(দিনাজপুর২৪.কম) ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষবর্ধন শ্রিংলাকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, নয়া দিল্লির স্বার্থের কোনো ধরনের ক্ষতি হোক এমন কিছুর অংশ (পার্টি) হবে না ঢাকা। একই সঙ্গে ভারতকে টার্গেট করা কোনো উগ্রপন্থি বা সন্ত্রাসীদেরকে বাংলাদেশের ভূখন্ড ব্যবহার করতে দেয়া হবে না। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে হর্ষবর্ধন শ্রিংলার বৈঠক সম্পর্কে জানেন এমন একটি সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে এ কথা লিখেছে ভারতের প্রভাবশালী পত্রিকা অনলাইন হিন্দুস্তান টাইমস। এ ছাড়া ভারতের প্রায় সব পত্রিকাই শ্রিংলার ঢাকা সফর নিয়ে গুরুত্ব দিয়ে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারতের প্রকৃত বন্ধু হিসেবে উল্লেখ করেছে অনলাইন আউটলুক ইন্ডিয়া। চীনের প্রভাব বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে শ্রিংলার এই সফর নিয়ে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে ডেকান ক্রনিকল।
হিন্দুস্তান টাইমস ঢাকা ও নয়া দিল্লির কূটনীতিকদের উদ্ধৃত করে লিখেছে, সময়মতো দ্বিপক্ষীয় অবকাঠামো এবং কানেক্টিভিটি বিষয়ক প্রকল্পগুলো সম্পন্ন করার ওপর বৈঠকে গুরুত্ব দিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। সিদ্ধান্ত হয়েছে, প্রজেক্টগুলো মনিটরিং করতে উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করা হবে।

তাতে নেতৃত্বে থাকবেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাই কমিশনার এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব। এমন কমিটি অবিলম্বে গঠন করা হবে। দ্বিপক্ষীয় প্রকল্পগুলো যাতে দ্রুতগতিতে শেষ করা যায় সে জন্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে জয়েন্ট কনসালটেটিভ কমিশনের মিটিংয়ের শিডিউল দেয়া হবে শিগগিরই। বাংলাদেশ যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশত বার্ষিকী পালন করছে তখন ভারত ও বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সুবর্ণজয়ন্তী। এ সময়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে শ্রিংলার মিটিং হয়েছে ৯০ মিনিট বা দেড় ঘন্টা। তিনি শেখ হাসিনাকে জানিয়েছেন, স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক শক্তিশালী করার বিষয়ে কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
হিন্দুস্তান টাইমস আরো লিখেছে, ভারত যে এখনও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর এজেন্ডার শীর্ষে আছে তার প্রমাণ মেলে যখন চার মাস আগে করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরুর পর বিদেশি প্রথম অতিথি হিসেবে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব শ্রিংলার সঙ্গে তিনি সাক্ষাত করলেন। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এই বৈঠক ছিল উষ্ণ। এতে শ্রিংলা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ভারতে কোভিড-১৯ এর টিকা নিয়ে যেসব কাজ হচ্ছে সে সম্পর্কে জানিয়েছেন এবং তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, যেহেতু বিশ্বে এই টিকার শতকরা ৬০ ভাগ উৎপাদন করছে ভারত, তাই ঢাকার চাহিদাকে তারা নিশ্চিত করতে চান। এ ছাড়া নয়া দিল্লি ও ঢাকার মধ্যে মেডিকেল, টেকনিক্যাল ও ব্যবসায়ী পেশাদারদের আকাশপথে সামনের দিনগুলোতে যাতায়াতের অনুমতি দেয়া নিয়ে তাদের কথা হয়েছে। হিন্দুস্তান টাইমস  লিখেছে, সিনিয়র মন্ত্রী সহ বাংলাদেশের সেনাবাহিনী প্রধান ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গেও ভিডিও কনফারেন্সে কথা বলেছেন শ্রিংলা।
ওদিকে শ্রিংলার সঙ্গে বৈঠকে শেখ হাসিনা রোহিঙ্গা ইস্যু উত্থাপন করেছেন এবং অনুরোধ করেছেন, বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে যেন ভারত সহায়তা দেয়। সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, এ সময় তিনি স্পষ্ট করে বলেন, বাংলাদেশের ভূখন্ড কোনো সন্ত্রাসী বা উগ্রপন্থিদের ব্যবহার করতে দেবেন না । এ ছাড়া আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে তারা আলোচনা করেছেন। ভারত ও বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিরোধী শক্তিগুলোর বৃদ্ধি সম্পর্কেও আলোচনা হয়েছে।
