(দিনাজপুর২৪.কম) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, নির্বাচন ঠেকানোর মতো শক্তি কারো নেই। নির্বাচন হবেই। কেউ ঠেকাতে পারবে না। যারা ঠেকাতে চেয়েছিল, তাদের আগেরবার যেমন জনগণ মোকাবিলা করেছিল, এবারো মোকাবিলা করবে। ষড়যন্ত্র আছে, ষড়যন্ত্র থাকবে, জনগণ সব ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করবে। কারো হুমকিতে ঘরে বসে থাকলে চলবে না, কাজ করতে হবে। যতক্ষণ সাহস আছে ততক্ষণ মানুষের জন্য কাজ করে যাবো। গতকাল রোববার বিকালে গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। নেপালে অনুষ্ঠিত বিমসটেক সম্মেলনে অংশগ্রহণ নিয়ে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। বিমসটেক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেয়া ভাষণে তিনি মুক্ত-বাণিজ্য অঞ্চল সৃষ্টি, বিনিয়োগ ও জ্বালানি খাতে যৌথ প্রচেষ্টা, জনগণের মধ্যে যোগাযোগ ও অর্থায়ন প্রক্রিয়া গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির সঙ্গে সংলাপ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপির সঙ্গে আলোচনায় বসার প্রশ্নই ওঠে না। খালেদা জিয়ার ছেলে মারা যাওয়ার পর যখন বাসায় দেখতে গেলাম, তারা আমার মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিলো, ভেতরে ঢুকতে দিলো না। সেই দিনই আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি, আর তাদের সঙ্গে আমি বসবো না, কোনো আলোচনা হবে না। আপনারা যে যা-ই বলেন না কেন, ক্ষমতায় থাকি আর না থাকি, তাতে কিছুই আসে যায় না। আমার একটা আত্মসম্মানবোধ আছে। খালেদা জিয়ার মুক্তি ছাড়া বিএনপি নির্বাচনে যাবে না বিএনপি নেতাদের এমন বক্তব্যের সমালোচনা করে শেখ হাসিনা বলেন, বিএনপির এত নামিদামি আইনজীবী, ব্যারিস্টার অমুক-তমুক রয়েছে। তারা কেন পারলো না প্রমাণ করতে যে খালেদা জিয়া নির্দোষ, তারা এতিমের টাকা নেয়নি। তাহলে এখানে আমাদের দোষ দিয়ে লাভটা কী। তাদের নেত্রী কারাগারে বন্দি হয়ে আছে, তাদের আন্দোলন কই? তারা আন্দোলন করে মুক্ত করুক। খালেদার মুক্তি প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, খালেদা জিয়াকে তো আমি গ্রেপ্তার করিনি। গ্রেপ্তার হয়েছে এতিমের টাকা চুরি করে। তাদের আমলে দুর্নীতি, ঘুষ নেয়ার অনেক ঘটনা ঘটেছে। তিনি (খালেদা জিয়া) যদি মুক্তি চান, কোর্টের মাধ্যমে আসতে হবে। দ্রুত চাইলে রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। মামলা আমাদের সরকারের দেয়া নয়। তাদের পছন্দের ইয়াজউদ্দিন, ফখরুদ্দীন সাহেবের আমলে দেয়া। তিনি বলেন, খালেদা জিয়া আমাদের বিরুদ্ধে প্রায় এক ডজন মামলা দিয়েছিল। আমার একটা মামলাও কিন্তু তোলে নাই। সবগুলো তদন্ত করে রিপোর্ট দিতে হবে বলে আমি বলেছিলাম। সেগুলো প্রমাণ করতে পারে নাই। তিনি বলেন, বিএনপি হুঙ্কার দিচ্ছে নির্বাচন করবে না। সেটা তাদের দলের ওপর নির্ভর করবে, এটা তাদের দলের সিদ্ধান্ত। আমাদের কি করার আছে? বিএনপি যদি মনে করে নির্বাচন করবে না, তাহলে করবে না। এখানে তো আমাদের বাধা দেয়ারও কিছু নেই বা দাওয়াত দেয়ার কিছু নেই, এটাই পরিষ্কার কথা।