দেশে করোনা শনাক্তের প্রায় সাড়ে পাঁচ মাস চলছে। এই সময়ে স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার ঝড় ওঠে। স্বাস্থ্য খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে বহু রদবদলের উদ্যোগ নেয় সরকার। এরই মধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. আসাদুল ইসলামকে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে, একই বিভাগের অতিরিক্ত সচিব এবং মিডিয়া সেলের প্রধান মো. হাবিবুর রহমান খানসহ কয়েকজনকে বদলি করা হয়েছে। পদত্যাগ করেছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদও। পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. আমিনুল হাসান এবং পরিচালক (পরিকল্পনা) ডা. ইকবাল কবিরকে করা হয় ওএসডি। পরিচালক প্রশাসনকে বদলি করা হয় স্বাস্থ্যের বিভাগীয় অফিসে। নতুন ডিজি নিয়োগের পর ২৮ জন কর্মকর্তাকে এক আদেশে দেশের বিভিন্ন স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে পদায়ন, বদলি ও সংযুক্ত করা হয়।

করোনা মহামারি শুরুর কিছু দিনের মধ্যেই দেশের স্বাস্থ্য খাতের বেহাল চিত্র একে একে বেরিয়ে আসে।

মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর এবং বিভিন্ন কর্মকর্তার নানা কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। একের পর এক অনিয়ম-দুর্নীতির তথ্য গণমাধ্যমে উঠে এলে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে সরকার। এর পরিপ্রেক্ষিতে নেয়া হয় রদবদলের পদক্ষেপ। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্বাস্থ্য খাতে যে অনিয়ম, দুর্নীতি, অসঙ্গতি রয়েছে বা চলছে তা দূর করতে মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরে আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। চিকিৎসক ও আমলাদের মধ্যে যে সমন্বয়হীনতা দেখা দিয়েছে তা দূর করতে হবে। শুধু সচিব বা মহাপরিচালক পরিবর্তন করেই এ সংকটের সমাধান হবে না।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, স্বাস্থ্যের এই রদবদলে কিছুই হবে না। এক-দুইটি পদে পরিবর্তন করে কাজ হবে না। স্ট্রাকচারাল পরিবর্তন না করলে কোনো সমস্যা মিটবে না। নতুন ডিজির চাকরির মেয়াদ আর ছয় মাস আছে। এই বিশেষজ্ঞ প্রশ্ন করে বলেন, তিনি এই সময় কী করতে পারবেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে। এটাই চ্যালেঞ্জ। দেখা যায়, অফিসগুলোতে বড় পদে রদবদল হলো। কিন্তু জুনিয়ররা বা তার নিচের পদের লোকগুলো ওখানে থাকলো। তখন সংশ্লিষ্ট বড় পদের ব্যক্তি কিছুই করতে পারেন না। কারণ ওদের সঙ্গে সিন্ডিকেটের একটা সম্পর্ক থাকে। এ জন্য হঠাৎ কাউকে বসিয়ে দিলে চ্যালেঞ্জে পড়তে হয়। তিনি আরো বলেন, স্বল্প সময়ের জন্য ডিসিদের মতো সচিব বা অতিরিক্ত সচিবদের জন্য ফিট লিস্ট করা প্রয়োজন। কারণ দেখা গেল একজন কাজ বুঝে ওঠার আগেই বদলি হয়ে যান। শুধু স্বাস্থ্য নয়, সব মন্ত্রণালয়ে। এই কাজ করতে হবে। উপযুক্ত ব্যক্তিকে উপযুক্ত অবস্থানে না বসালে এ অবস্থার পরিবর্তন হবে না। প্রশাসনের সবক্ষেত্রে উপযুক্ত লোক বসাতে হবে। এক্ষেত্রে হেলথ ক্যাডার সার্ভিস গঠন করা জরুরি। অর্থাৎ জুডিশিয়াল সার্ভিসের মতো করে হেলথ ক্যাডার সার্ভিস গঠন করতে হবে। এই ক্যাডারের লোককে প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি মন্ত্রী থেকে শুরু করে সর্বস্তরে যোগ্য ও উপযুক্ত ব্যক্তিকে দায়িত্ব দিতে হবে। ন্যাশনাল হেলথ কমিশন গঠন করারও পরামর্শ দেন এই বিশেষজ্ঞ।