আউটলুক ইন্ডিয়ার শুরুতেই বলা হয়েছে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের প্রকৃত বন্ধুই আছেন। তিনি ক্ষমতায় আসার পর থেকে নয়া দিল্লির নিরাপত্তা ও কৌশলগত উদ্বেগের বিষয়ে সেনসিটিভ রয়েছেন। এর চেয়ে ভাল প্রতিবেশী ভারত আশা করতে পারে না। এই পত্রিকার রিপোর্টে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার উদারতায় আসামে সহিংসতা ও সন্ত্রাস কমে এসেছে। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পরই তার সরকারের প্রথম অন্যতম কাজ ছিল বাংলাদেশের ভিতর অবস্থান করে ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অব আসাম বা উলফা ভারত বিরোধী কর্মকান্ড যারা করছিলেন, সেইসব নেতাকে ভারতের হাতে তুলে দিয়েছেন। এর আগে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিদ্রোহী গ্রুপগুলো সহজেই সীমান্ত গলিয়ে বাংলাদেশে চলে আসতো। এ জন্য ভারতীয় নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো তাদেরকে ধরতে পারতো না। কিন্তু শেখ হাসিনার সরকার আগের সরকারগুলোর মতো না হয়ে বিদ্রোহীদের সব শিবির ভেঙে দিয়েছেন। তিনি এটা নিশ্চিত করেছেন, ভারত বিরোধী শক্তিকে স্বাগত জানানো হবে না। পাকিস্তানের ইন্টার সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স (আইএসআই)-এর উপস্থিতি বাংলাদেশে কমিয়ে আনা হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে এখানে পাখা বিস্তার করছে চীন। আক্ষরিক অর্থে ভারতের ব্যাকইয়ার্ডে এভাবে ক্ষমতার বিস্তার করছে চীন। সম্পর্ক নতুন করে মেরামত করতে শেখ হাসিনাকে এরই মধ্যে ফোন করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। চীন এবং পাকিস্তানের জন্য যে সুবিধা দেয়া হয়েছে তা হলো ক্ষমতাসীন দলের আভ্যন্তরীণ এজেন্ডা।
এই পত্রিকাটি আরো লিখেছে, বাংলাদেশে চীন তার স্বার্থ ক্রমাগত বৃদ্ধি করছে এমন ভয়ে তড়িঘড়ি করে ঢাকা ছুটে এসেছেন পররাষ্ট্র সচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা। এর আগে বাংলাদেশ থেকে শতকরা ৯৭ ভাগ রপ্তানিতে শুল্ক ছাড় দিয়েছে। মহামারিকালে, বাংলাদেশ সরকারকে সহায়তা করতে একটি মেডিকেল টিম পাঠিয়েছিল চীন। অন্যদিকে করোনার একটি টিকার পরীক্ষা মানবদেহের ওপর চালাতে চীনা একটি কোম্পানিকে অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ। এসব বিষয় তীক্ষ্ণভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে নয়া দিল্লি। কিন্তু তিস্তা নদী বিষয়ক একটি প্রকল্পে যখন প্রায় ১০০ কোটি ডলার ঋণ দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে চীন তখনই এলার্ম বেল বেজে উঠেছে। কঠোরভাবে, তিস্তা নদীর পানি বন্টন নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে রয়েছে বড় সব সমস্যা। সাবেক ইউপিএ শাসনের সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ২০১১ সালে ঢাকা সফর করেন। তখন একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। কিন্তু তাতে সম্মতি দেন নি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। ফলে কোনো চুক্তিই চূড়ান্ত রূপ পায় নি।
এমন অবস্থায় ভারতের পররাষ্ট্র সচিব মঙ্গলবার ঢাকা উড়ে আসেন এবং বুধবার বিকেলে সাক্ষাত করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে। তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একটি বার্তা বহন করে নিয়েছেন। উল্লেখ্য, ওয়াশিংটনে দায়িত্ব দিয়ে পাঠানোর আগে বাংলাদেশে ভারতের হাই কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা। পরে তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ফিরেছেন। তিনি বাংলাদেশকে ভালভাবে জানেন এবং ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের শীর্ষ স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে তার রয়েছে সম্পর্কের এক চমৎকার সমীকরণ। এই রিপোর্টে বাংলাদেশ কোনো কোন ইস্যুতে মনোক্ষুন্ন হয়ে থাকতে পারে সে প্রসঙ্গও তুলে ধরা হয়েছে। ভারতীয় সংবিধান থেকে ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করে কাশ্মীরে দমনপীড়নের প্রতিবাদ হাসিনার সরকার না জানালেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বাংলাদেশি অভিবাসীদের ‘টার্মাইটস’ বা উইপোকা বলে আখ্যায়িত করায় , আসামে নাগরিকপঞ্জী করা এবং নাগরিকত্ব সংশোধন আইন করা নিয়ে বড় উদ্বেগ জানিয়েছে।
ডেকান হেরাল্ড লিখেছে, কোভিড-১৯ এর কারণে এর সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকে বিদেশি কারো সঙ্গে সাক্ষাত করেন নি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেখানে তার সঙ্গে শ্রিংলার এই সফর বড় বার্তাবহ। -ডেস্ক