গণমাধ্যমে বিএনপি বেশি সুবিধা পাচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গণমাধ্যমে আওয়ামী লীগের তুলনায় বিএনপি বেশি সুবিধা পেয়ে থাকে। বিএনপি তো গণমাধ্যমের খবরে অগ্রাধিকার পায়। তারা পার্লামেন্টে নাই, বৈধ বিরোধী দল না। আমাদের এখানে মিডিয়ার কাছে তারা অগ্রাধিকার পাচ্ছে। আমার জায়গা হয় তিন চার পাঁচে এসে ঠেকি।বাংলাদেশ নিয়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ডেল্টা প্ল্যান ২১০০-এর মাধ্যমে বাংলাদেশ ১০০ বছরে কোন পর্যায়ে যাবে সেই পরিকল্পনা চলছে। ২০২১ সাল থেকে ২০৪১ সাল থেকে কী করবো, তার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা দিয়ে যাচ্ছি। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে। জনগণ ভোট দিলে আছি, না দিলে নেই। শেখ হাসিনা বলেন, ২১০০ সালে বাংলাদেশকে কীভাবে দেখতে চাই, বদ্বীপকে বাঁচিয়ে রাখা, জলবায়ু পরিবর্তনসহ অন্যান্য অভিঘাত থেকে বাঁচাতে এই প্ল্যান। দেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতেই ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ বাস্তবায়ন হাতে নেয়া হচ্ছে। এ নিয়ে কাজ চলছে। জাতির জনকের স্বপ্ন বাস্তবায়নই আমার ইচ্ছা। আর কিছু চাই না তো।এক-এগারোর কারাবন্দি সময়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, সে সময়ের সেই টুকরো টুকরো ভাবনাগুলোই পরে ‘দিনবদলের সনদ’ হিসেবে আপনাদের সামনে হাজির করেছি। দিনবদলের সনদ চলছে। কাজ চলছে। তা অব্যাহত থাকবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের আস্থা আছে নৌকার ওপর। তারা আবার নৌকায় ভোট দিবে। জনগণ ষড়যন্ত্রকারীদের মোকাবিলা করতে পারবে। ১০ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকায় উন্নয়ন এখন দৃশ্যমান, জনগণ সুফল ভোগ করছে। আমরা পারি, তা দেখিয়ে দিয়েছি।সম্প্রতি মিয়ানমারে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ছবি বিকৃতির ঘটনা নজরে আনলে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, মিয়ানমার মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যার ছবি নিয়ে জঘন্য কাজ করেছে। এতে দেশটি আন্তর্জাতিক বিশ্বে তাদের ভাবমূর্তি নষ্ট করেছে। তিনি বলেন, মিয়ানমার ছবি নিয়ে যা করলো আমাদের দেশেও এ ঘটনা ঘটেছে। ছবি নিয়ে তেলেসমাতি কারবার। ২০১৩, ১৪ ও ১৫ সালে বিএনপি-জামায়াতও এমন অপপ্রচার চালিয়েছে। এটা এরা (মিয়ানমার) শিখলো কার কাছ থেকে। বিএনপি-জামায়াতের কাছ থেকে কি ছবি বিকৃতি শিখেছে মিয়ানমার?শেখ হাসিনা বলেন, আমরা চাই না প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সংঘাত। ১১ লাখ রোহিঙ্গা এ দেশে আছে। আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিকভাবে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তারা বলেছেন আমাদের সঙ্গে যে চুক্তি হয়েছে, সে অনুসারে তারা রোহিঙ্গাদের নিয়ে যাবেন। কিন্তু তারা যা বলে তা করে না। তাদের ফেরত নিতে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।