(দিনাজপুর২৪.কম) সম্প্রতি রাজধানীতে চালু হওয়া ‘র‌্যাপিড পাস’ পদ্ধতিতে গণপরিবহনের সাড়া নেই। পরিবহন মালিকের সংখ্যা অনেক হওয়ায় তাদের এ পদ্ধতির আওতায় আনা যাচ্ছে না। এ ছাড়া যেসব পরিবহন মালিক দীর্ঘদিন ধরে ভাড়া নৈরাজ্য চালিয়ে আসছেন, তারা এ পদ্ধতি চালু করার ব্যাপারে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। তারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এ পদ্ধতির বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

ফলে বাধ্য হয়ে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) এখন দুটি গণপরিবহনে এ সার্ভিস চালু করেছে, যেগুলোতে ভাড়া আদায়ে আগে থেকেই তেমন কোনো ঝামেলা ছিল না। তবে ডিটিসিএ তাদের ব্যর্থতার কথা স্বীকার না করে র‌্যাপিড পাস চালুর প্রতিবন্ধকতার ব্যাপারে খোঁড়া যুক্তি দাঁড় করাচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি বিআরটিসির ২৫টি এসিবাস ও গুলশানের বিশেষ সার্কুলার বাস সার্ভিস ‘ঢাকা চাকা’র যাত্রীদের ভাড়া আদায়ে নতুন সিস্টেমটি চালু করে কর্তৃপক্ষ। তবে যাত্রীরা বলছেন, এ পরিবহন দুটিতে আগে থেকেই ভাড়া নিয়ে তেমন কোনো ঝামেলা ছিল না। ফলে গণপরিবহনে নৈরাজ্য রোধে তেমন কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারছে না ‘র‌্যাপিড পাস’।

কর্তৃপক্ষ অবশ্য বলছে, বাকবিতণ্ডা বা ভাড়া নৈরাজ্য দূর করার পাশাপাশি গণপরিবহনে যাত্রীদের সহজে ভাড়া পরিশোধের লক্ষ্যে রাজধানীর সব পাবলিক পরিবহনে ‘র‌্যাপিড পাস’ কার্ডের ব্যবহার কার্যক্রম পরিচালনা করতে কাজ করছে তারা। কিন্তু গণপরিবহনগুলোর ভিন্ন ভিন্ন মালিকানা ও ভাড়া আদায়ের পদ্ধতির কারণে তা সহজ হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জানা গেছে, বিআরটিসি এসিবাস ও ঢাকা চাকার ভাড়া আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল। নির্দিষ্ট কাউন্টার থেকে টিকিট সংগ্রহ করে লাইনে অপেক্ষা করেন যাত্রীরা। সচরাচর এসব বাসের হেলপার বা কোনো পরিবহন কর্মীদের সঙ্গে যাত্রীদের বাকবিতন্ডার ঘটনা ঘটে না। ভাড়া নিয়েও কোনো ঝামেলা পোহাতে হয় না এ দুটি পরিবহনের যাত্রীদের।

ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, ‘র‌্যাপিড পাস’ মূলত ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডের মতো। এই কার্ডের মাধ্যমে নির্ধারিত ভাড়া অনুযায়ী গণপরিবহনে ভাড়া পরিশোধ করা যাবে। যাত্রী ওঠার সময় কার্ডটি বাসে রাখা মেশিনের সঙ্গে স্পর্শ করলে সবুজ বাতি জ্বলে উঠবে। আবার কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে নেমে যাওয়ার সময় আবার ওই মেশিনে স্পর্শ করলে নির্ধারিত ভাড়া কেটে রাখা হবে। পর্যায়ক্রমে নগরীর সিটিং সার্ভিসসহ অন্যান্য পরিবহনে ভাড়া আদায়ের এ পদ্ধতি চালু করার চিন্তা করছে কর্তৃপক্ষ। তবে সিটিং সার্ভিসসহ বেসরকারি পরিবহনগুলোতে এ সিস্টেম চালু করা দুরূহ ব্যাপার বলে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক মো. জাকির হোসেন মজুমদার বলেন, সার্ভিসটি সব পরিবহনে চালু করা গেলে যাত্রী ও পরিবহন শ্রমিকদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা নির্মূল হয়ে যাবে। সিটিং সার্ভিসসহ অন্যান্য পরিবহনের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে স্বেচ্ছায় কেউ সার্ভিসটি চালু করার জন্য আগ্রহ দেখায়নি। তাদের পক্ষ থেকে কয়েকটি পরিবহনের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তেমন সাড়া পাননি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কেউ রাজি না হলে নতুন একটি পদ্ধতি কারো ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না। অন্যান্য বাসে র‌্যাপিড পাস সিস্টেম চালু করার বিষয়ে পরিবহন মালিকরা নানা অজুহাত দেখাচ্ছেন। তবে এ সিস্টেমটি কোনো পরিবহন চালু করতে চাইলে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবেন বলে জানান তিনি।

সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েতুল্লাহ বলেন, পরিবহন খাতে আরো শৃঙ্খলা আনতে বেসরকারি গণপরিবহনেও র‌্যাপিড পাস কার্ড চালু করা যেতে পারে। ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ গণপরিবহনে র‌্যাপিড পাস কার্ড চালু করতে চাইলে তাদের পক্ষ থেকে কোনো বাধা নেই। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বেসরকারি গণপরিবহন বিশেষ করে ‘সিটিং সার্ভিসে’ এ সিস্টেম চালু করা সহজ হবে না। এমনিতেই বিভিন্ন স্টপেজে চেক ও ওয়াবিল সিস্টেমের ফাঁদে ফেলে যাত্রীদের কাছ থেকে লাগামহীন ভাড়া আদায় করছে বাসগুলো। সেক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত ভাড়ায় বাস চালাতে পরিবহন মালিকরা রাজি হবেন না।

এর আগে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক এ খাতে শৃঙ্খলা আনতে দুই বছর চেষ্টা করে গেছেন। গত বছর ভাড়া নৈরাজ্য দূর করতে সিটিং সার্ভিস বন্ধ করার সাময়িক সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এতে বাস মালিকরা সব পরিবহন বন্ধ করে দিলে বিপাকে পড়েন সাধারণ মানুষ। পরে বাধ্য হয়ে এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে কর্তৃপক্ষ। এসব দিক বিবেচনা করে বেসরকারি বাসগুলোতে সিস্টেমটি চালু করা প্রায় অসম্ভব। ফলে আগে থেকে সুশৃঙ্খল কিছু পরিবহনে এ সিস্টেম চালু করায় নগরীর পরিবহন ব্যবস্থাপনায় তেমন কোনো পরিবর্তন আসবে না বলে মনে করেন অনেকেই।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ অধিকার আন্দোলনের মহাসচিব কেফায়েতউল্লা চৌধুরী বলেন, একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সিটিং সার্ভিসগুলো নিয়ন্ত্রণ করে। ইতোপূর্বে তাদের শক্তি সবাই দেখেছে। নগরীর পরিবহন সেক্টরে শৃঙ্খলা আনতে হলে আগে সিটিং সার্ভিসগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আগে থেকে শৃঙ্খল দুটি পরিবহনে র‌্যাপিড সিস্টেম চালু করাকে ‘তেলের মাথায় তেল’ দেওয়ার শামিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মিরপুর রুটে চলাচলকারী একটি ‘সিটিং সার্ভিস’ কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, একটি গাড়ি চালাতে প্রতিদিন যে পরিমাণ খরচ হয়, তা সরকার নির্ধারিত ভাড়া দিয়ে ওঠানো সম্ভব না। বিভিন্ন খাতে টাকা দিতে হয়। শ্রমিকের বিল দিয়ে নিজেদের কিছু আয় না হলে এত টাকা খরচ করে রাস্তায় গাড়ি নামাবেন কেন, এমন প্রশ্ন করেন তিনি। তবে ‘র‌্যাপিড পাস’ সিস্টেম যদি ভালো হয় এবং সব পরিবহন এ ব্যবস্থা চালু করলে তিনিও করবেন।

জানা যায়, রাজধানী ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থা সমন্বিত ই-টিকেটিং পদ্ধতির আওতায় আনার লক্ষ্যে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকার কারিগরি সহায়তায় ডিটিসিএ ‘স্ট্যাবলিশমেন্ট অব ক্লিয়ারিং হাউস ফর ইন্টিগ্রেটিং ট্রান্সপোর্ট টিকেটিং সিস্টেম ইন ঢাকা সিটি এরিয়া’ নামের একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে। এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাইকার প্রায় সাড়ে ২৮ কোটি এবং বাংলাদেশ সরকারের সাড়ে ১০ কোটি টাকা রয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ ২০১৭ সালের জুন থেকে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত।