প্রতীকী ছবি

(দিনাজপুর২৪.কম) সরকারের অঘোষিত লকডাউনে পোশাক খাতের দুই সংগঠন বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএ’র সদস্যভুক্ত ৪ হাজার কারখানার মধ্যে এখনো শতাধিক তৈরি পোশাক কারখান চালু রয়েছে  বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এগুলোর মধ্যে কিছু কারখানায় স্বাস্থ্যকর্মীদের পার্সোনাল প্রোটেক্টিভ ইকুইপমেন্ট (পিপিই) ও মাস্ক এবং বাকি কারখানাগুলোতে বিদেশি ক্রেতাদের ক্রয়াদেশের পোশাক তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি  ঢাকার বাইরেও আরো বেশ কিছু কারখানা চালু আছে, যারা এই দুই সংগঠনের সদস্য নয়। অবশ্য এসব প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকের সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সাপেক্ষে কারখানা সচল রয়েছে।

সূত্র জানায়, তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ এবং নিট পণ্য প্রস্তুতকারকদের সংগঠন বিকেএমইএ মিলে দেশে সক্রিয় কারখানার সংখ্যা ৪ হাজার। এর মধ্যে বিজিএমইএর সদস্য ৩ হাজার ২০০, বাকি ৮০০ কারখানা বিকেএমইএর সদস্য। এর মধ্যে সোমবার পর্যন্ত শ্রমিকদের নিরাপত্তা এবং রপ্তানি আদেশ না থাকার কারণে ৩ হাজার ৯ শতাধিক পোশাক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়েছে। পরবর্তি ক্রয়াদেশ না আসা পর্যন্ত এসব কারখানা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মালিকপক্ষ। এদিকে চালু থাকার মধ্যে বিজিএমইএর তত্ত্বাবধানে ১২টি পোশাক কারখানায় তৈরি হচ্ছে পিপিই ও মাস্ক।

কারখানাগুলোর মধ্যে স্নোটেক্স আউটারওয়্যার প্রাথমিকভাবে বিনা মূল্যে বিতরণের জন্য ১৭ হাজার পিপিই বানানোর উদ্যোগ নিয়েছে। ইতিমধ্যেই প্রতিদিন দুই হাজার করে পিপিই উৎপাদন করছে প্রতিষ্ঠানটি।

 জানা গেছে, পোশাক খাতসংশ্লিষ্ট দুই সংগঠনের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হলেও অনেক শিল্প মালিকই তার পোশাক কারখানা সচল রাখতে আগ্রহী, কারণ এসব কারখানার ক্রয়াদেশ বহাল আছে। আবার কিছু কারখানা রয়েছে যেগুলো করোনা সংক্রমণের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে নিজস্ব সুরক্ষা পোশাকের (পিপিই) আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় ক্রয়াদেশ পাচ্ছে। এ অবস্থায় যেসব প্রতিষ্ঠানের কাজ আছে, মূলত সেগুলোই শ্রমিকের সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সাপেক্ষে কারখানা সচল রাখছে।

এর আগে জাতির উদ্দেশে দেয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাষণের পরদিন বৃহস্পতিবার বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ সংগঠন দুটির সদস্যদের কারখানা বন্ধ রাখার অনুরোধ জানায়। তবে যেসব কারখানায় রপ্তানি আদেশের কাজ আছে এবং পিপিই ও মাস্ক তৈরি হচ্ছে সেসব কারখানা খোলা রাখার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। খোলা রাখা কারখানার নিরাপত্তা দেয়ার কথা বলে বিজিএমইএ। বিজিএমইএর সভাপতি রুবানা হক বলেন, তবে শুধু সরকার কেন্দ্রীয়ভাবে বন্ধের সিদ্ধান্ত নিতে পারে। শ্রম মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতেও বলা হয়, রপ্তানি আদেশের কাজ থাকা এবং করোনা থেকে সুরক্ষাসামগ্রী উৎপাদনে থাকা কারখানা চালু রাখতে কোনো বাধা নেই। মন্ত্রণালয়ের অধীন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের (ডিআইএফই) পক্ষ থেকেও খোলা রাখা কারখানার নিরাপত্তা দেয়ার কথা বলা হয়। এসব কারণে কাজ আছে এরকম বেশ কিছু কারখানা এখনো খোলা আছে। তবে করোনা থেকে নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা ভেবে অনেক কারখানার শ্রমিকরা কাজ করতে রাজি হননি। সবচেয়ে বেশি ও বড় কারখানার এলাকা হিসেবে পরিচিত আশুলিয়া অঞ্চলের বেশকিছু কারখানা বন্ধ হয়ে যায়।