নির্বাচনকালীন সরকারের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, উচ্চ আদালত এ বিষয়ে একটি রায় দিয়েছে। যদি সরকার মনে করে এ সুযোগ পরপর দুবার নিতে পারে। তবে সংসদ সে সুযোগ নেয়নি। একটা সরকার থেকে আরেকটা সরকারে যে ট্রানজিশনাল সময় এ সময়ে যেন কোনো ফাঁক না থাকে সেজন্য এটা করা। এ বিষয়ে আমি ভারত ও নেপাল সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেছি। বিশ্বের প্রত্যেকটা দেশে এ ব্যবস্থা আছে। ইভিএম নিয়ে বিএনপির বিরোধিতা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আগামী নির্বাচনে ভোট কারচুপি করতে পারবে না বলেই বিএনপি ইভিএমের বিরোধিতা করছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তুলবো এটা আমাদের ঘোষণা ছিল। এটা তারই একটা অংশ। নির্বাচনকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহি করার লক্ষে ছবিসহ ভোটার তালিকা করা হয়েছে। আমরা চেয়েছি মানুষের ভোটের অধিকার মানুষের হাতে থাকুক। ইভিএম নতুন প্রযুক্তি। এটার বিরুদ্ধে বিএনপি খুব বেশি সোচ্চার। কারণ ভোটের রাজনীতিতে কারচুপি করা এটা বাংলাদেশে প্রথম নিয়ে এসেছে জিয়াউর রহমান। আজকে বিএনপি যখন সুষ্ঠু নির্বাচনের কথা বলে তখন তাদের বলতে হয় তারা জন্মস্থান থেকে খোঁজ করুক তাদের জন্ম কোন বৈধভাবে হয়েছে। দুইটা সিল মেরে হাতে নিয়ে টাকা পায় এভাবে বহু নির্বাচনে কারচুপি তারা করেছে। ইভিএম হলে তো ওই কারচুপি থাকবে না। একটার জায়গায় দুইটা তিনটা করতে পারবে না। সিল মেরে ব্যালট বাক্স ভরতে পারবে না। সে জন্যেই তারা আপত্তি জানাচ্ছে। তিনি বলেন, ইভিএম নিয়ে আসার জন্য আমিই পক্ষে ছিলাম। এখনো পক্ষে আছি। তবে হ্যাঁ, তাড়াহুড়ো করে ইভিএম চাপিয়ে দেয়া যাবে না। আমরা বলছি কিছু কিছু জায়গায় শুরু হোক। আস্তে আস্তে এটা দেখুক। প্রযুক্তিতে কোনো সিস্টেম লস হয় কিনা সেটা পরীক্ষা করে দেখা হোক। যদি এমন হয় তাহলে বাতিল করা যাবে। এটা এমন না ইভিএমই শেষ কথা। বিমসটেক সম্মেলনে যোগদান প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সোনার বাংলা বাস্তবায়নে আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমে বাংলাদেশের উন্নয়নের যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই অনুপ্রেরণা থেকেই বিমসটেকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ফোরামে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আমি আশা করি, আমাদের এ অগ্রযাত্রায় দেশের জনগণ ও গণমাধ্যম আমাদের পাশে থাকবে। তিনি বলেন, আমাদের লক্ষ্য আর্থসামাজিক উন্নয়ন। আমরা যেন নেপাল-ভুটানের জলবিদ্যুৎ যৌথ উদ্যোগে ব্যবহার করতে পারি সে বিষয় নিয়ে কথা বলেছি। নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে অনুষ্ঠিত ৪র্থ ‘বে অব বেঙ্গল ইনেসিয়েটিভ ফর মাল্টি সেক্টরাল টেকনিক্যাল এন্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন’ (বিমসটেক) সম্মেলনে যোগ দিতে গত বৃহস্পতিবার নেপাল যান প্রধানমন্ত্রী। সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন তিনি। এ সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গেও বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। বিমসটেক সম্মেলন শেষে শুক্রবার ঢাকায় ফেরেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। -ডেস্ক