টাও ভাববার বিষয়। যে পুরুষ চরিত্র দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতি পরিচালিত হয়, তার মধ্যে নারীরা নিজেদের জায়গা করে নিতে পারে না,” বলেন তিনি।

তিনি বলেন, “দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে রাজনৈতিক দলগুলোর মাইন্ডসেট তৈরি হয়। বিশেষ করে যখন ভোটের সময় আসে, নমিনেশন দেওয়ার বিষয় আসে, তখন যে রাজনৈতিক দলই হোক না কেন, তারা তাকেই নমিনেশন দেবে যার জিতে আসার সম্ভাবনা নিশ্চিত।”

যুব মহিলা লীগের নেত্রী সাবিনা আক্তার তুহিনও বলেছেন একই কথা। তার মতে, “প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন স্থানে নারীদের বসিয়েছেন। একজন নারীকে তিনি সংসদের স্পিকারও বানিয়েছেন। কিন্তু তার চারপাশে সবাই পুরুষ। একটা জায়গায় গিয়ে তারা নারীর ক্ষমতায়ন মেনে নিতে পারেন না, প্রধানমন্ত্রী একা চাইলে হবে না। চারপাশে এখনও পুরুষদের শাসন।”

ইয়ের দশকের শুরু থেকে গত প্রায় তিন দশক ধরে দেশের নেতৃত্বে রয়েছেন শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া। তারাই বারবার নির্বাচিত হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। জাতীয় সংসদের স্পিকারও একজন নারী। তারপরেও এই দুটো দল থেকে আরো বেশি সংখ্যক নারীকে মনোনয়ন দেওয়া হচ্ছে না কেন?

শিরীন আখতার মনে করেন, নির্বাচনের মাঠে নারীদের হারিয়ে যাওয়ার বড় কারণ নারীর প্রতি রাজনৈতিক দলের দৃষ্টিভঙ্গি।”নারীদেরকে দলের ভেতর থেকেই প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়তে হয়। দেখা গেল একই নির্বাচনী এলাকায় একজন নারী কাজ করছেন, আবার একজন পুরুষও কাজ করছেন। সেখানে পুরুষের অগ্রাধিকার তার বিভিন্ন সুবিধার কারণেই। তবে ওই নারী যদি প্রভাবশালী কোন পুরুষের স্ত্রী বা কন্যা হন, তখন আবার তার আরেক ধরনের সুবিধা হয়।”

এবারে নির্বাচনে যে সামান্য কয়েকজন নারী মনোনয়ন পেয়েছেন তাদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ তাদের পিতা, স্বামী কিংবা পরিবারের সূত্রে পেয়েছেন।কিন্তু শিরীন আখতারের এই কথার সাথে একমত নন বিএনপির একজন নেত্রী, সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ। টেলিভিশনের টকশোর কারণে বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন তিনি। তার পিতা কে এম ওবায়দুর রহমানও ছিলেন একজন প্রভাবশালী রাজনীতিক।তিনি বলছেন, নারীরা যে শুধু পিতা বা স্বামীর পরিচয়ে সামনে আসছেন তা নয়, তাদের নিজেদেরকেও রাজনীতির মাঠ তৈরি করে নিতে হয়।

“পারিবারিক সূত্রে অনেকে রাজনীতিতে আসেন। কিন্তু নিজের অবস্থান ধরে রাখতে হলে সেটা রাজনৈতিক যোগ্যতা থেকে করতে হবে। আমার বাবা মারা গেছেন ১২ বছর আগে। তারপর থেকে এই নির্বাচনী এলাকা আমি ধরে রেখেছি। আওয়ামী লীগ, বিএনপি বা যেকোনো দল যখন নমিনেশন দেবে তখন তারা যোগ্য ব্যক্তিকেই দেবেন,” বলেন তিনি।

তৃনমূলের নারীদেরকে রাজনৈতিক নেতৃত্বে আসতে দেওয়া হয় না- এই অভিযোগের সঙ্গে একমত নন এইচ টি ইমাম। আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটিতে শেখ হাসিনার পরেই তিনি।মি: ইমাম বলেন, “আসতে দেওয়া হয় না কথাটা ঠিক না। কাঠামোটাই এমন। ইউনিয়ন পর্যায় থেকে উপরে ওঠে আসা খুব কঠিন। তবে উপজেলা পর্যায়ে এলে তাদের অনেকে প্রার্থী হন। তার পেছনে শিক্ষাগত যোগ্যতা, সাংগঠনিক ক্ষমতা, পারিবারিক ঐতিহ্য এসব বিষয়ও কাজ করে।”