বিজিএমইএর সিনিয়র এডিশনাল সেক্রেটারি মনসুর খালেদ বলেন, ঘোষণার প্রথম দিনেই ৮০ শতাংশ কারখানা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ২০ শতাংশ কারখানায় কাজ চলছিল। কিন্তু ঢাকার মিরপুরসহ আশুলিয়ার বড় কারখানায় শ্রমিকরা কাজ করতে অস্বীকৃতি জানান। পরে বাধ্য হয়ে আরো কারখানা বন্ধ ঘোষাণা করা হয়। শেষ পর্যন্ত ৫০ থেকে ৬০টি কারখানা রয়েছে। পাশাপাশি পিপিই তৈরি হচ্ছে এরকম কয়েকটি কারখানা চালু রয়েছে বলে জানান তিনি।

নিট পোশাকের কারখানাগুলোতেও একই চিত্র। নিট পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিকেএমইএর প্রথম সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, তাদের ৯০ শতাংশ কারখানা আগেই বন্ধ ঘোষণা করা হয়। বাকি ১০ শতাংশ কারখানায় কাজ ছিল; কিন্তু শ্রমিকরা কাজ করতে চায় না। এ কারণে খোলা রাখা কারখানাগুলোও বন্ধ করা হয়। কেউ কেউ শ্রমিকদের সঙ্গে সমঝোতা করে কাজ চালিয়ে নিচ্ছেন। কারণ তাদের ক্রয়াদেশ আছে।

সূত্র জানিয়েছে, ঢাকা পার্শ্ববর্তী শিল্প এলাকা আশুলিয়ায় পোশাক কারখানা সচল রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ক্রয়াদেশ বহাল থাকায় কারখানা সচল রাখতে আগ্রহী। এছাড়া পিপিইর মতো পোশাকের ক্রয়াদেশ পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোও কারখানা চালু রাখার বিষয়ে আগ্রহী।

জানা গেছে, বাংলাদেশের শিল্প অধ্যুষিত এলাকাগুলোর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঢাকার পার্শ্ববর্তী আশুলিয়া। বস্ত্র-পোশাক, চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ, ফার্নিচার, প্লাস্টিকসহ সব মিলিয়ে আশুলিয়া এলাকায় শিল্প-কারখানা আছে ১ হাজার ৩৫৬টি। করোনা ভাইরাস আতঙ্কে এর মধ্যে ১ হাজার ২৯৫টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। বাকি ৬১টি কারখানা সচল আছে। শুধু আশুলিয়া নয়, একই অবস্থা দেশের অন্যান্য শিল্প এলাকায়ও। দেশে শিল্প অধ্যুষিত এলাকা আছে মোট ছয়টি। সব খাত মিলিয়ে এ এলাকাগুলোতে শিল্প-কারখানা আছে ৭ হাজার ৪০৮টি।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র বলছে, এর মধ্যে ৬ হাজার ৪২৩টি বা ৮৭ শতাংশ শিল্প-কারখানাই বন্ধ। সচল ছিল বাকি ৯৮৫টি। করোনা ভাইরাস আতঙ্ক ও কাজের সংকট, এ দুই কারণেই শিল্প-কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। আর যেসব কারখানা চালু আছে, সেগুলোর কাজ আছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
আশুলিয়ায় মোট ১ হাজার ৩৫৬টি কারখানার মধ্যে বস্ত্র ও পোশাক খাতের সংগঠন বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও বিটিএমএর সদস্য কারখানার সংখ্যা ৫২৭টি, যার মধ্যে বন্ধ ৫০১টি।
গাজীপুরে মোট কারখানা আছে ২ হাজার ৭২টি। এর মধ্যে বন্ধ হয়েছে ১ হাজার ৫৫৬টি। এ এলাকায় বস্ত্র ও পোশাক খাতের সংগঠনগুলোর সদস্য কারখানা আছে ১ হাজার ৮৫টি। এসব কারখানার মধ্যে বন্ধ ৮৯৪টি।
চট্টগ্রামে মোট শিল্প-কারখানা আছে ১ হাজার ৩৫টি। এর মধ্যে বন্ধ ৮৭৫টি। এ এলাকায় সংশ্লিষ্ট সংগঠনের সদস্য বস্ত্র ও পোশাক খাতের কারখানা আছে ৪৩১টি। এর মধ্যে বন্ধ ৩৯৮টি।
নারায়ণগঞ্জে মোট শিল্প-কারখানা আছে ২ হাজার ৪৫৯টি। এর মধ্যে বন্ধ হয়েছে ২ হাজার ৩৩১টি। এ এলাকায় বস্ত্র ও পোশাক কারখানা আছে ১ হাজার ২৪২টি। যার মধ্যে বন্ধ ১ হাজার ১৯৫টি। সূত্র : ম. জমিন