(দিনাজপুর২৪.কম) কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠের প্রবেশপথে সন্ত্রাসী হামলায় পুলিশের গুলিতে নিহত জঙ্গির পরিচয় মিলেছে। তার নাম আবির রহমান। ২৩ বছর বয়সী এই তরুণ গত পহেলা মার্চ থেকে নিখোঁজ ছিল। এ ব্যাপারে তার বাবা সিরাজুল ইসলাম সরকার গত ৬ই জুলাই ঢাকার ভাটারা থানায় জিডি (নং- ২৯৪) করেছেন। নিহত সন্ত্রাসী আবির রহমানের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লা জেলার দেবিদ্বার থানার ত্রিবিদ্যা গ্রামে। গুলশান হামলার পর নিখোঁজ ছেলে আবির রহমানের খোঁজ চেয়ে রাজধানীর ভাটারা থানায় সিরাজুল ইসলাম সরকার জিডিটি করেন। জিডিতে উল্লেখ করা হয়, রাজধানীর বসুন্ধরা এলাকার বাসা থেকে গত পহেলা মার্চ আনুমানিক বেলা ৩টার দিকে বেরিয়ে যাওয়ার পর তার ছেলে আবির রহমান নিখোঁজ হয়। বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুজি করেও তার কোন খোঁজ মিলেনি। কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. আনোয়ার হোসেন খাঁন পিপিএম নিহত সন্ত্রাসীর পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার খবরটি নিশ্চিত করেছেন। বৃহস্পতিবার শোলাকিয়ায় উপমহাদেশের বৃহত্তম ঈদ জামাত শুরু হওয়ার আগে সকাল সাড়ে আটটার কিছু পরে মুসল্লিবেশে শোলাকিয়া ঈদগাহে যাওয়ার পথে আজিমউদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন পুলিশ চেকপোস্টে দেহতল্লাশীর সময় একদল সন্ত্রাসী বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ও চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে দায়িত্বরত ১১ পুলিশ সদস্যকে আহত করে। হামলাকারীরা অসম্ভব ক্ষিপ্রতার সঙ্গে পুলিশের ওপর এই হামলা চালায়। তারা বোমা নিক্ষেপের সঙ্গে সঙ্গে চাপাতি নিয়ে পুলিশের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এলোপাতাড়ি কুপিয়ে তারা পুলিশ সদস্যদের জখম করে। এ সময় আহত পুলিশ সদস্যরা আত্মরক্ষার্থে আশপাশের বিভিন্ন জায়গায় ছোটাছুটি করে। তাদের মধ্যে কনস্টেবল জহিরুল ইসলাম তপু (৩০) চেকপোস্ট সংলগ্ন মুফতি মোহাম্মদ আলী (রহ.) জামে মসজিদের সড়কের উপর অবস্থিত টয়লেটে আশ্রয় নেয়ার চেষ্টা করলে সেখানেই তাকে চাপাতি দিয়ে কোপায় হামলাকারীরা। পরে অতিরিক্ত পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে হামলাকারীদের ধাওয়া করলে তারা সবুজবাগ এলাকার বাসাবাড়িতে অবস্থান নেয়। এ সময় পুলিশ গুলি চালালে তারাও দ্রুততার সঙ্গে পাল্টা গুলি ছোঁড়ে। পুলিশের সঙ্গে সন্ত্রাসীদের এই গুলি বিনিময়ের সময় পুলিশের গুলিতে এক সন্ত্রাসী ঘটনাস্থলেই মারা যায়। সে সময় তার পরিচয় জানা যায়নি। নিহত সন্ত্রাসীর নাম আবির রহমান এটি শুক্রবার দুপুরে জেলা পুলিশ নিশ্চিত হয়। এছাড়া আহত পুলিশ সদস্যদের উদ্ধার করে কিশোরগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে কনস্টেবল জহিরুল ইসলাম তপুর মৃত্যু হয়। অন্য আহতদের মধ্যে কনস্টেবল আনছারুল হক (২৮), রফিকুল, প্রশান্ত, তুষার, জুয়েল, মতিউর ও এএসআই মতিউরের অবস্থার অবনতি ঘটায় তাদের ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখান থেকে কনস্টেবল আনছারুল হককে ময়মনসিংহ সিএমএইচে নেয়ার পর সেখানে তার মৃত্যু হয়। নিহত দুই কনস্টেবলের মধ্যে কনস্টেবল (নং-১৪৭৬) জহিরুল ইসলাম তপু ময়মনসিংহ জেলার ফুলবাড়িয়া থানার ভাটিপাড়া বালাশর গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মজিদের ছেলে এবং কনস্টেবল (নং-১৪৩০) আনছারুল হক নেত্রকোনা জেলার মদন থানার দৌলতপুর গ্রামের সিদ্দিকুর রহমানের ছেলে। পুলিশের সঙ্গে সন্ত্রাসীদের প্রায় সাড়ে তিন ঘন্টা বন্দুকযুদ্ধ চলাকালে সবুজবাগ এলাকার ঝরণা রাণী ভৌমিক (৪৫) নামে এক গৃহবধূ গুলিবিদ্ধ হয়ে নিজ বাসাতেই মৃত্যুবরণ করেন। নিহত গৃহবধূ ঝরণা রাণী ভৌমিক এলাকার ব্যবসায়ী গৌরাঙ্গ চন্দ্র ভৌমিকের স্ত্রী। অন্যদিকে বন্দুকযুদ্ধ চলাকালে পুলিশ ও র‌্যাব অভিযান চালিয়ে হামলাকারী সন্দেহে তিনজনকে আটক করে। আটককৃতরা হলো, দিনাজপুর জেলার ঘোড়াঘাট থানার রাণীগঞ্জ বাজার এলাকার আবদুল হাই-এর ছেলে শরীফুল ইসলাম আবু মোকাতিল (২০), কিশোরগঞ্জ শহরের তারাপাশা এলাকার মো. আবদুস সাত্তারের ছেলে জাহিদুল হক (২৪) ও শহরের বয়লা এলাকার আবদুল হাই এর ছেলে আহসান উল্লাহ (২৫)। তাদের মধ্যে শরীফুল ইসলাম আবু মোকাতিল গুলিবিদ্ধ অবস্থায় র‌্যাবের হাতে আটক হয়। তাকে কিশোরগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর আশঙ্কাজনক অবস্থায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। বন্দুকযুদ্ধে নিহত সন্ত্রাসী আবির রহমানের কাছ থেকে একটি ধারালো চাপাতি ও একটি পিস্তল উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় পুলিশ সন্দেহভাজন আরো পাঁচজনসহ মোট সাতজনকে আটক করেছে।
