hrw-dinajpur24(দিনাজপুর২৪.কম) মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জনমানবহীন, অনুন্নত ঠেঙ্গারচরে পাঠানোর পরিকল্পনা অবিলম্বে বাতিল করতে বাংলাদেশ সরকারের কাছে আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। নিউ ইয়র্ক থেকে ৮ই ফেব্রুয়ারি ইস্যু করা এক বিবৃতিতে এসব কথা বলা হয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, ওইসব শরণার্থীকে কক্সবাজার থেকে ঠেঙ্গারচরে স্থানান্তর করা হলে তাতে মুক্তভাবে চলাচল, জীবন-জীবিকা, খাদ্য ও শিক্ষার অধিকার থেকে তারা বঞ্চিত হবে। এটা করা হলে আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের প্রতি বাংলাদেশের বাধ্যবাধকতার লঙ্ঘন হবে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, ১৯৯০-এর দশক থেকে মিয়ানমারে নিপীড়নের শিকার হয়ে ৩ থেকে ৫ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম শরণার্থী পালিয়ে বাংলাদেশে ঠাঁই নিয়েছেন। তাদের বেশির ভাগই নিবন্ধিত নন। ২০১৬ সালের অক্টোবর থেকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে প্রায় ৬৯ হাজার রোহিঙ্গা সে দেশের নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের হামলা থেকে বাঁচতে প্রবেশ করেছেন বাংলাদেশে। তাদের ওপর চালানো হয়েছে হত্যাযজ্ঞ। চালানো হয়েছে যৌন নির্যাতন। ব্যাপক হারে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে গ্রামের পর গ্রাম। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিষয়ক পরিচালক ব্রাড এডামস বলেছেন, বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গা শরণার্থীদের একেবারে কোনো জনবসতি নেই এমন এক দ্বীপে পুনর্বাসন করার পরিকল্পনা করছে। বর্ষা মৌসুমে ওই দ্বীপটি উচ্চ মাত্রায় জোয়ারে প্লাবন দেখা দেয়। পানিতে ডুবে যায়। সেখানে তাদের জীবনমানের উন্নতি হবে বাংলাদেশ সরকারের এমন দাবি অদ্ভুত। এমন প্রস্তাব একই সঙ্গে নিষ্ঠুর ও অকার্যকর। তাই এ পরিকল্পনা থেকে সরে আসা উচিত।
দীর্ঘ সময় অবস্থানকারী শরণার্থীদের ঠেঙ্গারচরে স্থানান্তরের প্রস্তাব প্রথম আসে ২০১৫ সালে। কিন্তু ব্যাপক সমালোচনা ও নিন্দার প্রেক্ষিতে তা স্থগিত হয়ে যায়। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ সরকার শরণার্থীদের স্থানান্তরের যথাযথ স্থান সম্পর্কে লিখেছিল যে, তারা বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের মধ্যে সংঘাত সর্বনি¤œ পর্যায়ে নিয়ে আসতে চায়। এক্ষেত্রে ঠেঙ্গারচরকে বেছে নেয়া হয়। কারণ, জনবসতি আছে এমন এলাকা থেকে দূরত্বের জন্য। জনবসতিপূর্ণ হাতিয়া দ্বীপ থেকে এর দূরত্ব ৩০ কিলোমিটার। বিদ্যমান রোহিঙ্গা শিবির থেকে এখানে যাওয়া বেশ সময়ের ব্যাপার। নতুন করে রোহিঙ্গা শরণার্থী প্রবেশের কারণে সরকার ওই পরিকল্পনা পুনর্জাগরিত করে এ বছরের ফেব্রুয়ারির শুরুতে। কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন শরণার্থী প্রবেশের ফলে তা আইনশৃঙ্খলা, জনস্বাস্থ্য সম্পর্কিত নানা সমস্যার সৃষ্টি করছে। তবে এ দাবিকে সমর্থন করে এমন কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেননি তারা। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ আরো বলেছে, সরকার নতুন করে আসা শরণার্থীরা সাধারণ মানুষের ভিড়ে মিশে যাচ্ছে এ বিষয়ে হুঁশিয়ারি দিয়েছে। গঠন করেছে বেশ কিছু কমিটি। এসব কমিটি শরণার্থী শিবিরের চারপাশে নিরাপত্তা জোরদার করেছে। বিদ্যমান ক্যাম্প বা শিবির থেকে শরণার্থীরা যাতে বাংলাদেশের নাগরিকদের মধ্যে মিশে যেতে না পারে সে জন্য কাজ করছে। এ অবস্থায় গত ২৬শে জানুয়ারি মন্ত্রিপরিষদ একটি নির্দেশ পাস করেছে। তাবে তাতে স্পষ্ট নয় যে, বাংলাদেশে অবস্থানরত সব রোহিঙ্গাকে নাকি নতুন করে যেসব শরণার্থী আসছেন বা এসেছেন তাদেরকে স্থানান্তরিত করা