নারী নেত্রীরা বলছেন, এসব যোগ্যতা থাকার পরেও, পুরুষ প্রার্থীদের তুলনায় তাদেরকে আরো বেশি পরীক্ষা দিতে হয়। মনোনয়ন চেয়ে ব্যর্থ সাবিনা আক্তার তুহিন মনে করেন, প্রার্থীদের পেশী শক্তি, অর্থ- এসবই নারীর বিপক্ষে কাজ করে। এবং এই সঙ্কট বাংলাদেশের বামপন্থী থেকে দক্ষিণপন্থী প্রায় সবকটি রাজনৈতিক দলেই আছে।

মিজ আক্তার বলেন, “আমাদেরকে বলা হয় যে নারীরা এলাকায় ভোট ধরে রাখতে পারবে না। আরেকটা হলো গায়ের জোর কম। নারীর ক্ষেত্রে অনেক যোগ্যতা চাওয়া হয়। কিন্তু পুরুষের বেলায় সেটা অনেক শিথিল। কোন এলাকায় প্রার্থী হতে চাইলে কোন একজন পুরুষ যদি ২০ শতাংশ যোগ্য হয়, নারীকে হতে হয় ১০০ শতাংশ।”

বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ মনে করেন, এজন্যে দায়ী রাজনৈতিক দলের মানসিকতা বা মাইন্ডসেট।”গত কাউন্সিলের পর আমাদের দলে অনেক নারী নেতৃত্ব আছেন। কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণের কোন একটা পর্যায়ে গিয়ে নারীরা বাধাপ্রাপ্ত হয়। আরেকটা বড় ব্যাপার হলো- বাংলাদেশের রাজনীতি ও নির্বাচনে প্রচুর সহিংসতা হচ্ছে, সংঘর্ষ হচ্ছে। এ কারণে যেখানে পুরুষরাই নিরাপদ নয়, সেখানে নারীরা কিভাবে নিরাপদ বোধ করবে,” প্রশ্ন করেন তিনি।

এবারের নির্বাচনে মোট ভোটারের সংখ্যা সাড়ে দশ কোটির মতো যার মধ্যে নারী ও পুরুষের সংখ্যা প্রায় সমান। পুরুষ ভোটারের সংখ্যা মাত্র ১০ লাখের মতো বেশি। তারপরেও রাজনৈতিক দলগুলোতে নারী প্রার্থীর সংখ্যা এতো কম কেন- জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কো-চেয়ারম্যান এইচ টি ইমাম বলেন, নির্বাচনে জেতার লক্ষ্য থেকে প্রার্থী বাছাই করা হয়। তখন বাদ পড়ে যান নারীরা।

তিনি বলেন, “এবার নির্বাচনের চেহারাটা তো পাল্টে গেছে। সবগুলো দল এসেছে। প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। সেকারণে শুধু মহিলা হলেই হবে না, তিনি জিতে আসতে পারবেন কীনা এরকম শক্তিশালী প্রার্থীকেই মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। এরকম নারী প্রার্থী আমরা খুব বেশি পাইনি।”

মি. ইমাম বলেন, “এবারের লড়াই তো অনেক কঠিন হবে। দুই দফার পর তৃতীয় দফায় ফিরে আসা। সেগুলো চিন্তাভাবনা করে সরাসরি যারা জিতে আসবেন তাদেরকে দেওয়া হয়েছে। আমাদেরকে তো মেজরিটি (সংখ্যাগরিষ্ঠতা) পেতে হবে। আর সেটা পাওয়ার জন্যে শক্তিশালী প্রার্থীদেরকেই বেছে নিতে হয়েছে।”

রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধন পেতে হলে দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে ২০২০ সালের মধ্যে এক তৃতীয়াংশ নারী সদস্য থাকার শর্ত দিয়েছে নির্বাচন কমিশন।রাজনৈতিক দলগুলোতে এখন অনেক নারীই হয়তো আছেন কিন্তু তার তুলনায় নারী প্রার্থীর সংখ্যা খুবই কম। কারণ হিসেবে রাজনীতিবিদরা বলছেন, রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা আর নির্বাচনের মাঠে জিতে আসা দুটো দুই জিনিস।

সমাজ বিজ্ঞানী ড. সানজিদা আখতার বলছেন, রাজনৈতিক দলগুলো যদি উদ্যোগ নেয় তাহলে নারীদের সংখ্যা বাড়বে।”নারীরা রাজনীতিতে আসতে পারছে না তার অর্থ এই নয় যে তারা আগ্রহী নয়। রাজনীতিতে তাদেরও এখন কিছু বলার আছে। বর্তমান প্রজন্মের নারীরা রাজনীতির ব্যাপারে অনেক বেশি আগ্রহী। টেলিভিশন খুললেও এটা চোখে পড়ে।” সূত্র : বিবিসি বাংলা -ডেস্ক