'লকডাউন' বা 'কোয়ারেন্টিন' মানাই কী একমাত্র সমাধান? - সংগৃহীত

(দিনাজপুর২৪.কম) বাংলাদেশে অন্তত ৩৪টি জেলায় করোনাভঅইরাস ছড়িয়ে পড়ায় লকডাউনের বাস্তবায়ন ও কার্যকারিতা নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে মানুষের মধ্যে।
বাংলাদেশে প্রায় প্রতিদিনই নতুন নতুন জেলায় করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হওয়ায় লকডাউনের বাস্তবায়ন ও কার্যকারিতা নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে মানুষের মধ্যে।

রোববার দৈনিক করোনাভাইরাসের আপডেট জানানোর সময় আইইডিসিআরের পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন যে আগের ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে চারটি জেলার মানুষের মধ্যে করোনাভাইরাস সংক্রমণ ঘটেছে।

আগের দিন নতুন ৯টি জেলায় করোনাভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্তের কথা জানানো হয়।

অথচ আইইডিসিআরের তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায় শুরুরদিকে নতুন নতুন জেলায় করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগী বৃদ্ধি পাওয়ার হার ছিল ধীরগতির।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ৮ মার্চ তিনজনের মধ্যে করোনাভাইরাস সংক্রমণের তথ্য জানায়, যেটি ছিল বাংলাদেশে করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়ার প্রথম ঘটনা।

তবে ওই সময় আক্রান্ত ব্যক্তি কোন জেলার অধিবাসী, সেই তথ্য জানাত না সংস্থাটি। এর কয়েক দিন পর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা সাংবাদিকদের জানান যে প্রথম তিনজন আক্রান্ত ব্যক্তি ছিলেন নারায়নগঞ্জ ও মাদারীপুরের বাসিন্দা।

এরপর ২৩ মার্চ আইইডিসিআর প্রথমবার সাতটি জেলার নাম জানায় যেখানকার মানুষের মধ্যে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে।

সেই জেলাগুলো ছিল ঢাকা, নারায়নগঞ্জ, মাদারীপুর, কুমিল্লা, গাইবান্ধা, চুয়াডাঙ্গা ও গাজীপুর।

এরপর ৩ এপ্রিল নতুন করে দু’টি জেলায় – রংপুর ও কক্সবাজার – করোনাভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্তের তথ্য জানানো হয়। ৬ এপ্রিলের মধ্যে মোট ১৫টি জেলায় কোভিড-১৯ রোগী শনাক্ত হওয়ার খবর জানানো হয়।

তালিকায় নতুন করে যোগ হয় জামালপুর, নরসিংদী, শরীয়তপুর, চট্টগ্রাম, সিলেট ও মৌলভীবাজার জেলা।

৯ এপ্রিলের মধ্যে জেলার সংখ্যা বিশ পার করে। তালিকায় নতুন করে যুক্ত হয় কিশোরগঞ্জ, নীলফামারি, ময়মনসিংহ, শেরপুর, টাঙ্গাইল, রাজবাড়ী ও মানিকগঞ্জ।

এর পর দিনই আরো প্রায় ১০টি জেলায় শনাক্ত হয় করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগী। মুন্সীগঞ্জ, গোপালগঞ্জ, ব্রাক্ষ্ণণবাড়িয়া, চাঁদপুর, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, পটুয়াখালী ও বরগুনায় কোভিড-১৯ রোগী পাওয়া যায়।

রোববার আইইডিসিআর জানায় নতুন আরো চারটি জেলায় – ঝালকাঠি, ঠাকুরগাও, লালমনিরহাট, লক্ষ্ণীপুর – শনাক্ত হয়েছে করোনাভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তি।

কেন নতুন জেলায় ছড়িয়ে পড়ছে ভাইরাস আক্রান্ত রোগী?
রবিবার আইইডিসিআর পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা জানান নতুন করে চারটি জেলায় করোনাভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তিদের সবাই লকডাউনের মধ্যেই এক জেলা থেকে অন্য জেলায় গিয়েছেন।

“যাদের মধ্যে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে তাদের প্রত্যেকেই গত এক সপ্তাহের মধ্যে ঢাকা অথবা নারায়নগঞ্জ থেকে ঐ জেলাগুলোতে এসেছেন।”

শনিবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকও স্বীকার করেন যে নারায়ণগঞ্জ থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় মানুষের গোপনে পালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি নজরে এসেছে তাদের।

ছুটির মধ্যে নারায়নগঞ্জ থেকে অন্যান্য জায়গায় পালিয়ে যাওয়া কয়েকজনের সাথে কথা বলেন বিবিসি সংবাদদাতা।

নিম্ন আয়ের ব্যক্তিদের অনেকের কর্মস্থলই নারায়নগঞ্জ, কিন্তু মার্চ মাসের ২৬ তারিখ থেকে কোন কাজ না থাকায় তারা নিজ নিজ এলাকার দিকে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

কেউ কেউ আবার আশঙ্কা করেছেন যে নারায়ণগঞ্জে তারা যেখানে বসবাস করেন, সে বাড়িতে বা তার আশপাশে যদি কারো দেহে করোনাভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া তাহলে হয়তো সে এলাকা থেকে আর বের হতে পারবেন না।