এদিকে স্বাস্থ্যে সমালোচনা শুরু হয়েছিল চিকিৎসকদের নিম্নমানের মাস্ক সরবরাহ নিয়ে। নানা ঘটনার পর সর্বশেষ রিজেন্ট হাসপাতাল ও জেকেজি হেলথ কেয়ারের জালিয়াতি ফাঁস হলে মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে। এ সময় মহাপরিচালক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানান, রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে সরকারের চুক্তি হয় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে। এ মন্তব্যের বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তার কাছে ব্যাখ্যা চায়। দেশে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব আরো দু’তিন বছর থাকবে- এমন বক্তব্যের জন্যও তোপের মুখে পড়তে হয়েছিল তাকে। নানা অভিযোগের ভিত্তিতে এর আগে স্বাস্থ্য সচিব সহ মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেয়া হয়েছিল। তার ধারাবাহিকতায় বিদায় নিতে হলো আবুল কালাম আজাদকে। ২০১৬ সালের ১লা সেপ্টেম্বর থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের দায়িত্বে বায়োকেমিস্ট্রির অধ্যাপক ডা. আজাদ। সরকারি চাকরির বয়স শেষ হওয়ার পরও (২০১৯ সালের ২৭শে মার্চ) তাকে ওই পদে পুনরায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সেই আদেশে বলা হয়েছিল, ১৫ই এপ্রিল বা যোগদানের তারিখ থেকে ২ বছরের জন্য তিনি মহাপরিচালকের দায়িত্বে থাকবেন। সে হিসাবে, আগামী বছরের এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত তার চুক্তির মেয়াদ ছিল।

সমপ্রতি বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে করোনা মোকাবিলায় নেয়া দুটি প্রকল্পেও অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। বলা হচ্ছে, ওই প্রকল্পে চশমা ও পিপিইর দাম বাজার মূল্যের কয়েকগুণ বেশি ধরা হয়েছে। এ ঘটনার পর গত জুন মাসে প্রকল্প পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. ইকবাল কবিরকে বদলি করে সরকার। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিকল্পনা ও গবেষণা শাখার পরিচালক পদ থেকেও সরিয়ে দেয়া হয় তাকে। ইকবাল কবিরকে পরবর্তী পদায়নের জন্য পার-১ অধিশাখায় ন্যস্ত করা হয়। যেখানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (গবেষণা) ডা. আফরিনা মাহমুদকে চলতি দায়িত্ব দেয়া হয়।

কেনাকাটায় অনিয়মের অভিযোগে কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শহীদ উল্লাহসহ বিভিন্ন স্তরের অন্তত ৮ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বদলি করা হয়। ঔষধাগারের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শহীদ উল্লাহ করোনায় আক্রান্ত হয়ে গত মাসে মারা যান। এ ছাড়া অতি গোপনে অধিদপ্তরের মধ্যম পর্যায়ের ১০ কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে। শৃঙ্খলা ফেরাতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে ঢেলে সাজানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
অনুমোদনহীন হাসপাতাল রিজেন্টের সঙ্গে চুক্তিসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ) ডা. আমিনুল হাসানের বিরুদ্ধে। ফলে তাকে করা হয় ওএসডি। সূত্র জানায়, এ আমিনুল হাসানই ২১শে মার্চ রিজেন্ট হাসপাতালের চুক্তি বিষয়ক চিঠিতে লেখেন, ‘সচিব স্যারের নির্দেশে রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তি করা হয়।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নতুন মহাপরিচালক হিসেবে অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম নিয়োগ পাওয়ার পরই ২৮ কর্মকর্তাকে ২৬শে জুলাই রদবদল করা হয়। করোনাভাইরাস মহামারি চলাকালীন সময়ে রিজেন্ট ও জেকেজি কেলেঙ্কারি সহ করোনা মোকাবিলায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ব্যর্থতার অভিযোগে গত ২১শে জুলাই মহাপরিচালকের পদ থেকে পদত্যাগ করেন অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ। এরপর ২৩শে জুলাই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় তার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে। একই দিন অধিদপ্তরের নতুন মহাপরিচালক হিসেবে অধ্যাপক ডা. এবিএম খুরশীদ আলমকে নিয়োগ দেয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। তার যোগদানের পরই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে ব্যাপক রদবদল করা হয়। গত ২৬শে জুলাই বিভিন্ন বিভাগে কর্মরত ২৮ কর্মকর্তাকে এক আদেশে দেশের বিভিন্ন স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে পদায়ন, বদলি ও সংযুক্ত করা হয়। এরপর ৯ই আগস্ট স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালকের (প্রশাসন) পদ থেকে ডা. মো. বেলাল হোসেনকে বদলি করা হয়। তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন ঢাকা বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. শেখ মোহাম্মদ হাসান ইমাম। গত ২২শে জুলাই সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক জানিয়েছেন, কেবল পরিচালক (হাসপাতাল) নয়, যে শাখাগুলো বেশি সমালোচিত হয়েছে সেগুলো ভালোভাবে খতিয়ে দেখে সরকার শক্ত ব্যবস্থা নেবে।

-সূত্র : ম.জমিন