পুলিশ সুপার মো. আনোয়ার হোসেন খান পিপিএম জানান, শোলাকিয়ায় হামলার ঘটনায় কিশোরগঞ্জ সদর মডেল থানায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। এছাড়া ঘটনাস্থল চরশোলাকিয়া সবুজবাগ এলাকায় পুলিশের তল্লাশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এদিকে শোলাকিয়ায় হামলার ঘটনার পর শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু, কিশোরগঞ্জ-৫ (বাজিতপুর-নিকলী) আসনের সংসদ সদস্য মো. আফজাল হোসেন, কিশোরগঞ্জ-৪ (ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম) আসনের সংসদ সদস্য প্রেসিডেন্টপুত্র রেজওয়ান আহাম্মদ তৌফিক ও কিশোরগঞ্জ-২ (কটিয়াদী-পাকুন্দিয়া) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মো. সোহরাব উদ্দিন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এ সময় তারা নিহত গৃহবধূ ঝরণা রাণী ভৌমিকের বাসভবনে গিয়ে শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানান। সেখানে শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু সাংবাদিকদের জানান, নিহত গৃহবধূর শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের জন্য তিনি এবং তার সঙ্গে আসা তিন সংসদ সদস্য এক লাখ টাকা অনুদান দিবেন। এ সময় তিনি সন্ত্রাসী হামলা প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রশংসা করে বলেন, জীবনবাজি রেখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সন্ত্রাসীদের প্রতিরোধ করে লাখ লাখ মুসল্লির অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠকে টার্গেট করে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার পরিকল্পনাকে নস্যাত করে দিয়েছেন। পাশাপাশি এলাকাবাসী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সন্ত্রাসীদের অবস্থান জানিয়ে তাদের প্রতিরোধ গড়তে সহযোগিতা করেছেন। গণমাধ্যমও ঈদ জামাতের আগে এই হামলার বিষয়টি প্রচার না করে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছে। এ সময় কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. আজিমুদ্দিন বিশ্বাস, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) তরফদার মো. আক্তার জামীল, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) এসএম মোস্তাইন হোসেন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। এদিকে শোলাকিয়া হামলায় নিহত চারজনের মধ্যে গৃহবধূ ঝরণা রাণী ভৌমিকের লাশ ময়নাতদন্ত শেষে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তারা বাসায় নিয়ে আসা হয়। পরে রাতেই স্থানীয় সাহাপাড়া শ্মশানে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়। এছাড়া সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে কিশোরগঞ্জ পুলিশ লাইনে নিহত পুলিশ কনস্টেবল জহিরুল ইসলাম তপুর নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। নামাজে জানাজায় ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি এসএম মাহফুজুল হক নূরুজ্জামান, ময়মনসিংহ রেঞ্জের ডিআইজি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন, ঢাকা রেঞ্জের অতিরিক্ত মাহবুবসহ পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও সদস্যরা অংশ নেন। পরে রাতেই নিহত জহিরুল ইসলাম তপুর মরদেহ ময়মনসিংহ জেলার ফুলবাড়িয়া থানার ভাটিপাড়া বালাশর গ্রামে দাফনের জন্য পাঠানোর পর রাত সাড়ে ১২টার দিকে গ্রামে দাফন সম্পন্ন হয়। এছাড়া নিহত অপর পুলিশ সদস্য আনছারুল হকের নামাজে জানাজা বৃহস্পতিবার বিকাল সাড়ে ৪টায় ময়মনসিংহ পুলিশ লাইন্স জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয়। নামাজে জানাজায় ময়মনসিংহের পুলিশ সুপার মঈনুল হক, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (দক্ষিণ) হারুণ অর রশিদ, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) নূরে আলম, নিহতের ছোটভাই আমিনুল হক, আত্মীয় নাজমুল হক ও পুলিশ সদস্যরা ছাড়াও বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ অংশ নেন। পরে রাত সাড়ে ৮টার দিকে নেত্রকোনা জেলার মদন থানার দৌলতপুর গ্রামে নিহত আনছারুল হকের দাফন সম্পন্ন হয়। এদিকে শোলাকিয়া হামলায় নিহত দুই পুলিশ সদস্যের পরিবারকে তাৎক্ষণিকভাবে এক লাখ টাকা করে অনুদান দিয়েছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক একেএম শহীদুল হক। কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. আনোয়ার হোসেন খান পিপিএম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। -সূত্র : ম.জমিন