সেজন্য তারা গ্রামের বাড়ি চলে যান।

আইইডিসিআরের উপদেষ্টা মোশতাক হোসেনের ধারণা যারা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছেন তাদেরকে বিভিন্ন জায়গায় সামাজিকভাবে একঘরে করে দেবার প্রবণতা বাড়ছে বলে এটি নিয়ে মানুষের মনে এক ধরণের ভীতি তৈরি হয়েছে।

সে কারণে রোগ শনাক্ত হলে বা অনেক সময় উপসর্গ দেখা দিলেও মানুষের মধ্যে পালিয়ে অন্য কোনো এলাকায় চলে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে।

‘লকডাউন’ বা ‘কোয়ারেন্টিন’ই কী সমাধান?
করোনাভাইরাস যেন দেশের বিভিন্ন স্থানে না ছড়াতে পারে, তা নিশ্চিত করতে ২৬ মার্চ থেকে বাংলাদেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে সরকার। তিন দফা বাড়িয়ে সেই ছুটির মেয়াদ নেয়া হয়েছে ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত।

ছুটি শুরু হওয়ার কয়েকদিন পর থেকেই দেশের বিভিন্ন জেলা ‘লকডাউন’ ও জেলায় প্রবেশ বা সেখান থেক বের হওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে ঢাকাসহ বাংলাদেশের অন্তত ১৯টি জেলা কার্যত লকডাউন রয়েছে – অর্থাৎ সেসব জেলা থেক বের হওয়া বা অন্য জেলা থেকে সেখানে প্রবেশ করার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। আর আংশিক লকডাউন অবস্থায় রয়েছে ১৬টি জেলা।

কিন্তু বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়া রোধ করতে শুধুমাত্র প্রশাসন ও আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দায়িত্ব দিয়ে লকডাউন বা কোয়ারেন্টিন পালন নিশ্চিত করা যথেষ্ট নয় বলে মন্তব্য করেন মোশতাক হোসেন।

“লকডাউন বা কোয়ারেন্টিনের মধ্যে রোগী দ্রুত শনাক্ত করে তাকে আইসোলেশনে নিয়ে যাওয়া, তার আশেপাশের মানুষকে কোয়ারেন্টিনে নেয়ার মত পদক্ষেপ নেয়াই যথেষ্ট নয়, আশেপাশের কমিউনিটিকেও সংযুক্ত করতে হবে”, বলেন মোশতাক হোসেন।

তিনি বলেন বেশকিছু দেশের জনস্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ এখন মানুষকে ঝুঁকি সম্পর্কে অবহিত করা এবং জনসমাজকে সম্পৃক্ত করে কোয়ারেন্টিন কার্যকর করা বা রোগী শনাক্ত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।

“মৃদু সংক্রমণ হয়েছে যাদের মধ্যে, তাদের ও তাদের পরিবারের খোঁজখবর নিতে হবে স্থানীয় জনসমাজের মাধ্যমে। তা না করে প্রশাসনকে সম্পৃক্ত করলে তা অনেকটা পুলিশি ব্যবস্থা হয়ে যাবে আর সেরকম হলে জনগণ সেটাকে মন থেকে মেনে নিতে পারবে না, ফলে ঘটবে পালিয়ে যাওয়ার মত ঘটনা।”

মোশতাক হোসেন মনে করেন যাদের মধ্যে মৃদু উপসর্গ রয়েছে তাদের চিকিৎসা ঘরেই করা সম্ভব, কিন্তু তা স্থানীয় জনসমাজের সহায়তা ছাড়া সম্ভব নয়।

তবে যেসব জায়গায় ক্লাস্টার পাওয়া গেছে, সেসব এলাকায় কড়াকড়িভাবে কোয়ারেন্টিন মেনে চলা প্রয়োজন বলে মনে করেন আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা।

তিনি বলেন ক্লাস্টারের ভেতরে ঘরে ঘরে গিয়ে রোগী শনাক্ত করার কাজেও স্থানীয় কমিউনিটির অংশগ্রহণ জরুরি।

“স্বাস্থ্য বিভাগ একা ঘরে ঘরে গিয়ে যেমন সবার পরীক্সা করতে পারবে না, তেমনি আইন শৃঙ্খলা রক্সাকারী বাহিনীর চাপ দিয়ে সেটি সম্বব নয়। স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমেই কেবলমাত্র এটি সম্ভব।”

প্রত্যেক এলাকার স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে এলাকার জনসাধারণকে সমন্বিতভাবে আক্রান্তদের শনাক্ত করা থেকে শুরু করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়ার প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

একদিকে কোয়ারেন্টিন সফল করার জন্য পদক্ষেপ এবং আরেকদিকে জনস্বাস্থ্য বিষয়ক পদক্ষেপ নিয়ে এশিয়া ও আফ্রিকার বেশকিছিু দেশ করোনাভাইরাসের প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে বলে জানান মোশতাক হোসেন।

“জনসমাজকে সম্পৃক্ত করে এবং কমিউনিটির নেতৃত্বকে প্রশাসনের সাথে যুক্ত করে নিজেদের সমস্যা নিজেদেরই পরিবর্তন করার দায়িত্ব দিলে পরস্থিতির একটা নাটকীয় পরিবর্তন ঘটবে।”
সূত্র : বিবিসি