হবে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ শাহরিয়ার আলম বলেছে, অস্থায়ী ভিত্তিতে রোহিঙ্গারা বসবাস করবে (ঠেঙ্গারচরে)। আমাদের আশা মিয়ানমার সরকার যত তাড়াতাড়ি সম্ভত তাদেরকে ফিরিয়ে নেবে। তবে যেসব সাংবাদিক ঠেঙ্গারচর পরিদর্শন করেছেন তারা বলেছেন, ওই দ্বীপটি একেবারে শূন্য। কোনো অবকাঠামো নেই। সেখানে ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার প্রবণতা রয়েছে। এ দ্বীপটি বঙ্গোপসাগরের মাঝে পলি জমে সৃষ্টি হয়েছে এক দশক আগে। বর্ষার সময়ে দ্বীপটি একেবারে ডুবে যায়। ওই সময় যদি কোনো মানুষ সেখানে বসবাস করে তাহলে তাকে উদ্ধার করতে হবে। সেখানে কোনো অবকাঠামো থাকলে তা পানির নিচে চলে যাবে। সরকার ঘোষণা দিয়েছে তারা দ্বীপটির চারদিকে বাঁধ নির্মাণ করবে বন্যা থামানোর জন্য। কিন্তু উপকূলে একই রকম যেসব দ্বীপ আছে সেখানেও দীর্ঘদিন বন্যা হচ্ছে এবং ঘন ঘন সরকারি হস্তক্ষেপে সেখান থেকে লোকজনকে সরিয়ে আনা হয়। ওই এলাকার এক সরকারি কর্মকর্তা বিবিসিকে বলেছেন, ওই দ্বীপে বসবাসের জন্য মানুষ পাঠানো হবে একটি ভয়াবহ সিদ্ধান্ত। তিনি বলেন, শুধু শীতের সময় ওই দ্বীপটি মানুষের উপযোগী থাকে। এছাড়া এটা হলো জলদস্যুদের একটি অভয়ারণ্য।
শরণার্থী শিবিরগুলো পরিচালনা করে শরণার্থী বিষয়ক জাতিসংঘ হাইকমিশনার (ইউএনএইচসিআর)। তারাসহ ত্রাণ সংস্থাগুলো সরকারের ওই পরিকল্পনা পুনর্জাগরিত করার সিদ্ধান্তে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে তারা বলেছে, শরণার্থীদের ঠেঙ্গারচরে পাঠানো হতে হবে স্বেচ্ছায়। অর্থাৎ কোনো শরণার্থী চাইলে সেখানে যেতে পারে। ওই দ্বীপের উপযোগিতা নিয়ে একটি গবেষণার পর গঠনমূলক উপায়ে এই স্থানান্তর হতে পারে। মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের পক্ষে চারটি কারণে কথা বলে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। এক. সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা নাগরিকদের স্বীকার করে না মিয়ানমার সরকার। তাদেরকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে তারা। তারা নিজেরাই নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে। ধারাবাহিকভাবে তারা মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে। চলাচলে দিয়েছে বিধিনিষেধ। স্বাস্থ্যসেবা, জীবন-জীবিকা, আশ্রয়, শিক্ষাকে করেছে সীমাবদ্ধ। খেয়ালখুশি মতো আটক ও গ্রেপ্তার চালাচ্ছে। বাধ্য করছে শ্রমে। দুই. মিয়ানমারে রয়েছে নাগরিকত্বে বৈষম্য। রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার বিষয়ে সহযোগিতা করতে অস্বীকৃতি জানায় তারা। যেসব লোকের ওপর তারা মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে তাদেরকে দেশে ফিরিয়ে নিতে চায় না। তিন. ১৯৫১ সালের রিফিউজি কনভেনশনের অংশীদার নয় বাংলাদেশ। ১৯৯০-এর দশকের শুরু থেকে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের তারা নিবন্ধিত করেনি। এমন কি তাদেরকে আশ্রয় দেয়ার বিষয়টিও অনুমোদন করেনি। রোহিঙ্গাদের অবস্থান নির্ণয়ে দায়বদ্ধতা এড়িয়ে চলে বাংলাদেশ। চার. কোনো দেশ শরণার্থীদের শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃতি না দেয়া পর্যন্ত সে বা তারা শরণার্থী হয়ে উঠতে পারে না। কিন্তু তারা শরণার্থীর সংজ্ঞা পূরণ করে তাই তাদেরকে স্বীকৃতি দেয়া হয়। তাই যেহেতু বাংলাদেশ তাদেরকে স্বীকৃতি দেয়নি তাই তাদের অধিকার রক্ষা করে না বাংলাদেশ। ব্রাড এডামস বলেছেন, নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের প্রতি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করা উচিত বাংলাদেশ সরকারের। রোহিঙ্গাদের বন্যাপ্রবণ দ্বীপে পাঠানোর পরিবর্তে সরকারের উচিত শরণার্থীদের অবস্থার উন্নতি ঘটাতে অবিলম্বে ডোনারদে সহায়তা চাওয়া। -ডেস্ক