(দিনাজপুর২৪.কম) শহর থেকে গ্রামে সর্বত্রই লোডশেডিং। প্রচণ্ড দাবদাহে এমন লোডশেডিংয়ে দুর্ভোগে পড়েছে সাধারণ মানুষ। অফিস-আদালতেও স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হচ্ছে। এত দিন লোডশেডিংয়ের পরিমাণ কম হলেও কয়েকদিন ধরে তা মাত্রাতিরিক্ত বেড়েছে। জ্বালানি বিভাগ বলছে, গ্যাসের স্বল্পতা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় এ অবস্থা হয়েছে। লোডশেডিংয়ে জনদুর্ভোগের কারণে গতকাল ভুক্তভোগীদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। এদিকে বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, গরমে বিদ্যুতের চাহিদা অত্যধিক বেড়ে গেছে। এ ছাড়া তাপমাত্রা বেশি হওয়ায় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোও সর্বোচ্চ উৎপাদন করতে পারছে না। এতে বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে। পিক আওয়ারে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ এক হাজার মেগাওয়াটের বেশি হচ্ছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সূত্র জানায়, গতকাল পিক আওয়ারে সন্ধ্যা ৭টায় সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে আট হাজার ৩১ মেগাওয়াট। এ সময় সারা দেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ধরা হয়েছিল আট হাজার ৩৫০ মেগাওয়াট। লোডশেডিং করতে হয় ২৯১ মেগাওয়াট। এটি সরকারি হিসাব। উৎপাদন ক্ষমতা আছে ১২ হাজার ৩৩৯ মেগাওয়াটের। এর মধ্যে ভারত থেকে আসছে ৬০০ মেগাওয়াট। কিন্তু বিদ্যুৎ বিশেষজ্ঞরা জানান, প্রকৃত চাহিদা ৯ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। ফলে লোডশেডিং এক হাজার মেগাওয়াটের ওপরে। লোডশেডিংয়ের মাত্রা ঢাকার বাইরের জেলাগুলোতে তুলনামূলক বেশি। কয়েকদিন ধরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঘন ঘন লোডশেডিং হচ্ছে। রাজধানীর আজিমপুরের বাসিন্দা ইয়ারুল জানান, সন্ধ্যার পর বিদ্যুৎ থাকে না। প্রতিদিন এক থেকে দেড় ঘণ্টা বিদ্যুতের এ রকম ঘটনা ঘটে। গভীর রাতে কয়েকবার বিদ্যুৎ চলে যায়। পাওয়ার সেলের এক উপপরিচালক লোডশেডিংয়ের বিষয়ে মানবজমিনকে বলেন, লোডশেডিংয়ের জন্য মূলত নৌধর্মঘট দায়ী। কারণ ধর্মঘটের কারণে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে। এখন ধর্মঘট উঠে গেছে, সমস্যা কেটে যাবে। এ ছাড়া নতুন কেন্দ্রগুলো (পরীক্ষামূলক চালু) প্রত্যাশিত উৎপাদন করতে পারছে না। আগামী দু-তিন দিনের মধ্যে লোডশেডিং সমস্যা কমবে। তারা জানান, বিদ্যুতের মূল জ্বালানি হলো গ্যাস। ৬৭ ভাগ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় গ্যাস দিয়ে। গ্যাসের অভাবে এক হাজার মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদন করা যাচ্ছে না। এই গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানোর খুব বেশি সুযোগ নেই। বহু সচল বিদ্যুৎকেন্দ্র গ্যাসের অভাবে অচল হয়ে বসে আছে। তেল দিয়ে উৎপাদন হয় ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ। বাকিটা কয়লা ও জলবিদ্যুৎ। সূত্র জানায়, সারা দেশে পল্লীবিদ্যুতান বোর্ডের (আরইবি) বিদ্যুতের চাহিদা দৈনিক চার হাজার ৮০৭ মেগাওয়াট। কিন্তু সরবরাহ করা হচ্ছে দুই হাজার ৭৬১ মেগাওয়াট। ঘাটতি থাকছে দুই হাজার ৪৬ মেগাওয়াট। এতে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ বেড়েছে। বিভিন্নস্থানে জনরোষ সৃষ্টি হচ্ছে। বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক সময়ই ওয়াসার পাম্প বন্ধ থাকছে। ওয়াসার বহু পাম্পে জেনারেটর নেই। বিদ্যুৎ সঞ্চালনের দায়িত্বে নিয়োজিত পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি) সূত্রে জানা গেছে, জ্বালানি সংকটে বর্তমানে ১৮টি কেন্দ্রের এক হাজার ২২৮ মেগাওয়াট উৎপাদন করা যাচ্ছে না। এর মধ্যে তেল সংকটে ৩৯০ মেগাওয়াট বসে আছে। বন্ধ রয়েছে ফার্নেস অয়েলচালিত নোয়াপাড়া কেন্দ্রে ৪০ মেগাওয়াট, হরিপুর এনইপিসির ৯৭ মেগাওয়াট ও ডিজেলচালিত মেঘনাঘাট কেন্দ্রে ১০৫ মেগাওয়াট, সিদ্ধিরগঞ্জের কুইক রেন্টালের ৯৮ মেগাওয়াট ও পাগলায় ৫০ মেগাওয়াট। গ্যাসের ঘাটতির কারণে বহু কেন্দ্রে উৎপাদন কমিয়ে দেয়া হয়েছে। এগুলো হলো ভোলা কেন্দ্রে ১০১ মেগাওয়াট, হরিপুর পাওয়ারের ১৯ মেগাওয়াট, সিদ্ধিরগঞ্জ কেন্দ্রে ৪০ মেগাওয়াট, সিদ্ধিরগঞ্জ কেন্দ্রে ১৫০ মেগাওয়াট, টঙ্গী কেন্দ্রে ১০৫ মেগাওয়াট, শিকলবাহায় দুই কেন্দ্রে ৯০ মেগাওয়াট, চট্টগ্রাম কেন্দ্রের দুই ইউনিটে ১৯০ মেগাওয়াট, আশুগঞ্জের তিন কেন্দ্রে ১০৬ মেগাওয়াট, চাঁদপুর কেন্দ্রে ১১৩ মেগাওয়াট ও সিলেট কেন্দ্রে ২৫ মেগাওয়াট। পানির অভাবে কাপ্তাই বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে। পিডিবি জানায়, বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের প্রয়োজন ১৩০ কোটি ঘনফুট। পিডিবি পাচ্ছে ১১০ কোটি ঘনফুট।
জ্বালানি-বিশেষজ্ঞ এবং কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা ড. শামসুল আলম বলেন, প্রতি বছরই এ রকম ঘটনা ঘটে। এখন বিদ্যুতের চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম। কোনো সমন্বয় নেই। উৎপাদন বাড়িয়েছে। কিন্তু জ্বালানি সরবরাহ বাড়েনি। সরকার বিদ্যুতের যে লোডশেডিংয়ের হিসাব দিয়েছে, তা সঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে চাহিদা আরো বেশি। তিনি বলেন, কারিগরি বিষয়ে অনুমাননির্ভর কথা বলা উচিত নয়। সরকার বিদ্যুতের নিয়মতান্ত্রিক কোনো হিসাব রাখে না। অনুমাননির্ভর বলে থাকে।
প্রতিমন্ত্রীর দুঃখ প্রকাশ: শুক্রবারের মধ্যেই বিদ্যুতের অবস্থা স্বাভাবিক হবে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। এক সপ্তাহ ধরে ঢাকাসহ চট্টগ্রাম ও উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুৎ সমস্যায় মানুষের কষ্টের জন্য দুঃখও প্রকাশ করেছেন তিনি। গতকাল ফেসবুকে দেয়া এক স্ট্যাটাসে তিনি বলেন, আপনারা হয়তো জেনে থাকবেন নৌযান ও নৌপরিবহনের শ্রমিকরা এক সপ্তাহ ধরে তাদের বিভিন্ন দাবি আদায়ে ধর্মঘট করেছেন। যার ফলে সারা দেশে নৌপথে জ্বালানি তেল সরবরাহ প্রচণ্ড আকারে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এজন্য তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং প্রায় ১৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম উৎপাদিত হচ্ছে। একই সঙ্গে তেল না পাওয়ায় ফসলি জমিতে সেঁচকাজও স্থবির হয়ে পড়েছে। এতে তিনি বলেন, আমি ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান নৌযান মালিক ও শ্রমিকদের সঙ্গে বৈঠক করেছি। বৈঠকে শ্রমিকদের দাবি পূরণের আশ্বাস দেন মালিকরা। দেশ যখন বিদ্যুৎ উৎপাদনে রেকর্ড করছে এবং জনগণের সেবার জন্য কাজ করে যাচ্ছে বিদ্যুৎ বিভাগ, তখনই সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে গভীর ষড়যন্ত্র করছে একটি স্বার্থান্বেষী মহল। আমরা আশা করি, কোনো মহলই তাদের দাবি আদায়ের জন্য সাধারণ মানুষকে জিম্মি করবে না। আমরা আশা করছি, শুক্রবারের মধ্যেই দেশে বিদ্যুতের অবস্থা স্বাভাবিক হবে।-ডেস্ক